চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট মাসে ৭০ আত্মহত্যা, ৬৩ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭০ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে জেলার বিভিন্ন থানায় ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ এ সময়ে নথিভুক্ত অপমৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মহত্যাজনিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আত্মহত্যার শিকার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ কিশোর-কিশোরী ও তরুণ।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনায় ১৮ বছরের কম বয়সী ১৫ জন রয়েছে। ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২৯ জন। অর্থাৎ ৩০ বছরের নিচে বয়সী আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ৪৪, যা মোট ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১২ জন, ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন।
পুলিশের পর্যবেক্ষণ বলছে, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। প্রেম বা সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, অভিমান, মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝাসহ নানা কারণে মানুষ তীব্র হতাশায় পড়তে পারেন। সংকটে থাকা মানুষের পাশে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দ্রুত এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
.png)
কিশোর-তরুণদের নিয়ে বেশি উদ্বেগ
পরিসংখ্যানে আত্মহত্যার ঘটনায় কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। জীবনের শুরুতেই আবেগ, সম্পর্ক, পড়াশোনা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সমাজসেবক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাময়িক হতাশা কখনো গুরুতর সংকটে রূপ নিতে পারে। অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, ফলাফল নিয়ে চাপ, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা পরিবারের সঙ্গে দূরত্বও তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি মনে করেন, সন্তানদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে।
পারিবারিক বিরোধেও বাড়ছে ঝুঁকি
জেলা পুলিশের তথ্য ও পর্যবেক্ষণে পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য অসন্তোষ ও মানসিক চাপের বিষয়ও উঠে এসেছে। সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রসিকনগর গ্রামে পারিবারিক বিরোধের জেরে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এর আগে শিবগঞ্জের মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নেও পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শুধু আত্মহত্যার ঝুঁকি নয়, পারিবারিক সংকট, সহিংসতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপও হতাশার কারণ হয়ে উঠছে। ফলে আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত।
নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে আত্মহত্যার ঘটনায় নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানানো হয়েছে। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অসন্তোষ, মানসিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশার মতো বিষয় নারীদের একটি অংশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার আচরণ কোনো একক ঘটনা বা কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক চাপ, সম্পর্কের সংকট, আর্থিক সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা ও বিভিন্ন জীবন-সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা পড়াশোনার সাফল্যের দিক থেকে না দেখে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিও নজর দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে। কোনো পারিবারিক বিরোধ, মানসিক সংকট বা হতাশার পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা সাময়িক মানসিক সংকটের কারণে একটি সম্ভাবনাময় জীবন যেন শেষ হয়ে না যায়। শিশু-কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন বা হতাশার লক্ষণ দেখা দিলে বকাঝকা না করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানো, সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭০টি আত্মহত্যা এবং একই সময়ে ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্যটি পরিবার ও সমাজের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ৩০ বছরের নিচে বয়সী মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কিশোর-তরুণদের মানসিক চাপ, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষাজীবনের সংকট এবং সামাজিক সহায়তার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।