‘নিরাপদে পৌঁছেছি’, স্ত্রীর সঙ্গে শাহেদের শেষ ফোনালাপ
এক মাসের ছুটি কাটিয়ে পরিবারের কাছে বিদায় নিয়ে সৌদি আরবে ফিরেছিলেন মো. শাহেদ আহমেদ (৩৬)। দেশে স্ত্রী ও দুই ছেলের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত হন তিনি। সৌদি আরবে পৌঁছে শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্ত্রীকে ফোন করে নিরাপদে অবতরণের খবর জানিয়েছিলেন শাহেদ আহম্মেদ । সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ।
নিহত শাহেদ আহম্মেদ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের জেদ্দায় প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, গত শুক্রবার সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশে বগুড়া থেকে ঢাকার পথে রওনা হন শাহেদ। পরদিন শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান এই প্রবাসী।
শাহেদের স্ত্রী কোহিনূর আক্তার কাকলী (২৬) জানান, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্বামী ফোন করে তাকে নিরাপদে পৌঁছানোর কথা জানান। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে শোকের মধ্যে পড়েছেন কাকলী।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই বছর পর এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। স্ত্রী ও দুই ছেলে আবদুল্লাহ (৬) এবং কাওসারকে (১১) নিয়ে সময় কাটিয়ে আবার সৌদি আরবে ফিরছিলেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই তার জীবনে নেমে আসে মর্মান্তিক পরিণতি।
শাহেদের চাচাতো ভাই মাসুম রানা জানান, ২০১৩ সাল থেকে সৌদি আরবের জেদ্দায় প্লাম্বারের কাজ করতেন শাহে। দীর্ঘ দুই বছর পর ছুটি নিয়ে দেশে এসে এক মাস পরিবারের সঙ্গে কাটান তিনি।
মাসুম রানা বলেন, ‘দীর্ঘ দুই বছর পর এক মাসের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে কাটানো সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরছিলেন। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেল।’
শাহেদের বাবা রফিকুল ইসলাম গত ২৬ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। তিন মাস আগে তার মা সাহেরা বেগমও সেখানে যান। সৌদি আরবে পৌঁছে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল শাহেদের। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার আগেই তার মৃত্যুর খবর আসে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবে পৌঁছে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল শহীদের। প্রিয়জনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সেই মুহূর্ত আর আসেনি। দেশে স্ত্রী-সন্তান এবং সৌদি আরবে মা-বাবাকে রেখে তার এই আকস্মিক মৃত্যু পরিবারটিকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
শাহেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে স্বামীহারা কাকলী এবং দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় আর্থিক সহায়তারও দাবি জানিয়েছে তারা।
এদিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক হামলায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার প্রভাবে ঢাকা-রিয়াদ রুটে ফ্লাইট চলাচলও স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
দূর প্রবাসে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে কাজ করতে যাওয়া শহীদের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শেষ ফোনকলে নিরাপদে পৌঁছানোর খবর দেওয়া মানুষটি আর কখনো বাড়িতে ফিরবেন না, এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তার স্বজনেরা।