ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

পাখিদের আগমনে মুখরিত চলনবিল, চলছে নিধন

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ১১:৩৮, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
পাখিদের আগমনে মুখরিত চলনবিল, চলছে নিধন
সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের আগমনে চলনবিল এলাকা এখন মুখোরিত । ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিভিন্ন জাতের পাখিদের আগমনে চলনবিল এলাকা এখন মুখোরিত হয়ে উঠেছে। সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলা ছাড়াও পাবনা, নাটোর, নওগাঁর কয়েকটি উপজেলার সমন্বয়ে চলনবিল অঞ্চল গঠিত। চলমান মৌসুমে পানি শুকিয়ে আসায় মৎস্য ভান্ডারখ্যাত তাড়াশ চলনবিলে অতিথি পাখির ঝাঁকে ঝাঁকে আগমন ঘটছে। তাছাড়াও তাড়াশ উপজেলার কয়েকশত বছরের পুরোনো প্রায় একশত বিঘা আয়তনের একটি দিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই জনপদ। উলিপুর দিঘি নামে পরিচিত জলাশয়টির পাড়ে রয়েছে প্রাচীন বটগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির উচু গাছ। 

শীতের আগমনের সাথে সাথেই এই চলনবিল এলাকার বিভিন্ন গাছগুলোতে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। উলিপুরের মাঠ, জলাশয় ও আশপাশের বিলাঞ্চলে দেখা যায় নানা প্রজাতির পাখি। 

তাছাড়া, চলনবিলের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছে প্রায় ১৪টি নদী ও ২২টি ছোট-বড় বিল। যদিও অনেকগুলোর অস্তিত্ব এখন আর দেখা যায় না। এই মৌসুমে পানি শুকিয়ে আসায় তাড়াশ চলনবিলের নিজের আহার জোগাতে বক, ইটালি, শর্লি, পিয়াজ খেকো, ত্রিশুল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাঁদোখোচা, ফেফি, ডাহুক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামকৈলসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির ঝাঁকে ঝাঁকে আগমন ঘটছে। 

জলাশয়, খোলা মাঠ, খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং গাছপালার সমন্বয়ে বিল এলাকাটিতে পাখিদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গাছের উচু ডালগুলোতে তৈরি করেছে অসংখ্য বাসা। যা দূর থেকে দেখলে গাছের ডাল পালায় পাখির উপস্থিতি চোখে পড়ে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলাচলে উল্লেখিত এলাকাটির পরিবেশে যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। বিশেষ করে পাখিদের বাসা ফেরা, বাচ্চাদের খাবার খাওয়ানো এবং দলবদ্ধভাবে উড়ে যাবার দৃশ্যে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। পাখিদের এই জীবনযাপন শুধু প্রকৃতির সৌন্দয্য নয়, বন্য প্রাণির স্বাভাবিক জীবন চক্র দেখারও এক বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। প্রকৃতি প্রেমীদের কাছ থেকে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে উন্মুক্ত পাঠশালা।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এই সকল পাখি বিভিন্ন মাঠে ও গাছে অবস্থান করে। সকাল থেকেই খাবারের খোঁজে ভিড় করে বক, বালিচোরা, পানকৌড়ি রাতচোরাসহ নানা প্রজাতির পাখি।

চলনবিলে বিভিন্ন জাতের পাখি দেখতে ভিড় জমাচ্ছে শিক্ষার্থীহ আবাল বৃদ্ধ-বণিতা। দর্শনার্থী জিসান ও সুমাইয়া জানায়, ডানা মেলে পাখিদের উড়তে দেখা যায়, খাবারের সন্ধানে চলনবিলে ছুটে যাওয়া এবং ঠোঁটে খাবার নিয়ে ফিরে আসা এবং তাদের কিচিরমিচির শব্দে এলাকা মুখোরিত হয়ে ওঠে।

কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু শিকারি ফাঁদ বিষটোপ, জাল ও খাঁচার মাধ্যমে অতিথি পাখি শিকার করছে। এভাবে পাখি শিকার করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের নেই কোনো ব্যবস্থা। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। প্রত্যন্ত বিলাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রতিটি বক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, রাতচোরা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা জোড়া, বালিহাঁস ৩২০ থেকে ৬৭০ টাকা দরে বিক্রি করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, পাখিরা শুধু প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে না, প্রকৃতির ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের উপকার করে। কিন্তু আইন থাকলেও পাখি নিধন বন্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। অবাধ পাখি শিকার করায় পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ছে, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

এদিকে সিরাজগঞ্জ বন বিভাগের কর্মকর্তা রিজিয়া পারভীন মিষ্টি জানায়, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কার্যকর করার মতো সরকারি জনবল নেই। চলমান মৌসুমে পাখি গুলো জনগণ সচেতন না হলে কোনোভাবেই নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, পাখিসহ বন্যপ্রাণী রক্ষায় যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। তা নাহলে আগামীতে প্রজন্মের কাছে বন্যপ্রাণীর নাম শুধু কাগজে-কলমেই থাকবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ/জেডআই
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!