চায়ের কাপে ২৫ বছর ধরে সংসার সামলাচ্ছেন স্বপ্না
সুখ যেন আমার কপালে লেখা নেই, ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে আসছি। স্বামী-সন্তান নিয়ে একটু ভালো থাকার আশায় জীবনের ২৫টি বছর ধরে চা বিক্রি করেই কাটিয়ে দিলাম। আমাদের বসবাস করার জন্য ভাঙা টিনের ঘরটি মেরামত করার সামর্থ্যও নেই। কথাগুলো বলতে গিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট আর হতাশার কথা তুলে ধরেন স্বপ্না।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভার পশ্চিমপাড়া মহল্লার বাসিন্দা স্বপ্না আক্তার। মৃত সিরাজ খাঁনের মেয়ে তিনি। মাত্র দেড় বছর বয়সে মা তাকে রেখে অন্য সংসারে চলে যান। এরপর সৎমায়ের কাছে বেড়ে ওঠা। শৈশবের স্নেহ-মমতা আর আনন্দের দিনগুলো খুব একটা উপভোগ করা হয়নি তার। মাত্র ১৩ বছর বয়সে উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ঝাকালিয়া গ্রামের অহিদ মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তখন সংসার কী, স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব কী তা বোঝার মতো বয়সও হয়নি। অথচ সেই বয়সেই শুরু হয় নতুন জীবনের কঠিন অধ্যায়।
বিয়ের সাত-আট বছর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী অহিদ মিয়া। এরপর পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েই চায়ের দোকান নিয়ে বসেন স্বপ্না। কটিয়াদী বাজারের মুকুল সিনেমা হলের সামনে শুরু হয় তার জীবনসংগ্রামের নতুন অধ্যায়। সেই থেকে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া মানুষের ভিড়ের মধ্যেই নিজের দুঃখ-কষ্ট আড়াল করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্বপ্নার সংসারে রয়েছে স্বামী ও তিন সন্তান। এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার ছোট্ট পরিবার। মেয়ে লুচি আক্তার বিএ অনার্সে পড়াশোনা করেছেন। বড় ছেলে রুবেল (২৫)কে ধারদেনা করে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে ছেলেকে ফিরে আসতে হয়েছে। ছোট ছেলে সাদ্দাম হোসেন (২০)কেও মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে বিদেশ পাঠিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেখানেও ছেলের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে সংসারের খরচ সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই জীবন যুদ্ধা এই মায়ের।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চায়ের দোকানেই কাটে স্বপ্নার সময়। ক্রেতাদের একের পর এক চা পরিবেশন করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসারের চাকা। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকার চা বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে কোনো কোনো দিন ৫০০ টাকার মতো লাভ থাকে। কিন্তু এই সামান্য আয় দিয়ে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সংসারের অন্যান্য ব্যয় এবং ঋণের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, তার উপার্জনের ওপরই নির্ভর করে পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চা বিক্রি করে সংসারের হাল ধরে রাখলেও নিজের থাকার ঘরটি মেরামত করতে পারেননি স্বপ্না। ভাঙাচোরা টিনের ঘরই তার পরিবারের আশ্রয়স্থল। বৃষ্টি হলে কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেই ঘরে থাকতে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। সামর্থ্য থাকলে ঘরটি মেরামত করে একটু নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে।
স্বপ্নার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট করে সংসার চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি অনুদান বা সহায়তা পাননি তিনি। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে জীবনের বড় একটি সময় পার হয়ে গেছে। তবু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি এই নারী।
স্বপ্নার গল্প শুধু একজন চা বিক্রেতার জীবনকাহিনি নয়, এটি শৈশবের বঞ্চনা, অল্প বয়সে বিয়ে, স্বামীর অসুস্থতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক নারীর নিরন্তর লড়াইয়ের গল্প। প্রতিদিন চায়ের কাপ হাতে ক্রেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো নিজের কষ্টের কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিন শেষে ভাঙা ঘরে ফিরে অভাবের বাস্তবতা তাকে আবারও মনে করিয়ে দেয়, তার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।
স্বপ্নার চাওয়া খুব বেশি নয়। তিনি চান একটু স্বস্তিতে বাঁচতে, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ একটি ঘরে থাকতে এবং ঋণের বোঝা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে। দীর্ঘদিনের শ্রম আর ত্যাগের পরও তার জীবনে স্বস্তি অধরা। এখন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে হয়তো তার দুর্বিষহ জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।
স্বপ্না আক্তারের স্বামী মো. অহিদ মিয়া জানান, আমি এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমাদের বিয়ের কয়েক বছর পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এর পর থেকেই সংসারের হাল ধরতে চাই বিক্রির কাজ বেছে নেয় স্বপ্না । তার চা বিক্রির আয় থেকেই চলে সংসার । আমাদের দুই ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। মেয়েটি অনার্সে পড়াশোনা করছে। আল্লাহ যেন তাকে সবসময় সুস্থ রাখে এই কামনা আমার।