সুপেয় পানি, সড়ক ও বিদ্যুতের অপেক্ষায় মাটিরাঙ্গার চকপাড়া
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভা গঠনের দীর্ঘ দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চকপাড়া গ্রামের ৪১টি ত্রিপুরা পরিবারের প্রায় দুই শতাধিক মানুষ।
পৌর সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এখানকার বাসিন্দারা আজও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
কাগজকলমে তারা পৌরসভার নাগরিক হলেও বাস্তবে জীবন কাটাচ্ছেন চরম অবহেলায়। স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সময় ও পৌরসভার প্রতিষ্ঠার দুই দশক অতিক্রম হলেও চকপাড়ার মানুষ সড়ক যোগাযোগ, সুপেয় পানি এবং বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা এই মৌলিক চাহিদার কোনোটিরই সুফল পাননি। উন্নয়নের আলো আজও পৌঁছায়নি এই দুর্গম জনপদে।
এলাকার শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা পার্শ্ববর্তী ধলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাটিরাঙ্গা মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে তাদের বিদ্যালয়ে পাড়ি জমাতে হয়। বর্ষা এলে এই দুর্ভোগ পৌঁছে চরমে; কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য চরম কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পেরোলেও কলেজে পৌঁছার আগেই অধিকাংশের শিক্ষাজীবন থেমে যায়। চরম দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই অনেককে পড়াশোনা ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার নারীদের দৈনন্দিন কাজের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে পানি সংগ্রহ। পাহাড়ের পাদদেশে ছড়ার পাশে গর্ত খুঁড়ে সেখানে জমা পানি কলস, হাঁড়ি ও পাতিলে ভরে মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে আসেন তাঁরা। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিই একমাত্র ভরসা। এলাকায় একটিমাত্র টিউবওয়েল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
কৃষিনির্ভর এই গ্রামে কোনো পাকা সড়ক নেই। ফলে মাটিরাঙ্গার হাটের দিনে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যথাসময়ে পণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পারায় কৃষকেরা প্রায়ই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন।
বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যা নামলেই পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়। শিশুদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ চলে কেরোসিনের কুপি বা সীমিত সোলার লাইটের আলোয়, যা অনেকের নাগালের বাইরে। প্রধান পেশা কৃষি হলেও বিদ্যুতের অভাবে সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা মানুষের জীবিকা ও জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চকপাড়ার কার্বারি বিজয় মোহন ত্রিপুরা বলেন, “সড়ক, পানি ও বিদ্যুতের দাবিতে আমরা বহুবার স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদে আবেদন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পথ অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বর্ষায় আমাদের সন্তানরা প্রায়শই স্কুলে যেতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের কষ্টের শেষ নেই। পৌর এলাকার মধ্যে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে চকপাড়ার বাসিন্দারা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমরা এলাকায় প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে মাটিরাঙ্গা পৌর বিএনপির সভাপতি মো. শাহজালাল কাজল বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া এমপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। আগামী মাস থেকে সোলারনির্ভর সাবমারসিবল পানির কল বসানো হবে, এর মাধ্যমে সুপেয় পানির দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হবে। এ ছাড়া এলাকার এক কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি এইচবিবি (হেরিংবোন বন্ড) করার কাজও শিগগির শুরু হবে। টিআর-কাবিটা প্রকল্পের আওতায় এমপির বিশেষ বরাদ্দ থেকে কাঁচা রাস্তাটির যথাযথ উন্নয়ন করা হবে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক উম্মে তাহমিনা মিতু বলেন, “বর্তমানে পৌরসভার কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ওই এলাকার উন্নয়নে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”