ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সিরাজগঞ্জে তিন জেলার ৬৫ চরমপন্থির আত্মসমর্পণ

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৫৮, ১ নভেম্বর ২০২৬
সিরাজগঞ্জে তিন জেলার ৬৫ চরমপন্থির আত্মসমর্পণ
সিরাজগঞ্জে সর্বহারা চরমপন্থিদের আত্নসমর্পণ অনুষ্ঠান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় সর্বহারা চরমপন্থিদের সশস্ত্র তৎপরতায় আতঙ্কিত থাকত সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীর জনপদ। চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন সাধারণ মানুষ। সেই সহিংস অতীত পেছনে ফেলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন তিন জেলার ৬৫ জন চরমপন্থি সদস্য।

রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১২-এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা আত্মসমর্পণ করেন। ‘নতুন পথে প্রত্যাবর্তন: চরমপন্থি সর্বহারা সদস্যদের আত্মসমর্পণ-২০২৬’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেন আত্মসমর্পণকারীরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মিস ফারজানা শারমীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমিরুল ইসলাম খান আলিম, এসআরবি ফোর্সেসের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) শাহানা আখতার জাহান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসআরবি-১২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আতিকুর রহমান মিয়া। সঞ্চালনা করেন স্কোয়াড্রন লিডার ফিরোজ। এ সময় সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সান্তুসহ এসআরবি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আত্মসমর্পণকারীদের একজন মো. মাজেদ আলী মুন্সী বলেন, ‘অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে আসতে পেরে আজ খুবই ভালো লাগছে।’

আরেক আত্মসমর্পণকারী আইনুল হোসেন বলেন, ‘ভুল পথে চলতে চলতে অনেক কিছু হারিয়েছি। এভাবে ১৫ বছর কেটে গেছে। আমার সাথি ভাইয়েরা অনেক সময় বলতেন, অনেক দিন ধরে বাড়িতে যাওয়া হয় না।’

নিজেদের অতীত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মো. আলম সেখ বলেন, ‘আমরা একসময় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। যখন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও পেতাম না, তখন অনেকেই দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তেন।’

আয়োজক সূত্র জানায়, আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পুনরায় সম্পৃক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

চরমপন্থি তৎপরতার অতীত

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজবাড়ীসহ আশপাশের জেলাগুলোতে একসময় মার্কস-লেনিন ও মাওবাদী মতাদর্শের নামে ১৪টি চরমপন্থি সংগঠন সক্রিয় ছিল। এসব সংগঠনের মধ্যে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-লাল পতাকা), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম) এবং পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (জনযুদ্ধ) উল্লেখযোগ্য।

১৯৬৮ সাল থেকে এসব সংগঠনের বিস্তার শুরু হয়। আশির ও নব্বইয়ের দশকে তাদের তৎপরতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে সংগঠনগুলো বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে সদস্যরা। এসব সহিংস কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

চরমপন্থি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগে আত্মসমর্পণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে শতাধিক চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।

এরপর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ৫৯৬ জন চরমপন্থি সদস্য। ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জে তৎকালীন র‌্যাব-১২ কার্যালয়ে সাত জেলার আরও ৩২৩ জন চরমপন্থি সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

আগের এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবার সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীর ৬৫ জন চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করলেন। তাদের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সহিংসতা পেছনে ফেলে স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনে ফেরার নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ/এমকে
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!