ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক রূপকার ড. গোহ কেনগ স্বি

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৫, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক রূপকার ড. গোহ কেনগ স্বি
দেশ বদলানোর ফাঁপা স্লোগান দেয়, গালভরা বুলি আউড়ায়, তাদের মুখে ড. গোহ কেনগ স্বি এক চরম চপেটাঘাত। দেশ কোনো সস্তা আবেগে বা ফালতু ফেসবুক স্ট্যাটাসে বদলায় না; দেশ বদলায় নিখাদ সততা, ইস্পাতকঠিন প্ল্যানিং আর একদম বাস্তবসম্মত অ্যাকশনে

১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট। মালয়েশিয়া যখন লাথি মেরে সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বের করে দেয়, তখন এই পুঁচকে দ্বীপের কপালে ছিল শুধুই ঘুটঘুটে অন্ধকার। আধুনিক ইতিহাসের একমাত্র দেশ, যারা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, জোরপূর্বক স্বাধীনতা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল! 
কেন কাঁদবে না বলেন....?

 না ছিল কোনো খনিজ সম্পদ, না ছিল এক ফোঁটা খাওয়ার জল, আর না ছিল নিজের দেশ পাহারা দেওয়ার মতো কোনো আর্মি! চারিদিকে গিজগিজ করছে অশিক্ষিত মানুষ, বেকারত্ব, জঙ্গল, দাঙ্গা আর আকণ্ঠ দুর্নীতি। 

বড় বড় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তো খাতা-কলম নিয়েই বসে পড়েছিলেন....সোজা ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছিলো, "বড়জোর কয়েক বছর, তারপর মুছে যাবে এই দেশ!" 

ঠিক এই নরককুণ্ডে দাঁড়িয়ে সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক রূপকার সিঙ্গাপুরের আর্কিটেক্ট হিসেবে মাঠে নামেন London School of Economics -এর তুখড় পিএইচডিধারী অর্থনীতিবিদ ড. গোহ কেনগ স্বি। ড. গোহ কেনগ স্বি (Dr. Goh Keng Swee) ছিলেন আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রধান অর্থনৈতিক রূপকার (Economic Architect) এবং দেশটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। 

সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ যদি দেশটির রাজনৈতিক কাণ্ডারি হন, তবে ড. গোহ ছিলেন তার পেছনে থাকা মূল অর্থনৈতিক মস্তিষ্ক। লন্ডনের এলএসই (LSE) থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করা এই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক সম্পদহীন একটি দ্বীপরাষ্ট্রকে এক প্রজন্মের মধ্যে শীর্ষ উন্নত দেশে রূপান্তর করার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

 "লিখে রাখুন, এই দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে!" আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের এই বাণীর উপর  জুতো মেরে জন্ম নিয়েছিলো আজকের ধনী সিঙ্গাপুর। ফাঁকা বুলি বা ইমোশনাল ডায়লগ নয়, তিনি দেশ চালাতে এসেছিলেন একেবারে জাঁদরেল অ্যাকশন আর চরম নির্মমতায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তরুণ গোহ সিঙ্গাপুর ভলান্টিয়ার কর্পসে যোগ দেন। একদিন তাকে একটা নির্দিষ্ট আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু চরম খামখেয়ালিপনায় তিনি রিপোর্টের তারিখ গুলিয়ে ফেলেন এবং ঠিক একদিন পর ক্যাম্পে পৌঁছান! 

ডিসিপ্লিন ভাঙার অপরাধে ক্ষুব্ধ অফিসার তাকে লাথি মেরে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। অথচ পরদিনই তিনি জানতে পারেন, যারা সঠিক ডেটে ক্যাম্পে রিপোর্ট করেছিল, জাপানিরা তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে কচুকাটা করেছে! কেউ আর বেঁচে ফেরেনি। খামখেয়ালিপনার সেই একটা দিন ভুলই বাঁচিয়ে দিয়েছিল সিঙ্গাপুরের ভাগ্যকে! 

আমলাতন্ত্রের ঘুষ আর উপহার নেওয়ার কালচার উনি এক ঝটকায় লাথি মেরে বের করে দেন। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বা ফাইল আটকে রাখা চলবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসবে, আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পারমিশন পকেটে নিয়ে ব্যবসা শুরু করবে। ব্যস, এটুকুই নিয়ম! কেউ ফাইল আটকালে চাকরি তো দূর, সোজা জেলের ভাত খেতে হতো।

একটা পরিত্যক্ত জঙ্গল আর মশার ডেরা জলাভূমিকে  উনি দেশের প্রথম বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বানানোর ফন্দি আঁটেন। তখন চারপাশের জ্ঞানী আমলারা তাকে নিয়ে হেসেছিল, টিটকারি মেরে প্রজেক্টের নাম দিয়েছিল "গোহ-এর চরম ভুল"। 

অথচ নিজের ধারালো বুদ্ধিতে সেই জঙ্গল ও জলাভূমিতেই উনি বিশ্বের বাঘা বাঘা টেক আর তেল জায়ান্টদের এনে লাইন কাটিয়ে দেন! আজ জুরুং সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড। 

দেশের ডিফেন্সের হাল যখন শূন্য, তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর চেয়ারে বসে জিরো থেকে সিঙ্গাপুরের আজকের এই আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ডিফেন্স সিস্টেমের ভিত গড়ে তোলেন তিনি নিজেই। 

শুধু তাই নয়, উনি যে ডিপার্টমেন্টেই হাত দিয়েছেন, সেটাই সোনা ফলেছে। সিঙ্গাপুরকে আজ যে পর্যটনের স্বর্গ বলা হয়, তার পেছনে থাকা বিখ্যাত "সিঙ্গাপুর জু" এবং "জুরুং বার্ড পার্ক"-এর আইডিয়াও ছিল এই কঠোর মানুষেরই মস্তিষ্কপ্রসূত! 

ড. গোহ এমন এক অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করেন যা ছিল সমাজতান্ত্রিক শৃঙ্খলার সাথে পুঁজিবাদের সংমিশ্রণ। তিনি সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স সহ বেশ কিছু সফল রাষ্ট্রীয় কোম্পানি (SLCs) গড়ে তোলেন, যা ব্যবসায়িক নিয়মে লাভজনকভাবে পরিচালিত হতো কিন্তু তার লভ্যাংশ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হতো।

সিঙ্গাপুরের প্রাথমিক দিনগুলোতে মাঠ কাপানো কমিউনিস্টদের সাথে তার ও লি কুয়ান ইউ-এর দলের জানমালের লড়াই চলেছিল। সেই দিনগুলোর কথা মনে করে অবসরের আগে তার শেষ ডেস্পারেট স্পিচে তিনি বলেছিলেন, "আমাদের রাজনীতিতে আসাটা ছিল স্রেফ একটা ‘অদূরদর্শী পাগলামি’ ! কিন্তু আমরা জানতাম, বিষ না নামালে দেশ বাঁচবে না।" 

একটা আস্ত দেউলিয়া, ভিখারি দেশকে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনী রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পর, কোনো মিডিয়া ট্রায়াল, কোনো সস্তা পাবলিসিটি, কোনো ভাইরালের নেশা বা আত্মঅহংকার ছাড়াই ১৯৮৪ সালে তিনি একদম নিরবে, নিভৃতে অবসরে চলে যান! 

কোনো লাইমলাইট, কোনো চামচাবাজি তার লাগেনি। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনে এতটাই মিতব্যয়ী আর সাধারণ ছিলেন যে, হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় একটা টিস্যু পেপারও পুরোটা ব্যবহার না করে ছিঁড়ে অর্ধেক করে ব্যবহার করতেন, যাতে অপচয় না হয়! 

আজকের দিনে যারা দেশ বদলানোর ফাঁপা স্লোগান দেয়, গালভরা বুলি আউড়ায়, তাদের মুখে ড. গোহ কেনগ স্বি এক চরম চপেটাঘাত। দেশ কোনো সস্তা আবেগে বা ফালতু ফেসবুক স্ট্যাটাসে বদলায় না; দেশ বদলায় নিখাদ সততা, ইস্পাতকঠিন প্ল্যানিং আর একদম বাস্তবসম্মত অ্যাকশনে। ড. গোহ ইতিহাসের পাতায় নিজের কাজ দিয়ে এটাই প্রমাণ করে গেছেন!

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!