ডাইনোসরের বিলুপ্তির প্রমাণ করে পৃথিবীর জীবজগৎ কতটা পরিবেশ নির্ভর
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীর জীবজগতে এমন এক বিপর্যয় ঘটেছিল, যা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস বদলে দেয়। স্থলভাগে আধিপত্য বিস্তারকারী অ-এভিয়ান ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়।
একই সময়ে সামুদ্রিক প্রাণী, ক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটন এবং আরও বহু জীবগোষ্ঠী মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনা ক্রিটেশিয়াস– প্যালিওজিন বা K–Pg গণবিলুপ্তি নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ছিল বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাত। ভারতের ডেকান অঞ্চলের ব্যাপক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও সে সময়ের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছিল।
ডাইনোসর বিলুপ্তির এই ব্যাখ্যা কেবল অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া শিলাস্তর, জীবাশ্ম, বিরল মৌলের উপস্থিতি এবং বিশাল আঘাতজনিত গহ্বর সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা ঘটনার একটি সুসংগত চিত্র তৈরি করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের নিচে অবস্থিত চিকশুলুব আঘাতজনিত গহ্বর। এর ব্যাস আনুমানিক ১৮০ কিলোমিটার।
- ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একটি বিশাল মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল। এই আঘাতের সময়কাল ডাইনোসরের বিলুপ্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। গহ্বরটির শিলায় আঘাতজনিত পরিবর্তন এবং বিশ্বজুড়ে একই সময়ের শিলাস্তরে পাওয়া পদার্থের মিল এই তত্ত্বকে শক্তিশালী করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো ইরিডিয়াম নামের একটি মৌলের অস্বাভাবিক আধিক্য। পৃথিবীর ভূত্বকে ইরিডিয়াম তুলনামূলকভাবে বিরল, কিন্তু অনেক গ্রহাণুতে এর উপস্থিতি বেশি। ডাইনোসরের বিলুপ্তির সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পাতলা ভূতাত্ত্বিক স্তরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইরিডিয়ামের উচ্চ ঘনত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্রহাণুর আঘাতে ছড়িয়ে পড়া ধুলা ও পদার্থ বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জমা হয়েছিল। এ ছাড়া কিছু শিলাস্তরে পাওয়া গেছে শকড কোয়ার্টজ বা প্রচণ্ড চাপের কারণে পরিবর্তিত কোয়ার্টজ খনিজ।
এমন পরিবর্তন সাধারণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সহজে ঘটে না; অত্যন্ত উচ্চচাপের বিস্ফোরণ বা মহাজাগতিক আঘাত এর কারণ হতে পারে। আঘাতের সময় গলিত পদার্থের ক্ষুদ্র কাচসদৃশ কণাও দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব প্রমাণ একত্রে গ্রহাণুর আঘাতের পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
গ্রহাণুটি আঘাত হানার পরপরই আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায়। প্রচণ্ড তাপে শিলা গলে যায়, সৃষ্টি হয় বিশাল বিস্ফোরণ, ভূকম্পন ও সুনামি। কিন্তু পৃথিবীর জীবজগতের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত আঘাতের মুহূর্তে শেষ হয়নি; বরং শুরু হয়েছিল তার পরবর্তী পরিবেশগত পরিবর্তন থেকে।
আঘাতের ফলে বিপুল পরিমাণ ধুলা, সূক্ষ্ম কণা ও সালফারসমৃদ্ধ পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সূর্যের আলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানো ব্যাহত হয়।
তাপমাত্রা কমে যায়, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়তে শুরু করে। উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল তৃণভোজী ডাইনোসর খাদ্যসংকটে পড়ে, আর তাদের ওপর নির্ভরশীল মাংসাশী ডাইনোসরও ক্রমে বিপর্যস্ত হয়। বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে প্রভাব-পরবর্তী শীতলায়ন বা ইমপ্যাক্ট উইন্টার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
- ডাইনোসর বিলুপ্তির সময় ভারতের বর্তমান ডেকান অঞ্চলে ব্যাপক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চলছিল। এই অগ্ন্যুৎপাত থেকে বিপুল পরিমাণ লাভা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস নির্গত হয়। এর ফলে জলবায়ু, বায়ুমণ্ডল এবং সমুদ্রের রাসায়নিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটেছিল।
তবে গ্রহাণুর আঘাতের তুলনায় আগ্নেয়গিরির প্রভাব কতটা ছিল, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। একাধিক গবেষণা গ্রহাণুর আঘাতকেই অ-এভিয়ান ডাইনোসরের বিলুপ্তির প্রধান কারণ হিসেবে সমর্থন করে; আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সম্ভবত পরিবেশগত চাপ আরও বাড়িয়েছিল।
সব ডাইনোসর কি তাহলে বিলুপ্ত হয়েছিল? উত্তর- না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য রয়েছে। অ-এভিয়ান ডাইনোসর যেমন টাইরানোসরাস ও ট্রাইসেরাটপস বিলুপ্ত হলেও ডাইনোসরের একটি শাখা টিকে ছিল।
আধুনিক পাখিরা সেই টিকে থাকা ডাইনোসরীয় বংশধারার অংশ। অর্থাৎ, পাখিরা শুধু ডাইনোসরের আত্মীয় নয়; বিবর্তনীয় শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী তারাই জীবিত ডাইনোসর। ছোট আকার, বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের কিছু পূর্বপুরুষের টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ডাইনোসরের বিলুপ্তির প্রমাণ আমাদের দেখায়, পৃথিবীর জীবজগৎ কতটা পরিবেশনির্ভর।
একটি মহাজাগতিক আঘাত জলবায়ু ও খাদ্যশৃঙ্খল বদলে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রাণীগোষ্ঠীগুলোর একটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এই ঘটনা প্রমাণ করে, গণবিলুপ্তি মানেই সব জীবের সমাপ্তি নয়; কখনো কখনো বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই নতুন বিবর্তনীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়।