বিশ্বসেরা স্থাপত্যের স্বীকৃতি পেল রংপুরের কারখানা গ্রিন ফিল্ড
বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন গৌরব বয়ে এনেছে রংপুরের একটি শিল্পকারখানা। কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি জিতেছে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের (রিবা) ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
১৫ অক্টোবর লন্ডনে অনুষ্ঠিত স্টার্লিং প্রাইজের অনুষ্ঠানে এ পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে কারখানাটির নাম ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি শিল্পকারখানা আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করল।
প্রচলিত শিল্পকারখানার ধারণা বদলে কর্মীদের সুস্থতা, সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক আলো-বাতাসকে গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত রংপুরের কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি জিতেছে ২০২৬ সালের রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ। সাততলা এই কারখানায় কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী, যাদের অধিকাংশ নারী।
বাংলাদেশের একটি কারখানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাই শুধু স্থাপত্যের অর্জন নয়; দেশের শিল্পায়নকে আরও মানবিক, পরিবেশবান্ধব ও কর্মীবান্ধব করে তোলার আলোচনাকেও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ।

রংপুরের এই কারখানার বিশেষত্ব শুধু এর স্থাপত্যসৌন্দর্যে নয়; বরং শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে কর্মীদের সুস্থতা, প্রকৃতির সংযোগ এবং সামাজিক পরিসরকে একীভূত করার পরিকল্পনায়। সাধারণত শিল্পকারখানার নকশায় উৎপাদনক্ষমতা, যন্ত্রপাতি স্থাপন ও জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গ্রিন ফিল্ড সেই পরিচিত ধারণার বাইরে গিয়ে কর্মপরিবেশকে আরও মানবিক করে তোলার চেষ্টা করেছে। ভবনটির নকশায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী বসতবাড়ি, উঠান, বারান্দা ও বাগানের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে।

পাঁচ হাজার কর্মীর জন্য ভিন্ন ধরনের কর্মপরিবেশ
- গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি মূলত গালিচা ও বস্ত্র উৎপাদনের কারখানা। সাততলা ভবনটির আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ৪৫০ বর্গমিটার। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ কাজ করেন, যাদের অধিকাংশ নারী। কারখানাটির মালিক প্রতিষ্ঠান কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড এবং এর স্থাপত্য নকশা করেছে বাংলাদেশের নকশাবিদ আর্কিটেক্টস।
স্থপতিরা ভবনটিকে শুধু উৎপাদনের স্থান হিসেবে দেখেননি। কর্মীরা যেন কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম নিতে পারেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে খোলা উঠান, বাগান, প্রশস্ত বারান্দা ও চলাচলের উন্মুক্ত জায়গা রাখা হয়েছে। ফলে শিল্পকারখানার অভ্যন্তরীণ পরিসরের সঙ্গে বাইরের প্রকৃতির একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
কারখানাটির নকশায় কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জন্য একই প্রধান প্রবেশপথ রাখা হয়েছে। স্থপতিদের এই পরিকল্পনা কর্মক্ষেত্রে প্রচলিত শ্রেণিগত দূরত্ব কমানোর একটি প্রতীকী প্রয়াস। এখানে স্থাপত্যের মাধ্যমে শুধু উৎপাদনব্যবস্থা নয়, কর্মক্ষেত্রের সামাজিক সম্পর্ককেও নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করা হয়েছে।

সবুজ দেয়াল, জলাধার ও প্রাকৃতিক শীতলীকরণ
ভবনটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর সবুজে আচ্ছাদিত সম্মুখভাগ। দক্ষিণ দিকের দেয়ালজুড়ে গাছপালা শুধু সৌন্দর্য বাড়ায়নি, ভবনের ওপর সরাসরি রোদ পড়ার তীব্রতা কমাতেও ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সবুজায়ন পাখি ও বিভিন্ন ছোট প্রাণীর জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
ভবনের ভেতরে রয়েছে জলাধার, উন্মুক্ত উঠান এবং চারটি বৃত্তাকার অ্যাট্রিয়াম বা উঁচু ফাঁকা পরিসর। জলাধারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বাতাস বাষ্পীভবনের কারণে কিছুটা শীতল হয়। এরপর ভবনের বিশেষ বায়ু চলাচলব্যবস্থার সাহায্যে সেই বাতাস ভেতরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যাট্রিয়ামের ওপরের খোলা ও কাচের ব্যবস্থাও আলো-বাতাস চলাচলে সহায়তা করে।
ভবনের কংক্রিট কাঠামো দিনের বেলায় তাপ শোষণ করে এবং বাতাস চলাচলের সমন্বিত ব্যবস্থার কারণে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তুলনামূলক শীতল থাকে। প্রকাশিত স্থাপত্যবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থায় ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে এবং প্রচলিত যান্ত্রিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণের তুলনায় জ্বালানি ব্যবহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। এগুলো প্রকল্প-সম্পর্কিত প্রকাশিত হিসাব; স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার এবং বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো যন্ত্রনির্ভরতা কমিয়ে ভবনকে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।

কারখানার ভেতরেই শিশুযত্ন, চিকিৎসা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা
গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরিতে কর্মীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে কয়েকটি সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাদে শিশুযত্ন কেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র, ভর্তুকিমূল্যে পণ্য কেনার জন্য মুদি দোকান, সম্মিলিত খাবারের জায়গা, প্রার্থনাকক্ষ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিসর।
বিশেষ করে নারী কর্মীদের জন্য শিশুযত্নের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। কর্মস্থলের কাছেই শিশুদের দেখাশোনার ব্যবস্থা থাকলে কর্মজীবী মায়েদের জন্য কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে। চিকিৎসাকেন্দ্র ও খাবারের জায়গাও কর্মীদের প্রয়োজনীয় সেবা কর্মস্থলের কাছাকাছি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় বাগান এবং বিশ্রামের পরিসর রয়েছে। এসব জায়গা কর্মীদের শুধু বিরতি কাটানোর জন্য নয়, সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরির জন্যও পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, কর্মীরা কখনো কখনো পরিবারের সদস্যদেরও কারখানাটি দেখাতে নিয়ে আসেন।
বাংলার ঐতিহ্য থেকে আধুনিক স্থাপত্যের ধারণা
গ্রিন ফিল্ডের নকশার অন্যতম ভিত্তি বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বসতবাড়ি। বাংলাদেশের পুরোনো বাড়িতে উঠান, বারান্দা, গাছপালা ও খোলা জায়গা পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থপতিরা এই পরিচিত ধারণাগুলোকে আধুনিক শিল্পকারখানার কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ করেছেন।
এখানে উঠান ও বাগান কেবল অলংকার নয়; এগুলো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ, বিশ্রাম এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হয়। একইভাবে প্রশস্ত বারান্দা রোদ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ভবনের বিভিন্ন অংশে বাতাস চলাচলে সহায়তা করে।
ভবনটির কাঠামোতে কংক্রিটের ফ্রেম ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আধুনিক প্রকৌশল ও স্থানীয় নির্মাণঐতিহ্যের মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরি হয়েছে। এই নকশা দেখিয়েছে, শিল্পকারখানা নির্মাণে স্থানীয় জলবায়ু, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব।

স্থপতি ও উদ্যোক্তার ভাবনা
- গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশা করেছে নকশাবিদ আর্কিটেক্টস। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক শফিকুল আলম সেলিম।
নকশার মূল ভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার বলেছেন, কারখানাটি এমনভাবে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেন সেটি কর্মীদের জন্য একটি বাড়ির মতো হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনের উঠান, বাগান, জলাধার ও ছায়াযুক্ত বারান্দার পরিকল্পনা এই ভাবনা থেকেই এসেছে। শিল্পকারখানা যে শুধু শ্রমিকের শক্তি ব্যবহার করবে তা নয়, বরং কর্মীদের মানসিক স্বস্তি ও সুস্থতার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে—এটাই ছিল নকশার অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে শফিকুল আলম সেলিমের বক্তব্য, তাঁদের কারিগরেরা হাতে তৈরি গালিচার মাধ্যমে রংপুরের দীর্ঘদিনের কারুশিল্পের ঐতিহ্য বহন করছেন। সেই কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা এবং কর্মীদের মর্যাদা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের অংশ।
কেন রিবার পুরস্কার এত গুরুত্বপূর্ণ
- রিবা বা রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠিত স্থাপত্যবিষয়ক পেশাজীবী সংগঠন। এর ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ যুক্তরাজ্যের বাইরে নির্মিত এমন স্থাপত্য প্রকল্পকে স্বীকৃতি দেয়, যেগুলো নকশার মৌলিকত্ব, বাস্তবায়নের উৎকর্ষ, পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং ব্যবহারকারীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাবের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০২৬ সালের প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল চারটি প্রকল্প। বাংলাদেশের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি ও ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশাপাশি তালিকায় ছিল বেলজিয়ামের রয়্যাল বেলজ ও জেড৩৩। শেষ পর্যন্ত গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
এর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল স্থাপত্যের এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছিল। স্থপতি কাশেফ চৌধুরীর নকশা করা হাসপাতালটির পর গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিজয়ী প্রকল্প।

বাংলাদেশের শিল্পকারখানার জন্য কী বার্তা
- গ্রিন ফিল্ডের স্বীকৃতি বাংলাদেশের শিল্পায়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষত পোশাক, বস্ত্র ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে কর্মীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণকে নকশার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে একটি সুন্দর ভবনই ভালো কর্মপরিবেশের সব শর্ত পূরণ করে না। কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা, পেশাগত নিরাপত্তা, ছুটি, শ্রমিক অধিকার এবং ব্যবস্থাপনার আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিন ফিল্ডের স্থাপত্যগত সাফল্যকে তাই কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তারপরও রংপুরের এই কারখানা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের সুস্থতা এবং মর্যাদাকে যুক্ত করে শিল্পস্থাপত্যের নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছে এটি।