অবরোধ বাসিনী থেকে আজকের নারী প্রজন্ম
রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন শত বছর আগের ৪৭টি বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন অবরোধ বাসিনী৷ তাতে ওই সময়ের নারীদের জীবন চিত্র আমরা বুঝতে পারি৷ কনকনে শীতে পালকিতে বসেই শিশু সন্তান নিয়ে রাত কাটালেও মুখ ফুটে বলতে পারেননি৷ স্বামীর পরিবর্তে আরেকজনের ধুতির হলুদে খুট ধরে চলে গিয়েছেন এক নারী বহু দূর৷ স্বামী বলতে ঐই হলুদ পাড়ই যে চিনেন! আজকের তরুণীরা পড়ে হাসে তবে বিশ্বাস করতে চায় না নারীরা অমন ভয়ানক অবস্থায় ছিলেন৷
ব্রিটিশ ভারতের সম্ভবত সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বপ্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং চন্দ্রমুখী বসু (১৮৮৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে)। এশিয়ার প্রথম নারী ডাক্তার কাদম্বিনীর বিয়ে হয় বিক্রমপুরের লেখক ও শিক্ষাবিদ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর সাথে। এর তিন যুগ পরে সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক (ডেন্টিস্ট) হন ফাতেমা জিন্নাহ। আরও পরে বাংলাদেশের বেগম ফজিলাতুন্নেসা জোহা ১৯২৫ সালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বিএ (স্নাতক) পাস করেন।
- এরপর ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে বিলাত (যুক্তরাজ্য) যান।
তিনিই নজরুলের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি এই না-পাওয়া প্রেমের বেদনা থেকে নজরুল বেশ কিছু আবেগঘন চিঠি এবং বিখ্যাত কিছু কবিতা (যেমন: 'বর্ষা-বিদায়', 'তোমারে পড়েছে মনে') রচনা করেছিলেন। এমনকি কবি তাঁর বিখ্যাত 'সঞ্চিতা' কাব্যগ্রন্থটি ফজিলাতুন্নেসাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় পরবর্তীতে এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করা হয়।
.png)
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মেয়ে বেগম সুলতান মীর আমিরুদ্দিন ছিলেন সমগ্র ভারতের প্রথম মুসলিম নারী আইন স্নাতক। ১৯২২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তাঁর ব্যাচে একমাত্র নারী শিক্ষার্থী ছিলেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির বোন শায়স্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ কলকাতার লরেটো কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে তিনি প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও মরক্কোর রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তারই কন্যা সালমা সোবহান বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার। পাকিস্তান পর্যন্ত মুসলিম মেয়েদের উচ্চশিক্ষা একেবারেই হাতেগোণা।
পাকিস্তান আমলে দুএকজন করে হিন্দু নারী সারাদেশের স্কুলগুলোতেই শিক্ষার্জন শুরু করেন৷ তখনকার চিত্রটি বলেছিলেন আমার এক প্রবীণ শিক্ষক৷ মেয়েরা ক্লাস রুম থেকে স্যারদের সাথেই বেরিয়ে যেতেন কমন রুমে বা হেড স্যারের রুমের সামনে৷ আরেকজন শিক্ষক এসে ক্লাসে ঢুকলেই তারা আবার ঢুকতেন৷ কোন ছাত্রই সহপাঠিনীর সাথে কথা বলতে পারতো না৷
আমি সিক্সে ভর্তি হই দুজনের পরে৷ আমার আগে ছিল একটি মেয়ে৷ সিক্সে থাকতেই তার বিয়ে হয়ে যায়৷ এসএসসি পরীক্ষা দিতে দিতে আরো কয়েকজনেরই বিয়ে হয়৷ আমার এক ক্লাস নিচে পড়তো একটি মেয়ে— ফার্স্টগার্ল৷ সেভেনে থাকতেই বিয়ে হয়ে গেল৷ আমার এক ক্লাস উপরেও একজন ভাল ছাত্রী ছিলেন ডাঃ মিলি আপা৷ তার বাবা ও মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক৷ ফলে তার জীবন ছিল সহজ ও সাবলীল৷ আরেকটু সিনিয়র ছিলেন সাবেক এমপি এড. সানজিদা খানম মালা আপা৷ তাঁর জীবনও সংগ্রামের৷
আমার সহপাঠিনী ছিল সাবেক এমপি অপু উকিল৷ তাকেও অনেক সংগ্রাম করেই পড়তে হয়েছে৷ আমাদের ৭০/৭৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪/১৫জন মেয়ের মধ্যে অপু উকিলই পড়াশোনা শেষ করেছে৷ আমি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে কোন নারী শিক্ষককেও পাইনি৷ আজ আমাদের স্কুলে নারী শিক্ষক অনেক৷ ছাত্রীর সংখ্যা ৫০%+!
আজ যারা বলেন আমাদের নারীরা ব্রিটিশ আমলের চেয়ে পিছিয়ে তারা কেবল প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের চুল খোলা ছবিটিই দেখেন৷ তৎকালীন সামগ্রিক নারীদের বিশেষ করে মুসলিম নারী সমাজের চিত্রটা দেখেন না৷ অনেকে বলেন, তাদের সহপাঠীরা বোরকা পরতেন না৷ ১৯৯৭ সালে পাবনা শহরের একটি গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ও সহকর্মী বন্ধু মুক্তা একটি জরিপ করি৷ আমি গণনা করি ২৮ জন মেয়ে বোরকা পরা৷ ওর গণনাতেও ছিল ২৮জন বোরকা ছাড়া৷ মানে হল তখন ওই স্কুলে ৫০% মেয়েই বোরকা পরতো৷
সম্প্রতি একজন অধ্যাপক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম আপনার ক্লাসে কতজন মেয়ে বোরকা বা হিজাব পরেন৷ ওনি বললেন ১০%৷ ৪০ বছর আগে সব পরিবারের মেয়েরা স্কুলে আসতে পারতেন না৷ কেবল অগ্রসর পরিবারের মেয়েরাই পড়তে আসতেন৷ আজ ওই চরম পশ্চাৎপদ পরিবারের মেয়েটিও স্কুলে আসছেন৷ তাকে বোরকা পরেই স্কুলে আসতে হয়৷
যখন ৫/১০জন পশ্চাৎপদ পরিবারের মেয়ে একত্রিত হন তখনকার চিত্রই বাংলাদেশ নয়৷ এখন বহু মেয়েই একা বের হচ্ছেন৷ আমার মেঝো ভায়রার মেয়ে মাগুরা থেকে একা ঢাকায় এসে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন অনেকেই গ্রাম থেকে ঢাকায় পড়তে আসছেন৷ চাকরী করতে একাই চলে যাচ্ছেন দূরের শহরে৷ আমার সাথে অন্তত ২৫/৩০ জন মেয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করেছেন দক্ষতার সাথে৷ এদের মধ্যে মাত্র একজন মেয়ে হিজাব পরতেন বাকিরাতো সাধারণ পোশাকই পরেন৷ এটাওতো বাংলাদেশ৷ শত বছরে রোকেয়া থেকে আজকের নারীদের অগ্রগতিটা বিপুল৷ এই ধারা থামানোর ক্ষমতা কারো নেই, মোল্লাতন্ত্রেরও নেই।
মতামত লেখকের নিজস্ব, সম্পাদক দায়ী নন।