ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ মতামত ]

শিক্ষকের জীবনমান বদলাতে সংস্কার শুরু হোক মর্যাদা দিয়ে

কে এম মোস্তাক আহম্মেদ
প্রকাশিত: ২০:৫১, ৭ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষকের জীবনমান বদলাতে সংস্কার শুরু হোক মর্যাদা দিয়ে
কে এম মোস্তাক আহম্মেদ

একটি জাতি বা রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ছাড়া যেমন কোনো সমাজ সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না, ঠিক তেমনি শিক্ষক ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থবহ ও মানসম্মত করে তোলা সম্ভব নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিক্ষককে বিবেচনা করা হয়েছে সমাজ গঠনের প্রধান কারিগর এবং আলোকবর্তিকাবাহী হিসেবে।

তবে আধুনিক সময়ের রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে শিক্ষক পেশা এবং শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নটি বারবার উপেক্ষিত থেকে গেছে। বর্তমানে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের সংস্কারমূলক আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন কারিকুলাম, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল সরঞ্জাম কিংবা অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে জোরালোভাবে। কিন্তু মৌলিক সত্যটি হলো- শিক্ষকের পেশাগত, আর্থসামাজিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষা খাতের কোনো মৌলিক বা ফলপ্রসূ সংস্কার সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগের সূচনা হওয়া উচিত শিক্ষকের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতা পেশাকে ঐতিহ্যগতভাবে ‘মহৎ পেশা’ বলে অভিহিত করা হলেও বাস্তবে এর সামাজিক ও আর্থিক মূল্যায়ন অত্যন্ত হতাশাজনক। অন্যান্য প্রথম শ্রেণির পেশা বা সরকারি চাকরির তুলনায় শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থান ও সুবিধাদি প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতনকাঠামো এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে একজন শিক্ষিত তরুণ বা মেধাবী গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকতাকে নিজের প্রধান ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন।

যখন একটি সমাজে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা অন্যান্য পেশাজীবীদের চেয়ে একজন শিক্ষককে কেবল আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে পড়তে হয়, তখন সেই সমাজের সামগ্রিক শিক্ষার মান নিম্নগামী হওয়া স্বাভাবিক। একজন শিক্ষক যদি নিজের মৌলিক চাহিদা মেটাতে বা পরিবার চালাতে প্রতিনিয়ত আর্থিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তবে তার পক্ষে পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতা নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় প্রায়শই দৃশ্যমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। আধুনিক ভবন নির্মাণ, ক্লাসরুমে প্রজেক্টর বা ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন কিংবা সুন্দর পাঠ্যবই মুদ্রণ অবশ্যই শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই অবকাঠামো পরিচালনার মূল কাণ্ডারি হলেন শিক্ষক নিজেই। একজন যোগ্য, অনুপ্রাণিত ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষক চাইলে একটি অতি সাধারণ বা বটতলার ক্লাসরুমকেও জ্ঞানের অনন্য কেন্দ্রে পরিণত করতে পারেন।

পক্ষান্তরে, অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত শ্রেণিকক্ষও অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি সেখানকার শিক্ষক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং পেশাগতভাবে অসন্তুষ্ট থাকেন। সুতরাং কাঠামোগত পরিবর্তনের আগে শিক্ষককে কেন্দ্র করে শিক্ষা ব্যবস্থার আত্মাকে জাগ্রত করাই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

শিক্ষকের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে- প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য এমন একটি মর্যাদাশীল ও বাস্তবসম্মত বেতনকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যা সমাজে তাদের সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচার নিশ্চয়তা দেয়। অন্যান্য প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বা শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শিক্ষকতা পেশায় সর্বোচ্চ মেধাবীদের আকৃষ্ট করা। নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কেবল সবচেয়ে যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব এবং স্থানীয় বা প্রশাসনিক অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকের পেশাগত সিদ্ধান্ত ও শ্রেণিকক্ষের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রদান করতে হবে। শুধু প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতি নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আধুনিক গবেষণাভিত্তিক পাঠদানের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের উদ্ভাবনী কাজ, গবেষণা বা সাফল্যকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

বিশ্বের যেসব দেশ শিক্ষায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের মূল রহস্য কিন্তু বিশাল অবকাঠামো নয়, বরং শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা জাপানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষকতা হলো অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পেশা। ফিনল্যান্ডে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ স্নাতকদেরই কড়া বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষকতায় আসার সুযোগ দেওয়া হয় এবং সমাজে একজন ডাক্তারের বা বিচারকের চেয়ে শিক্ষকের মর্যাদা কোনো অংশে কম নয়। সেই সব দেশে শিক্ষকরা কেবল সম্মানই পান না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও পান সর্বোচ্চ পেশাগত স্বাধীনতা। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা একটি সৃজনশীল, উদ্ভাবনী এবং ইতিবাচক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের মডেলেও বিশ্বের এই সফল দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে আত্মস্থ করা দরকার।

শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট অর্জন কিংবা পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার যন্ত্র তৈরি করার জন্য নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক বোধসম্পন্ন, সুনাগরিক এবং মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এই মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা প্রদানের মূল দায়িত্বটি পালন করেন শিক্ষক। যখন একজন শিক্ষক নিজে সমাজে অবহেলিত বা মর্যাদাহীন বোধ করেন, তখন তিনি কিভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্ম মর্যাদা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দ্যুতি ছড়াবেন? তাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রাথমিক শর্তই হলো শিক্ষককে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া।

শিক্ষা খাতের যে কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত পরিবর্তন এবং বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব। সংস্কারের আলো কেবল নতুন বই, সিলেবাস বা ডিজিটাল প্রযুক্তি আনলেই মিলবে না; সংস্কারের আসল আলো জ্বালতে হবে শিক্ষকের অন্তরে। যেদিন দেশের প্রতিটি শিক্ষক নিজেকে একজন সম্মানিত ও আত্মমর্যাদাশীল নাগরিক হিসেবে অনুভব করবেন, সেদিনই আমাদের শিক্ষা সংস্কার সত্যিকারের সফলতা লাভ করবে এবং একটি প্রজ্ঞাবান ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, শীর্ষ অর্থনীতি

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএ
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!