ডিএইতে চেয়ার দখলে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা
পছন্দের লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ ও টেন্ডারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একটি প্রভাবশালী চক্র। তাদের চাহিদামতো না চললে, অনৈতিক সুবিধা বা চাঁদা না দিলে কিংবা পছন্দের লোককে দায়িত্ব না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত সোমবারও খামারবাড়িতে তিন কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়। কয়েক ঘণ্টা পর অবশ্য সেই পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এর আগে গত বুধবার ভোরেও ডিএইর প্রধান কার্যালয়ের আশপাশের দেয়াল ও পিলারে ওই একই তিন কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। এতে তাদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কৃষি খাতের স্বার্থে অপসারণের দাবি জানানো হয়। ‘জাতীয়তাবাদী সচেতন কৃষিবিদ সমাজের’ ব্যানারে লাগানো এসব পোস্টারে ছিলেন ডিএইর পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন, প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক মুরাদুল হাসান এবং টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর।
ডিএইর প্রবেশপথ, ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন থেকে অধিদপ্তরের প্রধান ফটক পর্যন্ত বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে এসব পোস্টার দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বদলি ও পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরে নানা তৎপরতা শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন আবারো নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নতুন কর্মকর্তা বসাতে অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) এবং কৃষক দলের কিছু নেতা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন। তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর জন্য বিভিন্নভাবে তদবির করা হচ্ছে। তবে ওই তদবিরে সফল না হয়ে এখন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানো ও রাজনৈতিক তকমা দেওয়ার পথ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা পছন্দের ব্যক্তিকে পদায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে, তদবিরে সাড়া না দিলে কিংবা কোনো অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে সেই প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএইর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কথা না শুনলে, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দিলে কিংবা চাঁদা না দিলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার শুরু হয়। এখন সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হলো স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া। এর উদ্দেশ্য মূলত চেয়ার খালি করা।’ আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। আমার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। সরকার যখন যে নির্দেশনা দেয়, তা পালন করি। সরকার যেখানে বদলি করবে, সেখানে যাব। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া এভাবে স্বৈরাচারের দোসর ট্যাগ দিয়ে হেয় করা ন্যক্কারজনক।’
গত বুধবার ও গত সোমবার লাগানো পোস্টারে থাকা তিন কর্মকর্তার মধ্যে মুরাদুল হাসান ও সাখাওয়াত হোসেন উভয়েই ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুরাদুল হাসান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ছাত্র সংসদের ভিপি এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে, পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন পটুয়াখালী কৃষি কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ক্যাম্পাসের আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখসারিতে ছিলেন। অথচ চেয়ার দখলের উদ্দেশ্যে এখন স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া হচ্ছে।
মুরাদুল হাসান বলেন, ‘আমি গত ২৫ বছর ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক পদে আমার পদায়ন হয়েছে। ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অথচ এখন আমাকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলা হচ্ছে।’ তার দাবি, ‘মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করে আমার চেয়ার দখল করতে না পেরে একটি চক্র অপপ্রচারে নেমেছে। এই চক্র বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কথামতো না চললে বা অনৈতিক সুবিধা না দিলেই ফ্যাসিস্টের দোসর তকমা দেওয়া হয়।’
পোস্টারে থাকা আরেক কর্মকর্তা টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুরকে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন বলে প্রচার করা হলেও তার দাবি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেখানে ছাত্ররাজনীতি ছিল না। প্রায় দেড় দশক ধরে কৃষিতে অবদান রাখা তালহা জুবায়ের মাশরুর জাতীয় কৃষি পুরস্কারের স্বর্ণপদক, প্রথম আলো সিটিগ্রুপ কৃষি পুরস্কারসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বীকৃতি পেয়েছেন।
তালহা জুবায়ের মাশরুর বলেন, ‘কে কোন দায়িত্বে থাকবেন, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কোনো পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা আমার নেই। তবে কাউকে দায়িত্ব থেকে সরানোর জন্য যদি অসত্য তথ্য বা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করা হয়, সেটি শুধু একজন কর্মকর্তার জন্য নয়, পেশাদার প্রশাসনের জন্যও ক্ষতিকর।’
পোস্টারে থাকা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনও ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি পটুয়াখালী কৃষি কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ক্যাম্পাসের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের সম্মুখসারিতে ছিলাম। অথচ এখন আমাকে স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া হচ্ছে। মূলত চেয়ার দখলের জন্যই এসব করা হচ্ছে।’
ডিএইর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শুধু বদলি-পদায়ন নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন নিয়েও একটি পক্ষ তৎপর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এরই মধ্যে ১২ জন প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দায়িত্বে থাকা আরও কয়েকজন পিডিকে সরাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের পিডিদের ওপর টেন্ডার নিয়েও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চলছে। এতে রাজি না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে কর্মকর্তাদের কাজ, দক্ষতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা না গেলে এ ধরনের অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। অভিযোগের তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে রাজনৈতিক তকমা না দেওয়াই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একমাত্র পথ বলে মনে করেন তিনি।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারি চাকরিতে বদলি কিংবা পদায়ন নিয়ম মেনেই করা হয়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে ছবি টানিয়ে হেয় করা বা অন্য মাধ্যমে প্রচারণা চালানো অন্যায়। তিনি আরো বলেন, আমরা বিষয়টি নজরে রাখছি। বদলি-পদায়নে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। চাপ সৃষ্টি করে কেউ বদলি কিংবা পদায়ন করতে পারবে না।