শৈশবের থেকে বিশ্বজয়ের মুকুট, এবার বিদায়
বিশ্ব ফুটবলের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের শেষ পাতা লিখতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। শৈশবের শারীরিক সংকট, বার্সেলোনায় উত্থান, অসংখ্য শিরোপা, আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ হতাশা পেরিয়ে বিশ্বকাপ জয়—সবকিছুর পর এবার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
আগামীকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মাস মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার স্থানীয় সময় ৬ অক্টোবর রাত ৮টায় শুরু হবে ম্যাচটি। ফিফা ও মেসির নিজস্ব ওয়েবসাইটও ম্যাচটিকে আর্জেন্টিনার হয়ে তার বিদায়ী ম্যাচ হিসেবে নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশে অবশ্য কোনো টেলিভিশন চ্যানেল ম্যাচটির সম্প্রচার স্বত্ব পায়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি কোনো টিভি চ্যানেলে সরাসরি দেখা যাবে না ম্যাচটি। অনলাইনে ZEE5-এ ম্যাচটি দেখা যাবে বলে জানানো হয়েছে।
রোজারিও থেকে বিশ্বমঞ্চে
লিওনেল আন্দ্রেস মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ। তবে শৈশবে তার শরীরের বৃদ্ধিসংক্রান্ত সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়লে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তারকা থেকে হয়ে ওঠেন মহাতারকা, সারা বিশ্ব যাকে আজ ইতিহাসের সেরা অ্যাথলেট হিসেবে দেখে, তিনি আর মাত্র ১২ ঘণ্টা পরে জাতীয় দল থেকে নেবেন বিদায়, সারাবিশ্ব তাকে কিভাবে বিদায় জানায় সেটা দেখার অপেক্ষায় পুরোবিশ্ব।
২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় মেসির। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। বার্সেলোনার হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরে অসংখ্য শিরোপা জেতেন। এরপর ২০২১ সালে প্যারিস সেন্ট জার্মেই ও ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন।
অর্জনের তালিকা যেন রূপকথা
মেসির ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনের তালিকা ফুটবল ইতিহাসে বিরল। তিনি রেকর্ড ৮ বার ব্যালন ডিঅর জিতেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, ২০০৮ সালে অলিম্পিক সোনা, ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফাইনালিসিমা এবং একই বছর কাতার বিশ্বকাপ জয় করেন।
কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্জনগুলোর একটি। ৩৫ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকাপ জেতার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও পান তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলেছেন তিনি—যা তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।
ক্লাব ফুটবলেও তাঁর সাফল্য অসাধারণ। ফিফার হিসাবে ক্লাব পর্যায়ে তাঁর শিরোপার সংখ্যা ৪০। বার্সেলোনার হয়ে ৩৪টি শিরোপা জয়ের পর পিএসজিতে দুটি লিগ শিরোপা এবং ইন্টার মায়ামির হয়েও ট্রফি জিতেছেন তিনি।
যে অপূর্ণতা থেকে গেছে
এত অর্জনের পরও মেসির ক্যারিয়ারে অপ্রাপ্তির অধ্যায় ছিল দীর্ঘ। বিশেষ করে জাতীয় দলের হয়ে শুরুটা ছিল কঠিন। ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয় তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করেছিল। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে বদলে দেন নিজের ও আর্জেন্টিনার গল্প।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় সাফল্যের নতুন অধ্যায়। এরপর ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা ও কাতার বিশ্বকাপ জয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বড় অপূর্ণতাগুলো পূরণ করে।
তবে শেষদিকে আরেকটি বিশ্বকাপের আক্ষেপ নিয়ে জাতীয় দল ছাড়ছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। ওই টুর্নামেন্টে মেসি সিলভার বলও জেতেন।
প্রেম, বিয়ে ও তিন সন্তান
মাঠের বাইরেও মেসির জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো। রোজারিওতেই ছোটবেলায় তাঁদের পরিচয়। দীর্ঘ সম্পর্কের পর ২০১৭ সালের ৩০ জুন তাঁরা বিয়ে করেন।
মেসি-আন্তোনেলার তিন ছেলে- থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। থিয়াগোর জন্ম ২০১২ সালে, মাতেও ২০১৫ সালে এবং সিরোর জন্ম ২০১৮ সালে। পরিবারকে নিয়ে মেসির ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ও বিশেষ মুহূর্তে স্ত্রী-সন্তানদের মাঠে দেখা যায়।
এবার সত্যিই শেষ?
৩১ আগস্ট ২০২৬ মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। দুই দশকের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর তাঁর সিদ্ধান্তকে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামীকাল বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ তাই শুধুই একটি প্রীতি ম্যাচ নয়। ৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এটি আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামার উপলক্ষ। তাঁর বিদায়কে স্মরণীয় করে তুলতে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিশেষ আয়োজনও থাকছে।
এক নজরে মেসির শেষ ম্যাচ
- ম্যাচ: আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন
- তারিখ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, আর্জেন্টিনা; বাংলাদেশে ৭ অক্টোবর
- ভেন্যু: এস্তাদিও মাস মনুমেন্তাল, বুয়েনস এইরেস
- আর্জেন্টিনা সময়: রাত ৮টা
- বাংলাদেশ সময়: বুধবার ভোর ৫টা
- বাংলাদেশে টিভি সম্প্রচার: কোনো বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার নেই বলে স্থানীয় প্রতিবেদনগুলো জানিয়েছে
- অনলাইন: ZEE5-এ সরাসরি দেখার কথা জানানো হয়েছে।
রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটি যে স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল স্পেনের পথে, সেই স্বপ্নের প্রায় সবকটিই পূরণ হয়েছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক, ব্যালন ডি’অর—ক্যারিয়ারের প্রায় সব বড় মুকুটই এখন তাঁর দখলে। বাকি শুধু বিদায়ের মুহূর্তটি। আর সেই মুহূর্তের সাক্ষী হতে প্রস্তুত ফুটবলবিশ্ব।