ঢাকা,  সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ক্যাম্পাস ]

অপ্রতিম হত্যা: ১২ অসংগতি তুলে ধরে কুবিতে শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:৫৭, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপ্রতিম হত্যা: ১২ অসংগতি তুলে ধরে কুবিতে শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে কুমিল্লা জেলা পুলিশের (এসপি) সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্যের অসংগতি ও তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন।

Advertisement

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’ ও ‘জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, পুলিশের গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে মামলার আসামিদের বয়স নিয়ে অসংগতি রয়েছে। তাঁদের দাবি, আসামিরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত হলেও পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘বখাটে’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া পুলিশি বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার বিভিন্ন তথ্যের অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।

শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে ১২টি বিষয় তুলে ধরেন।

তাঁদের অভিযোগ, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও রাতেই তাঁকে খুঁজে বের করতে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, নিখোঁজ অপ্রতিমকে খোঁজা এবং পরদিন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাতেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার আগে ঘটনাস্থল ও মরদেহের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ সেখানে বেলা তিনটার দিকে উপস্থিত হয়। এ ছাড়া আসামি তুহিনের জবানবন্দিতে অপ্রতিমকে একটি খামারে হত্যার কথা বলা হলেও ওই স্থান থেকে ফরেনসিক টিম কোনো আলামত সংগ্রহ করেনি এবং যথাযথভাবে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

পুলিশের প্রেস ব্রিফিং নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ভাষ্য, ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় প্রেস ব্রিফিং হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় পরিবর্তন করে বেলা একটায় করা হয়। তবে পুলিশ নির্ধারিত সময়ের পর বেলা দুইটার দিকে ব্রিফিংয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হওয়ার আগেই প্রেস ব্রিফিং শেষ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

আসামি আনাসকে গ্রেপ্তার ও পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে আনাসকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও পরদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরে পুলিশ তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে। এ ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।

আসামিদের বয়স নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পুলিশের উল্লেখ করা বয়সের পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে আসামিদের বয়স নির্ধারণে ‘অসিফিকেশন টেস্ট’ (হাড়ের গঠন পরীক্ষা) করার এবং এর প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান তাঁরা।

এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে অতীতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ও মামলা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁদের আশ্রয় বা মদদ দিচ্ছেন কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের ‘কেবিজি’ নামের একটি গ্রুপের সদস্য বলে ধারণা করছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা কোটবাড়ি ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং এবং মাদকাসক্তদের কার্যক্রম তদন্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

গতকাল দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের বিষয়েও পুলিশ সন্তোষজনক তথ্য বা জবাব দেয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ১৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের দেওয়া চার দফা দাবির বিষয়ে পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে কোনো বক্তব্য না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার মূল তদন্তের পরিবর্তে ‘ব্যাড প্যারেন্টিং’ প্রসঙ্গ সামনে এনে ঘটনার দায় অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, হত্যার প্রকৃত কারণ, হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাঁদের পেছনে কোনো মদদদাতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রকাশ করতে হবে।

কুবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহনাজ বলেন, “পুলিশ এখানে দ্বিচারিতা করছে। সঠিক তথ্য লুকানোর চেষ্টা করছে। তারা অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। তা না হলে সংবাদ সম্মেলনে সঠিক তথ্যই দিত।”

আরেক শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, “পুলিশ প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করছে না। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার পার্থক্য আছে। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”

ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফ হাসান জিদনী বলেন, ‘পুলিশ গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছে, তারা আনাস নামে কাউকে ধরেনি। তবে হত্যার দিন আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন আনসার ক্যাম্প (ছাত্র আন্দোলন চত্বর) থেকে আনাস নামে একজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিন এসআরবির প্রেস ব্রিফিংয়ে আমরা দেখতে পাই, আনাসকে সকাল সাতটায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নাকি কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপারই জানেন না।

আমাদের মনে হয়, আসামিদের গ্রেপ্তার ও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে গোপনে তদন্ত করা দরকার। এই হত্যাকাণ্ডে একজন অভিযুক্তের বয়স ১৫ বছর দেখিয়ে তাকে কারাগারে না পাঠিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আমার মনে হয়, তার বয়স কম দেখানোর পেছনে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

পুলিশ আমাদের বলে তারা তদন্ত করবে, মূল ঘটনা উদ্‌ঘাটন করবে। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে অনেক কিছুই বুঝি। বিষয়গুলো ঠিক করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি টিম গঠন করে তদন্ত করা দরকার, যাতে কোনো অপরাধীকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া না হয়। অপরাধী কিশোর, যুবক কিংবা বয়স্ক যেই হোক, গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আদালতে পাঠাতে হবে। অপ্রতিম হত্যার বিচারের পাশাপাশি কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও প্রশাসনকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে হবে।’

প্রসঙ্গত, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অপ্রতিম হত্যার বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ এবং চার দফা দাবি জানিয়েছিলেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!