ড্রাগনে স্বপ্ন বুনছেন আরব আলী
দেশে এরইমধ্যে ড্রাগন ফল বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ ফল যেমন আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু তেমনি তার ফুলও গভীর রাতের সুগন্ধের রানী নামে খ্যাত। কখনো বাড়ির উঠানে, ছাদের টবে, কখনো বা ক্ষেত খামারে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন কৃষকরা।
বাগেরহাটের ফকিরহাটের আরব আলী শেখ ২০২১ সালে ৫ শতক জমিতে শুরু করেন ড্রাগন চাষ। প্রথম বছর ৭ হাজার টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করলেও এ বছর এরইমধ্যে ২০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন তিনি। এখন ৪০ শতক জমিতে আরব আলীর ড্রাগন বাগান।
ড্রাগন বাগানে এক সঙ্গে তিন ফসল ফলানো সম্ভব। ড্রাগন গাছের ফাঁকে পটল নিচে ডাঁটাশাক চাষ করছেন কৃষকরা। ড্রাগন ফল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রসিদ্ধ ফল যা বর্তমানে আমাদের দেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা র্অজন করেছে।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০০৭ সালে থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে এই ফলের বিভিন্ন জাত আনা হয়। ড্রাগন ফলের গাছ এক ধরনের ক্যাকটাস জাতীয় গাছ। এ গাছের কোনো পাতা নেই। ড্রাগন ফলের গাছ সাধারণত ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। একটি ফলের ওজন ১৫০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। ড্রাগন ফল সাধারণত তিন প্রজাতির হয়ে থাকে-ক্যারোটনি সমৃদ্ধ থাকায় চোখ ভালো রাখে। আঁশের পরিমাণ বেশি থাকায় হজমে সহায়তা করে।
এছাড়া আঁশ শরীরের চর্বি কমায়। এ ফলে বিদ্যমান প্রোটিন শরীরের যাবতীয় বিপাকীয় কাজে সহায়তা করে। এর ক্যালসিয়াম হাড় শক্ত ও দাঁত মজবুত রাখে। ভিটামিন বি-৩ রক্তের কোলেস্টেরল কমায় এবং ত্বক মসৃণ রাখে। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বক, দাঁত ও চুল ভালো রাখতে সাহায্য করে। ড্রাগন ফল রোপণের জন্য উপযোগী সময় হলো মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য অক্টোবর।
ড্রাগন ফল খুব দ্রুত বাড়ে। একটি ১ বছরের গাছ ৩০টি পর্যন্ত শাখা তৈরি করতে পারে এবং ৪ বছর বয়সী একটি ড্রাগন ফলের গাছ ১৩০টি পর্যন্ত প্রশাখা তৈরি করতে পারে। তবে শাখা প্রশাখা উৎপাদন উপযুক্ত ট্রেনিং ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২ থেকে ১৮ মাস পর একটি গাছ ফল ধারণ করে। ফল সংগ্রহের ৪০ থেকে ৫০টি প্রধান শাখায় প্রত্যেকটি ১ বা ২টি সেকেন্ডারি শাখা অনুমোদন করা হয়। ফলে রোগ বালাই খুব একটা চোখে পড়ে না। তাবে কখনো কখনো এ গাছে মূলপঁচা, কান্ড ও গোড়া পঁচা রোগ দেখা যায়।
ড্রাগন চাষি আরব আলী শেখ বলেন, ২০২১ সালে ফকিরহাট কৃষি অফিসের সহযোগিতায় নগদ টাকায় জমি রেখে ড্রাগন চাষ শুরু করি। প্রথম বছর ৭ হাজার টাকা এবং এ বছর ২০ হাজার টাকা বিক্রি করেছি। এলাকার শিক্ষিত যুবকরা ড্রাগনের বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেকে আসছেন বাগান তৈরির পরামর্শের জন্য।
নূর ইসলাম খোকন বলেন, আরব আলীর ড্রাগন দেখে আমারও ইচ্ছা ড্রাগনের বাগান করবো।
সাগর আলী শেখ বলেন, আরব আলী দুই বছর ধরে ড্রাগনের চাষ করছেন। ড্রাগনের চাষ দেখে এলাকার অনেকের ভালো লেগেছে এবং লোকজন এসে আরব আলীর কাছে পরার্মশ নিচ্ছেন। ড্রাগন চাষে এলাকার লোকজন আগ্রহী হচ্ছেন।
ফকিরহাট উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিপুল পাল বলেন, ২০২১ সালে কৃষক আরব আলী শেখ ৫ শতক জায়গায় প্রথম ড্রাগন শুরু করেন। এখন কৃষক আরব আলী ৪০ শতক জায়গায় ড্রাগনের চাষ করছেন। আরব আলীর ড্রাগনের চাষ দেখে এলাকার আরো ২৫-৩০ জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ফকিরহাট উপজেলার পিলজংগ ইউনিয়নে চামারের বটতলা নামক জায়গায় এসএসসিপি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক আরব আলী শেখকে ড্রাগন চাষের একটি প্রদর্শনী দিয়েছিলাম। চারা লাগানোর এক বছরের মধ্যে ফল আসতে শুরু করে। আরব আলীর বাগানে ১৪ মাসে ফল আসে। তিনি এখানে প্রথম ড্রাগন চাষ শুরু করেন। অনেকেই এখন ড্রাগন চাষে ঝুঁকছেন।
তিনি আরো বলেন, পুষ্টিগুণ, আকার-আকৃতি ও দামে এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্যাকটাস জাতীয় গাছ হওয়ায় রোগ বালাইও কম। চাষিরা সহজে এ ফল চাষ করতে পারেন। আরব আলীর মতো নিজ উদ্যোগে এবং কৃষি বিভাগের সহায়তায় অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।