লাভ কমায় ঝালকাঠিতে পেয়ারা চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক
‘বাংলার আপেল’ খ্যাত পেয়ারা চাষ একসময় ঝালকাঠির কৃষকদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হলেও বর্তমানে সেই চাষেই আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক। মৌসুম শেষে উৎপাদন, শ্রম ও বাজারজাতকরণের খরচের সঙ্গে বিক্রির আয় মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ না থাকায় হতাশ তারা। এর প্রভাব পড়ছে আবাদি জমির পরিমাণেও। গত দুই বছরে জেলায় পেয়ারা চাষের জমি কমেছে আট হেক্টর।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার চার উপজেলায় ৫৫৪ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৬২৩ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলায় ৫৬২ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছিল। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয় ৬ হাজার ৪২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আবাদ কমেছে আট হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ৪১৯ মেট্রিক টন।
.png)
চাষি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অন্যান্য বছরের তুলনায় পেয়ারার ফলন কম হয়েছে। ভিমরুলীর ভাসমান হাটে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা আকার ও রংভেদে প্রতি মণ পেয়ারা ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে কিনছেন।
কৃষকরা বলছেন, পেয়ারা সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং বাজারজাতকরণে যে ব্যয় হয়, সে তুলনায় বিক্রিমূল্য কম। ফলে মৌসুম শেষে অনেকেরই কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকছে না।
কৃষক সুজন হালদার শানু বলেন, পেয়ারা বাগানে নিয়মিত পরিচর্যা, সার ও কীটনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি মৌসুমে প্রতিদিন ফল সংগ্রহ করতে হয়। একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হয় প্রায় ৮০০ টাকা। অথচ ওই শ্রমিক দিয়ে সংগ্রহ করা পেয়ারা বিক্রি করে অনেক সময় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পাওয়া যায়। কোনো কোনো দিন এর চেয়েও কম দামে পেয়ারা বিক্রি করতে হয়।
তার মতে, একই জমিতে আমড়া কিংবা অন্য কোনো ফসল চাষ করলে তুলনামূলক বেশি লাভ পাওয়া যায়। এ কারণে অনেক কৃষক পেয়ারা চাষ থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
কীর্তিপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও কৃষক ভবেন্দ্রনাথ হালদার বলেন, পেয়ারা চাষে আগের মতো লাভ নেই। চলতি মৌসুমে অনাবৃষ্টির কারণে ফলনও ভালো হয়নি। এর ওপর পেয়ারায় এনথ্রাক্স বা কালো ছিট পড়া রোগ দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, পেয়ারা পাকতে শুরু করলে প্রতিদিন গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে বাজারে নিতে হয়। এ কাজে একজন শ্রমিকের পেছনে প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হয়। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওই পরিমাণ পেয়ারাই বিক্রি করে ৪০০ টাকা পাওয়া যায়।
স্বরূপকাঠির পাইকার নোমান বলেন, চলতি বছর পেয়ারার ফলন তুলনামূলক কম হয়েছে। তারা ঝালকাঠির চাষিদের কাছ থেকে পেয়ারা কিনে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। আকার ও রংভেদে প্রতি মণ পেয়ারা ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে কেনা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতি মণ পেয়ারায় পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ২০০ টাকা লাভ থাকে। তবে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও খাবারের খরচ বাদ দিলে প্রকৃত লাভ নেমে আসে প্রায় ১০০ টাকায়।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পেয়ারা চাষে কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহায়তায় পেয়ারা চাষিদের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর তুলনামূলকভাবে পেয়ারার আবাদ কমছে। চলতি বছরও আবাদ কম হওয়ায় অনেক চাষি প্রত্যাশিত দাম পাননি। এতে তারা হতাশ হয়েছেন। পেয়ারা চাষে কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।