জানা গেছে, শাস্তির বিরুদ্ধে মাইনুল হাসান আপিল করেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তার বাধ্যতামূলক অবসরের শাস্তি কমিয়ে ‘গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে ৫ বছরের জন্য’ বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত ৯ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত আদেশে চাকরি ফিরে পান সাবেক সার্ভেয়ার মাইনুল।
.png)
পদ্মাসেতু প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের নামে অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের সাবেক ভূমি কর্মকর্তা (সার্ভেয়ার) মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে।
আদেশে জানানো হয়, মাদারীপুর জেলার এল এ শাখার দায়িত্ব পালনকালে মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের নামে অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে দেখা যায় মাদারীপুর জেলাধীন শিবচর উপজেলায় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অধীন ০৬/২০১৭-২০১৮ নম্বর এল এ কেসে অধিগ্রহণ করা সাবাজনগর মৌজার বিআরএস ৩৮৯, ৩৯৯, ৫০০, ৪০৪, ৪০৫, ও ৪০৬ নম্বর দাগে মোট ৩ দশমিক ৩৭ একর জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। পরে আলী হোসেন মল্লিক ও মো. শাহীন গং জাল কাগজপত্র তৈরি করে এ খাস খতিয়ানভুক্ত দাগের জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার আবেদন করলে দাখিল করা জাল কাগজপত্র কোনো প্রকার যাচাই না করে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে সুপারিশ ও সহায়তা করেন।
সাবেক সার্ভেয়ার মাইনুল এল এ শাখায় দায়িত্ব পালনকালে সাবাজনগর মৌজার অধিগ্রহণ করা এ দাগের মোট ৩ দশমিক ৩৭ একর জমির ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানকালে তার ওপর অর্পিত সরকারি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে ও সরকারি স্বার্থের তোয়াক্কা না করে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে সুপারিশ ও সহযোগিতা করে সরকারের মোট এক কোটি ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৮২ টাকা ক্ষতিসাধন করেন এবং নিজে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এ বিভাগীয় মামলায় তাকে অসদাচরণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে বিধি মোতাবেক তাকে চাকুরি হতে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ গুরুদণ্ড আরোপ করা হয়।
সাবেক সার্ভেয়ার মাইনুল এল এ শাখায় দায়িত্ব পালনকালে সাবাজনগর মৌজার অধিগ্রহণ করা ৩ দশমিক ৩৭ একর জমির ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানকালে সরকারি স্বার্থের তোয়াক্কা না করে ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে সুপারিশ ও সহযোগিতা করে সরকারের মোট এক কোটি ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৮২ টাকা ক্ষতিসাধন করেন।
এ বিভাগীয় মামলায় বর্ণিত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মাইনুল হাসানের আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আপিল মামলা করা হয়। আপিল শুনানিতে অভিযোগের বিষয়ে আপিলকারীর বক্তব্য এবং সরকারপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা হয় বলেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশে জানানো হয়।
এতে আরো জানানো হয়, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বিভাগীয় মামলা পরিচালনায় বিধিমালায় বর্ণিত নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে, কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়নি, অভিযোগের ওপর প্রাপ্ত তথ্যাদি যথার্থ। আপিল শুনানিতে আপিলকারীর বক্তব্যও সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি।
পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হলেও তদন্তে তার বিরুদ্ধে একই বিধি মোতাবেক অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সার্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শেষে অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আরোপিত দণ্ড মাত্রাতিরিক্ত মর্মে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে; এজন্য বিধি মোতাবেক মাইনুল হাসানকে বিভাগীয় মামলায় ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ গুরুদণ্ডাদেশের পরিবর্তে বর্তমান বেতন গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে ৫ বছরের জন্য অবনমিতকরণ লঘুদণ্ড আরোপ করা হলো। দণ্ডের মেয়াদকাল বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির জন্য গণনাযোগ্য হবে না।
অভিযুক্ত কর্মচারীকে (মাইনুল) বাঁচিয়ে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে সহায়তা করার জন্য দোষী। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একজন সরকারি কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর সুপারিশ বাতিল করে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শাস্তি কমানো অধস্তন কর্মকর্তাদের জন্য ভালো নজির না।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত কর্মচারীর (মইনুল) বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত। এই কর্মচারীকে বাঁচিয়ে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে সহায়তা করার জন্য দোষী। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একজন সরকারি কর্মকর্তা বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার বাধ্যতামূলক অবসর সুপারিশ বাতিল করে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়। এটি সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।