ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

হারুন স্যার

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৯:০০, ৩০ জুন ২০২৩
হারুন স্যার
ছবি: প্রতীকী, গ্রামের ঈদের মাঠ

হারুন স্যার। ঝাড়কাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমার প্রথম বিদ্যাপীঠ। হারুন স্যারের কাছ থেকেই আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম মানুষের চন্দ্রবিজয়ের কথা। দিনটি ছিল ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসের কোনোদিন।

বর্ষাকাল। আমাদের পুরো এলাকা প্লাবিত। বানের জল সরে যেতে আরো মাস খানেক সময় লাগবে। প্রতি বছরই লাগে। আষাঢ়,শ্রাবণ,ভাদ্র। বছরের তিন মাস এলাকাবাসীরা জলজ জীবন যাপন করে। মাছেদের মত। 

গোধূলির পূর্বমুহূর্ত। বালিজুরি হাট থেকে ফিরছি  আমরা। ডিঙি নৌকায় করে। নৌকা ভর্তি মানুষ।  সম্ভবত বুধ বার। কারণ, এই দিনে বালিজুরি বাজারে সাপ্তাহিক হাট বসে।

Advertisement

দিগন্ত বিস্তৃত জলমগ্ন প্লাবিত প্রান্তর। আম্রিতলা থেকে ঘুঘুমারি অবধি। পরিচ্ছন্ন আকাশ। কোনো মহাকাশ যানের মতন তরতর করে ছুটে চলেছে আমাদের ডিঙি নৌকা। গোধূলির সময়। কনে দেখা আলোয় আকাশ আর প্রান্তর মিলে একাকার। একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশ জুড়ে।

নৌকার গলুইয়ের কাছে বসে আছি আমি। আমার সামনেই বসা হারুন স্যার। গলুই থেকে সামনের দিকে প্রসারিত পাটাতনের ওপর। আমি উনার স্কুলে পড়ি না। স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি আমার। দাঁড়ের বৈঠার ছিটকে ওঠা জলে আমার শরীরের ডানদিকটা ভিজে একাকার। একটু পরেই প্রান্তর আর আকাশ জুড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে। শুরু হবে আমাদের নক্ষত্রের আলোয় পথ চলা।

হারুন স্যার নৌকার সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, “চন্দ্র মিশন সম্পন্ন করে এপোলো-১১ পৃথিবীতে ফিরে আসছে!” আমরা হারুন স্যারের কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝি না। কিন্তু নৌকায় দণ্ডায়মান এবং উপবিষ্ট সবাই তার আঙুল অনুসরণ করে আকাশে তাকাই। ওখানেও  অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। একটা উজ্জ্বল তারা দিগন্তের ওপর দিয়ে উত্তরের দিকে চলে যাচ্ছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। স্বপ্ন নয়। কারণ আমরা সবাই দেখছি এক সঙ্গে! এই ছুটে যাওয়া তারাকে আমরা পলায়নরত শয়তানের দিকে ফেরেশতাদের ছুঁড়ে দেওয়া প্রজ্বলিত তীর বলেই জানি!

মাত্র একটা দৈনিক পত্রিকা, সম্ভবত ‘দৈনিক ইত্তেফাক’! দেশ তথা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে এই এলাকার প্রধানতম যোগসূত্র। তিন চার দিন পর পর আসে। আসে প্রধান শিক্ষক ঝাড়কাটা প্রাইমারি স্কুলের নামে। আমিনুল ভাই নামের একটা ডাকপিয়ন মেলান্দহ বাজার পোস্ট অফিস থেকে নিয়ে আসে। আমি কখনোই মেলান্দহ বাজারে যাইনি। মেলান্দহ বাজারের কাছে রেলস্টেশন। এখান থেকে ট্রেনে করে পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় চলে যাওয়া যায়।

আমাদের দেখা সেই অদ্ভুত তারাটা আসলেই কোন নভোযান ছিল কিনা আমি নিশ্চিত নই। তবে বড় হওয়ার পরে পাঠ্য পুস্তকে পড়েছি ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে আমেরিকার নভোযান এপোলো-১১ মানুষের প্রথম চন্দ্রমিশন সম্পন্ন করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল।

হারুন স্যারদের পরিবার আমাদের এলাকার ভেতরে সম্ভ্রান্ত পরিবার। তার বাবাও ছিলেন শিক্ষক। দুই জেনারেশন শিক্ষিত এই পরিবার ঝাড়কাটার মতো অজপাড়াগাঁয়ে কৌলীন্যভাব বজায় রেখে কিভাবে টিকে ছিল তা এখনো আমার ভাবতে অবাক লাগে।

তিন বছর পরের কথা। বিশাল একটা যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৯৭২ সাল। ক্লাস টুতে পড়ি। ঝাড়কাটা প্রাইমারি স্কুলে। স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা মফিজ। সম্পর্কে আমার চাচির পিতা। ভীষণ দর্শন চেহারার। আমরা শিশুরা তার ভয়ে সন্ত্রস্ত। উনার কারণে স্কুলের দুই তিন শত গজের ভেতরে জিগার আর নিশিন্দি গাছের ডাল বিলীন হয়ে গেছে। একদিন তৃতীয় পিরিয়ডে মোটা একটা ‘জিগার’ গাছের ডাল দিয়ে মনের আনন্দে মাওলানা মফিজ ক্লাস থ্রির ছাত্রদের প্রহার করছিলেন। একই সময়ে আমাদের ক্লাসের সিরাজ স্যার টেবিলের ওপরে পা তুলে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। তিনি আসতেন যমুনা তীরের ‘গোবিন্দি চর’ থেকে। যমুনার ভাঙনে বর্তমানে এই চর পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে গেছে। পাশের ক্লাস থেকে বেতের শপাং শপাং শব্দ ভেসে আসছে। আমার খুব ইচ্ছে হলো একবার দেখে আসি! বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে ক্লাস থ্রির দরজার কাছে দাঁড়ালাম। উঁকি দিতে না দিতেই মফিজ স্যার পেছন ফিরে তাকালেন। তার শ্রবণশক্তি খুবই প্রখর। বাদুড়, চামচিকা, বিড়াল কিংবা প্যাঁচার মতো। আমার পায়ের শব্দকে অনুসরণ করে বিদ্যুৎবেগে আমার পেছন পেছন ছুটলেন। আমি দৌড়ে ফিরে এসে নিজ বেঞ্চে বসার পরও শেষ রক্ষা হলো না। মফিজ স্যার ক্লাসে ঢুকে আমার ডান হাতের বাহুতে তার সর্বশক্তি দিয়ে ‘জিগারের’ ডালটা ভেঙে ফেললেন! ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বিহ্বল। আমার ডান হাতের বাহুর ওপরের অংশে শুধু জ্বালা করছে। আর কোনো কষ্ট নেই। শুধু আমার হৃদপিণ্ডটাই কামারের হাঁপরের মতো ধুকপুক করছে!

ডাল ভাঙার শব্দে সিরাজ স্যারের প্রাত্যহিক দুপুরের ঘুমও ভেঙে গেছে! তিনিও মহা কনফিজড। তবে হেডস্যার অর্থাৎ হারুন স্যারও ইতিমধ্যে চলে এসেছেন। আমাকে আদর করে মফিজ স্যারকে নিয়ে তিনি তার রুমে চলে গেলেন। ইতিপূর্বেও মফিজ স্যারের বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল। কয়েকদিন পরই দেখলাম মাওলানা মফিজ স্যারের বদলি হয়ে গেছেন। আমাদের গ্রাম থেকে ৫ মাইল দূরে সুখ নগরী হাটখোলা প্রাইমারি স্কুলে। আমার নানা বাড়ির পাশে। খরকা বিলের ধারে স্কুল। এই এলাকায় জিগার ও নিশিন্দির গাছ জন্মায় না। প্রতিদিন তাকে বাড়ি থেকে ৪ মাইল পথ হেঁটে আসতে হবে।

আমাদের পড়ালেখার ব্যাপারে হারুন স্যারের ছিল প্রবল যত্ন ও আগ্রহ। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার আগে বাকের স্যার নামের একজন টিচারকে আমাদের জন্য নিয়োজিত করে দিলেন। তিনি হাতে ধরে আমাদের সবচেয়ে জটিল ‘সরল অংক’ শিখালেন। তার পরেও বৃত্তি পরীক্ষায় আমি ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেলাম না।

হারুন স্যার আমাকে বললেন, “আসাদ, তুই যদি শুধু তোর মুখস্ত করা ‘আমাদের গ্রাম’ রচনার নামটা বুদ্ধি করে ‘আদর্শ গ্রাম’ লিখতি তাহলে তোর ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পাওয়া কেউই ঠেকাতে পারতো না!”

অসাধারণ সামাজিক দক্ষতা এবং প্রবল সেন্স অব হিউমারের অধিকারী হারুন স্যার। বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতাও অসাধারণ। প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মাঠে আমাদের এলাকার সব মানুষ একত্রিত হয় শুধুমাত্র হারুন স্যারের মুখ থেকে কৌতুকপূর্ণ অথচ শিক্ষণীয় বক্তৃতা শোনার জন্যে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজনেরা ঈদের মাঠে একত্রিত হতেই সকাল নয়টা বেজে যায়। এটা একটা নতুন ঈদের মাঠ। তেঘরিয়া গ্রামের মানুষদের সঙ্গে ঝাড়কাটা গ্রামের মানুষদের বিবাদের কারণে এর সৃষ্টি। মাঠের পশ্চিম সীমানায় মিম্বর এর পেছনে একটা বটগাছের চারা লাগানো হয়েছে। এই গাছ শুধুমাত্র ইমাম সাহেবকেই ছায়া দিতে সক্ষম। কাজেই প্রখর রোদের ভেতরে হারুন স্যার যখন কালো ছাতা মাথায় দিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর উদ্দেশে অঙ্গভঙ্গি করে বক্তৃতা আওড়াতে থাকেন, তখন তাদের আনন্দ আর হাসির দমকে মাথার ওপরের শত শত কালো ছাতাগুলো হেমন্তের ধানক্ষেতের মতো দুলতে থাকে। ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে একাকার হয়ে যায়! জীর্ণ ক্লিষ্ট এই জনপদের জন্য ঈদ তখন সত্যিকারের ঈদ হয়ে ওঠে!

হারুন স্যারের দুই ছেলে। কামরুল আর শামিম। দুজনেই আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট। কামরুলের ভেতরে একটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ভাব আছে। আমাকে দেখলেই সে দশ হাত দূর থেকেই সালাম দিয়ে বসে। আমার মাত্র দুই ক্লাস নীচে পড়ে। যতবারই কামরুলের সঙ্গে আমার দেখা হয় ততবারই সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “ভাইজান, আপনি কেমন আছেন?” এই আদব কায়দার উত্তরাধিকারী সে বংশানুক্রম প্রাপ্ত হয়েছে।

অন্যদিকে শামিম দুরন্তপনার চরম নিদর্শন। আমাদের কেন, কোনো স্যারকে দেখলেও সে সালাম দেয় না। এই ছেলেটিকে নিয়ে হারুন স্যার আপাতভাবে মনোকষ্টে থাকেন। সারাদিনমান সে শুধু খেলাধুলা করে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। পড়াশুনা করে না। এমনকি হারুন স্যারের কথাও শুনে না। তবে এটাও তিনি ঠিক জানেন যে শামিমের মাথা খুব ভালো। কোন পড়াই একবারের বেশি দেখতে হয় না তাকে! অন্যদিকে কামরুলের ভেতরে এক্সাম-ফোবিয়া আছে। ক্লাসে ভালো করলেও পরীক্ষায় সে প্রতিনিয়তই খারাপ করে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা সে সম্পন্নই করতে পারেনি। আমি মাদারগঞ্জ থানার ভেতর থেকে সর্বপ্রথম ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়েছিলাম। ফলে হারুন স্যার আমাকে নিয়েই গর্ব প্রকাশ করেন।

১৯৮৩ সাল। আমি ক্যাডেট কলেজের ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। সামনে আমাদের এইচ এস সি পরীক্ষা। কলেজের শেষ টার্ম অ্যান্ড ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। শামিম সেবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। তার পরীক্ষার ফলাফল কেমন হবে সেটা নিয়ে হারুন স্যার আদৌ নিশ্চিত নন।

শামিম তার বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গেছে। দুই তিন দিন পর গভীর রাতে হারুন স্যার কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। আমার পিতা ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শামিম তার বন্ধুদের সঙ্গেই কক্সবাজার থেকে ফিরেছে। কিন্তু জীবিত হিসেবে নয়! বন্ধুদের ভাষ্যমতে সৈকতে জলের ভেতরে খেলার সময়ে শামিম কখন ঢেউয়ের তলে চলে গিয়েছিল সেটা তারা খেয়াল করেনি। পরে তারা তার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে।

একমাস পরের কথা। শামিমের পরীক্ষার ফলাফল বেড়িয়েছে। শামিম ৪টা বিষয়ে লেটার পেয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করেছে। আমাদের হাইস্কুলের রেজাল্ট যথেষ্ট ভালো। গুরুজনরাও খুব খুশি। শুধু বৃষ্টির পরে হারুন স্যারের মুখে রঙধনুর সাত রঙ মিশে গিয়ে তার মুখমণ্ডলকে এক অদ্ভুত বিবর্ণতা দিয়েছে।

হারুন স্যারের ভেতরে এর পরেও আমরা কোন ব্যত্যয় কেউ খেয়াল করিনি। তিনি আগের মতোই তার স্কুলের জন্যে কাজ করতেন। শুধু তাকে আর কোনদিন ঈদের মাঠে বক্তৃতা দিতে দেখা যায়নি। আর একটা বিষয় শুধুমাত্র খেয়াল করার মতো ছিল। কামরুলকে তিনি কখনো একা হতে দিতেন না।

স্কুল থেকে এক মাইল দূরে হারুন স্যারদের বাড়ি। প্রতিদিন সকাল-বিকেল একটা দৃশ্য সবার কাছে সাধারণ হয়ে গিয়েছিল। হারুন স্যার কামরুলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ঝাড় কাটা প্রাইমারি স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছেন। দূর থেকে মনে হয় যেন দুই অসম বয়সী বন্ধু পরস্পরের হাত ধরাধরি করে সৈকতের উল্টোদিকে হাঁটছে। পেছনে গর্জন করতে করতে মিলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র!

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!