সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
মধ্যযুগীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তি, মানবতা এবং প্রগতির দীপশিখা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। উনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরুষ এই মনীষী তাঁর সময়কে অতিক্রম করে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জন্মের দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর তাঁর চিন্তা, কর্ম ও আদর্শ আমাদের বিস্মিত ও অনুপ্রাণিত করে।
বাংলাদেশে তাঁর অবদান নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হলেও বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা অপরিসীম। অনেকেই তাঁকে কেবল একজন পণ্ডিত হিসেবে জানেন, অথচ তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, ভাষাসংস্কারক, সমাজসংস্কারক, মানবতাবাদী ও দার্শনিক চিন্তার অধিকারী।
.png)
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অদম্য অধ্যবসায় ও অসাধারণ মেধার কারণে সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি “বিদ্যাসাগর” উপাধিতে ভূষিত হন, যার অর্থ— ‘বিদ্যার সাগর’।
সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেও তিনি কেবল প্রাচীন জ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সমাজের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ এবং আধুনিক শিক্ষা। তাই পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত সাহসী ও ব্যতিক্রমী।
নারী শিক্ষার বিস্তার এবং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সমাজের প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিধবা নারীদের অমানবিক জীবনযাত্রার অবসান ঘটাতে তিনি অক্লান্ত সংগ্রাম চালান। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ প্রণয়ন করে। এটি ছিল উপমহাদেশের সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
বাংলা ভাষার বিকাশেও তাঁর অবদান অনন্য। তিনি বাংলা বর্ণমালা ও বানানরীতিকে আরও সহজ, সুসংহত ও যুক্তিসঙ্গত রূপ দেন। তাঁর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা ভাষা শিক্ষার ইতিহাসে এক অমর গ্রন্থ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর হাতে হাতে পৌঁছেছে। বাংলা গদ্যকে সহজ, প্রাঞ্জল ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য।
তবে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর মানবিকতা। দরিদ্র, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। নিজের উপার্জনের বড় অংশ তিনি ব্যয় করতেন অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে। এজন্য তাঁকে অনেকেই ‘দয়ার সাগর’ বলেও অভিহিত করেছেন।
উনবিংশ শতকের বাঙালি সমাজে যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, শিক্ষা বিস্তার এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তার ফল আমরা আজও ভোগ করছি। বাঙালির আধুনিক চেতনা, আত্মপরিচয় ও সামাজিক অগ্রগতির ইতিহাসে তাঁর নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর জন্মদিনে (২৬ সেপ্টেম্বর) এই মহান শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও মানবতাবাদীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
— হারুন-অর-রশীদ খান, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।