নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের টিউশনি নির্ভর জীবন, স্বপ্নপূরণে এক বাড়তি লড়াই
সাতটায় টিউশনি দিয়ে দিনের শুরু ফারহানা রিজুর। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, ল্যাব ও ক্লাস টেস্ট। দিনের একাংশ কাটে শ্রেণিকক্ষে, আরেক অংশ অন্যকে পড়িয়ে। দিন শেষে নিজের পড়াশোনার জন্য সময় বের করাও হয়ে ওঠে কঠিন। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রতিদিনই চালিয়ে যেতে হয় লড়াই।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা রিজুর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের চিত্র এমনই। তাঁর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন মানে শুধু ক্লাস, বন্ধু কিংবা ক্যাম্পাসের আড্ডা নয়; এর বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে টিউশনি ও আর্থিক দায়িত্ব।
ফারহানা রিজু বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনটা শুধু ক্লাস, বন্ধু আর ক্যাম্পাসের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটা বড় অংশজুড়ে আছে টিউশনি এবং দায়িত্ব। সকাল সাতটার টিউশনি দিয়ে দিনের শুরু। সারাদিন কাটে ক্লাস, ল্যাব এবং ক্লাস টেস্টের মধ্য দিয়ে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিকেলে ছুটতে হয় অন্যকে পড়াতে। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা আর টিউশনির ভিড়ে কখনো কখনো নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও দায়িত্বের কাছে ক্লান্তিকে হার মানিয়ে এগিয়ে চলি নিজের স্বপ্নকে ছুঁতে।’
ফারহানার এই অভিজ্ঞতা নোবিপ্রবির অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই পরিচিত। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তাঁরা। কারও লক্ষ্য গবেষক হওয়া, কেউ শিক্ষকতা কিংবা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পড়াশোনা শেষে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান অনেকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে এগোতে গিয়ে তাঁদের একটি বড় অংশকে শুরুতেই হিসাব মেলাতে হয় জীবনযাপনের খরচের।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীকেই পরিবার ছেড়ে নতুন পরিবেশে জীবন শুরু করতে হয়। বাড়িভাড়া বা মেসের খরচ, খাবার, যাতায়াত, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল, বই-খাতা এবং ফটোকপির মতো নিয়মিত ব্যয় সামলাতে হয় নিজেদেরই। এর বাইরে অসুস্থতা, বাড়ি যাওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাড়ে অতিরিক্ত খরচ। পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হলে পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের পথ খুঁজতে হয় তাঁদের। এ ক্ষেত্রে টিউশনি হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের অন্যতম ভরসা।
কেউ নিজের হাতখরচ চালাতে টিউশনি করেন, কেউ পরিবারের ওপর আর্থিক নির্ভরতা কমাতে চান। আবার কেউ নিজের উপার্জন দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্নও দেখেন।
নোবিপ্রবির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিহাদের টিউশনি করার পেছনেও রয়েছে পরিবারের আর্থিক চাপ কমানোর তাগিদ। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই শিক্ষার্থী চান, নিজের প্রয়োজন মেটাতে যেন পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না হয়।
আশরাফুল ইসলাম জিহাদ বলেন, ‘মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসায় পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সব সময়ই মাথায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করি, যাতে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে। তবে সব সময় সব খরচ সামলানো সহজ হয় না। ক্লাস, পরীক্ষা আর টিউশনি সামলে কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তবুও পরিবারের স্বস্তি আর নিজের স্বপ্ন পূরণের আশায় এগিয়ে চলি।’
শিক্ষার্থীদের কাছে টিউশনির আয় তাই শুধু বাড়তি কিছু টাকা নয়; অনেকের জন্য এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম অবলম্বন। সেই অর্থে মেসভাড়া দেওয়া, খাবারের খরচ মেটানো কিংবা প্রয়োজনীয় বই কেনার ব্যবস্থা হয়। পরিবারের কাছে বারবার টাকা চাইতে না হওয়ার স্বস্তিও থাকে। তবে এই স্বস্তি অর্জন করতে গিয়ে নিজেদের সময় ও বিশ্রামের সঙ্গে আপস করতে হয় অনেককে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে টিউশনি সামলানো সহজ নয়। সকালে ক্লাস, এরপর ল্যাব, ক্লাস টেস্ট কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট। বিকেল বা সন্ধ্যায় টিউশনি শেষে বাসায় ফিরে আবার নিজের পড়াশোনা ও পরদিনের প্রস্তুতি। সবকিছুর মধ্যে বিশ্রামের সময় বের করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাস, ল্যাব রিপোর্ট তৈরি ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হয়। নিয়মিত টিউশনি থাকলে এসব কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পরীক্ষার আগে নিজের পড়াশোনায় বেশি সময় দেওয়া জরুরি হলেও অনেকের পক্ষে টিউশনি বন্ধ রাখা সম্ভব হয় না। কারণ, টিউশনি বন্ধ হলে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন টিউশনি পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তাও তাঁদের ভাবিয়ে তোলে।
ফলে নিজের পড়াশোনা ও আয়ের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্রাম, বিনোদন কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে নতুন দক্ষতা অর্জন, বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা পছন্দের বিষয়ে কাজ করার যে সুযোগ থাকে, আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সেসব সুযোগের পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না অনেকের।
টিউশনি থেকে আয়ের নিশ্চয়তাও সব সময় থাকে না। কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ হলে, শিক্ষার্থীর পরিবার স্থান পরিবর্তন করলে কিংবা অন্য কোনো কারণে টিউশনি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন নতুন টিউশনি খুঁজতে হয়। পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার পরও কাজ পেতে সময় লেগে যায়। এ সময় আয় বন্ধ থাকলেও নিয়মিত খরচ চলতেই থাকে।
নোবিপ্রবির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহীন রেজার অভিজ্ঞতাও তেমন। তাঁর মতে, নোয়াখালীতে টিউশনি পাওয়া তুলনামূলক কঠিন। বিশেষ করে বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে টিউশনির সংখ্যা কমে গেলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।
শাহীন রেজা বলেন, ‘নোয়াখালীতে টিউশনি পাওয়া এমনিতেই বেশ কঠিন। নতুন টিউশনি খুঁজে পেতেও অনেক সময় লেগে যায়। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই তিন মাস টিউশনির সংখ্যা কমে যায়। তখন নিজের খরচ চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময়টাতে পরিবারের কাছে টাকা চাওয়াও সম্ভব হয় না, আবার অন্য কোনো উপার্জনের মাধ্যম না থাকায় আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়। একদিকে নিজের পড়াশোনা, অন্যদিকে খরচের চিন্তা। সব মিলিয়ে এই সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং।’
একটি টিউশনি বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের শুধু মাসিক আয় কমে যায় না, বদলে যায় পুরো মাসের বাজেটও। কোন খরচ কমানো যাবে, কোন প্রয়োজন পরে মেটানো যাবে—এসব হিসাব নতুন করে করতে হয়। আয় অনিশ্চিত হলেও মেসভাড়া কিংবা খাবারের মতো নিয়মিত খরচ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
আর্থিক চাপের প্রভাব শুধু দৈনন্দিন জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; তা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও দক্ষতা উন্নয়নের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞান অর্জন, গবেষণায় যুক্ত হওয়া, প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের জন্য নিয়মিত সময় ব্যয় করতে হলে এসব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে।
বিশেষ করে গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাপত্র পড়া, শিক্ষকদের সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হওয়া, ল্যাবে অতিরিক্ত সময় দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রয়োজন। অথচ ক্লাস, পরীক্ষা ও টিউশনি সামলে এসব কাজের জন্য আলাদা সময় বের করা অনেকের পক্ষেই কঠিন।
নোবিপ্রবির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মায়িশা আফরোজ মোহনারও এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহ থাকলেও সময়ের সীমাবদ্ধতা তাঁর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
মায়িশা আফরোজ মোহনা বলেন, ‘টিউশনির ব্যস্ততায় গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে নিজের আগ্রহ ও সম্ভাবনাগুলোকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি না।’
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠে নয়; গবেষণা, দক্ষতা, সৃজনশীল চর্চা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও। কিন্তু প্রয়োজন মেটাতে দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হলে নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এতে আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুযোগ পাওয়ার ব্যবধানও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অবশ্য টিউশনি করা সব শিক্ষার্থীর আর্থিক পরিস্থিতি এক নয়। কারও প্রয়োজন নিজের হাতখরচ চালানো, আবার কারও জন্য টিউশনির আয় দিয়ে পড়াশোনার ব্যয় মেটানো জরুরি। তবে যাঁরা এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য অর্থের অনিশ্চয়তা ও সময়ের সংকট—দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেধাভিত্তিক বৃত্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি সহায়তা ও আবাসনসুবিধা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো হলে তাঁদের অভিজ্ঞতা অর্জনের পথও সহজ হবে।
এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি পড়াশোনা, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। ফলে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তাঁদের অন্যান্য সম্ভাবনা থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আলাদা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আর্থিক সামর্থ্য যেন প্রধান বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিই প্রত্যাশা। টিউশনি করে নিজের খরচ চালানো শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাসের পাশাপাশি অন্যকে পড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত পরিশ্রমের গল্প নয়; উচ্চশিক্ষার সুযোগকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের স্বপ্ন, গবেষণার আগ্রহ কিংবা সম্ভাবনাকে পিছিয়ে রাখতে না হয়।