সিজোফ্রেনিয়া মানসিক রোগের কারণ হতে পারে বিড়াল পোষা!
সম্প্রতি দেখা যায়, ফ্ল্যাট বাড়ি বা বদ্ধ ঘরে অনেকে বিড়াল লালন পালন করে থাকেন। যার ফলে বিড়ালের শরীর থেকে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিড়াল পালন নিয়ে বিশ্বজুড়েই মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে এবার বিড়ালপ্রেমীদের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন একদল গবেষক। তারা বলছেন, যারা বিড়াল পালেন তাদের অন্যদের তুলনায় সিজোফ্রেনিয়া সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মানসিক সমস্যার সঙ্গে বিড়ালের যোগ কোথায়, তা নিয়ে একটা কৌতূহলও তৈরি হয়েছে। ‘স্কিৎজ়োফ্রেনিয়া রিসার্চ’ নামে একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধ অনুযায়ী, জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত শিশুর পরিবারে বহু ক্ষেত্রেই বিড়াল পোষার ইতিহাস আছে।
লন্ডনের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটউট অফ মেন্টাল ইলনেস’-এর গবেষকদের করা একটি গবেষণা জানাচ্ছে, স্কিৎজ়োফ্রেনিয়া আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশের পরিবারে বিড়াল পোষার চল ছিল। এই জটিল মানসিক রোগ সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।
তবে বিড়াল পোষার সঙ্গে স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার যোগসূত্র কোথায়? কিছু বিড়ালের শরীরে ‘টক্সোপ্লাজমা গনডি’ নামে এক ধরনের জীবাণু থাকে। এই জীবাণু মানুষের মস্তিষ্কে ঢুকে এক ধরনের সিস্ট তৈরি করে। বয়সন্ধির সময় থেকেই এই সিস্টগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। যার ফলস্বরূপ স্কিৎজ়োফ্রেনিয়ার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন হলো- তা বলে কী বিড়াল পোষা মানা? একেবারেই তা নয়। পোষা বিড়ালকে বাড়ির মধ্যেই আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা, বিড়ালের পরিচ্ছন্নতায় মনোযোগ বাড়ানো এবং বিড়ালের থাকার জায়গা বা বিড়ালের খেলার বালির বাক্স ব্যবহারের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় ঢেকে রাখলে ‘টক্সোপ্লাজমা গনডি’ জীবাণুর বিস্তার রোধ করা যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ রিসার্চের একদল গবেষক গবেষণাটি চালিয়েছেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে বিগত ৪৪ বছরে এ সংক্রান্ত ১৭টি গবেষণার বিশ্লেষণ থেকে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যালার্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন ম্যাকগ্রা ও তার সহযোগীরা লিখেছেন, ‘আমরা বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত বিড়ালের মালিকানা ও সিজোফ্রেনিয়া-সম্পর্কিত রোগের বিকাশের ঝুঁকির মধ্যে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছি।’
এর আগে ১৯৯৫ সালের একটি গবেষণায় বিড়ালেরে লালন-পালনের সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়া ঝুঁকি থাকতে পারে এই বিষয়টি সামনে আসে।
সেই গবেষণায় বলা হয়েছিল, টক্সোপ্লাজমা গন্ডি নামক একটি পরজীবীর বিড়ালের মাধ্যমে মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে এই ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু বর্তমান গবেষণা বলছেন ভিন্ন কথা।
নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, শৈশবে বিড়ালের আশপাশে বেশি থাকার ফলে ব্যক্তির সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তবে যে ১৭টি গবেষণা নিয়ে গবেষকেরা কাজ করেছেন, তার সবগুলোতেই একই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।
যদিও অধিকাংশ গবেষণায় যে বিষয়টি সাধারণ ছিলো তা হলো, বিড়ালের কারণে সিজোফ্রেনিয়া সংক্রান্ত রোগের বৈশিষ্ট্যগুলো বাড়তে পারে। তবে এখানে মাত্রার তারতম্য ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষক ম্যাকগ্রা ও তার সহযোগীরা। টক্সোপ্লাজমা গন্ডি বলতে বোঝায়, একটি নিরীহ পরজীবী যা অল্প রান্না করা মাংস বা দূষিত পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমিত বিড়ালের কামড় বা মল থেকেও এটি ছড়াতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, টক্সোপ্লাজমা গন্ডি একবার আমাদের দেহের ভেতরে প্রবেশ করলে তা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রেও অনুপ্রবেশ করতে পারে এবং নিউরোট্রান্সমিটারগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।
এভাবে পরজীবীটি মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ এমনকি সিজোফ্রেনিয়াসহ বেশ কিছু স্নায়বিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে একমাত্র বিড়াল থেকেই মানুষের দেহে টক্সোপ্লাজমা গন্ডি প্রবেশ করে এসব পরিবর্তন ঘটনায় এ বিষয়ে নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা।
তবে ১৭টি গবেষণার পর্যালোচনা থেকে দেখা গেছে, বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত বিড়ালের মালিকানা ও সিজোফ্রেনিয়া সংশ্লিষ্ট রোগের ঝুঁকির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি যে, বিড়ালের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।’