ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে সাড়ে ৬ হাজার পরিবার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:৪০, ২১ জুন ২০২৪
মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে সাড়ে ৬ হাজার পরিবার
ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম শহরে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকাধীন মিলিয়ে পাহাড় সংখ্যা ২৬টি। এসব পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি পরিবার। পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস না করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও দিনশেষে যেন ‘যেই লাউ, সেই কদু’ অবস্থা।

পাশাপাশি দিন দিন বেড়েই চলছে পাহাড় কাটা। পরিবেশ অধিদফতর নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা বললেও যেন কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না পাহাড় খেকোদের। ফলে যেমনি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র, তেমনি বাড়ছে পাহাড়ধসের শঙ্কাও।

জানা গেছে, এসব পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের অনেকেই ভোগ করছেন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সব সুযোগ-সুবিধা। দুদিন আগে আবহাওয়া অধিদফতরের পক্ষ থেকে ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের অগ্রিম বার্তা দেওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পাহাড় থেকে অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।

গত বুধবার থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের আশঙ্কা প্রকাশ করে আবহাওয়া অধিদফতর। পাশাপাশি পাহাড়ধস বা ভূমিধসের শঙ্কার কথাও বলা হয়। এরপর থেকে পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে মাইকিং শুরু করে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা।

বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলেই শুরু হয় ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরানোর কাজ, চট্টগ্রামের প্রতি বর্ষা মৌসুমের চেনা চিত্র এটি। এ সময় পরিচালনা করা হয় উচ্ছেদ অভিযানও। কিন্তু দুর্যোগ কেটে গেলেই সবকিছু হয়ে যায় স্বাভাবিক। ফের শুরু হয় পাহাড়ে বসবাস।

অভিযোগ রয়েছে, ঝুঁকি আছে জেনেও এসব পাহাড়ে অবৈধভাবে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। পাহাড়ে খুঁটি স্থাপন করেই নেয়া হয় বিদ্যুতের লাইন। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিটি সভায় সেবা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন করা হয় না।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ তোফায়েল ইসলাম বলেন, নগরীর ২৬টি পাহাড়ের মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বা বিভাগের মালিকানাধীন ১৬টি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০টি। শুধু চট্টগ্রাম রেলওয়ের জায়গায় অবৈধভাবে বসবাস করা পরিবারগুলোতেই রয়েছে পাঁচ হাজার ৩০০ অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন। কর্তৃপক্ষ যদি কাউকে বন্দোবস্ত না দেয়, তাহলে সেখানকার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করা হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আবহাওয়ার পরিস্থিতি ভালো নয়। রয়েছে ভারি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ধসের শঙ্কা। তাই পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করা পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। আমরা চাই প্রত্যেকে নিরাপদে থাকুক।

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব অসহায়দের সহায়তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও চট্টগ্রাম বিভাগের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ২৬টি পাহাড়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে অনেক খাসজমি উদ্ধার করা হয়েছে। যেখানে আগে অবৈধ বসবাস ছিল।

কোন পাহাড়ে কত পরিবার

ঝুঁকি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করেন আকবরশাহ থানার ফয়’স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে। এখানে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা প্রায় চার হাজার ৪৭৬টি।

এছাড়া মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৪৩১টি, কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেট সংলগ্ন পাহাড়ে ১৪৬টি, পলিটেকনিক হল্ট স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশ ১২টি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে পাঁচটি, ষোলশহর রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৭৪টি, পরিবেশ অধিদফতর সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৬টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন বিজয় নগর পাহাড়ে ২৮৮টি, আমিন জুট মিল কলোনি সংলগ্ন ট্যাঙ্কির পাহাড়ে ৬৫টি, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ১৫০ দাগের খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ে (জয়ন্তিকা আবাসিক সংলগ্ন) ২৮টি, বিএস ২১২ ও ২১৩ দাগের পাহাড়ে (মুরগি ফার্ম হয়ে গার্ডেন ভিউ সোসাইটি সংলগ্ন) ১২টি, আকবরশাহ বেলতলী পাহাড়ে ৮৯টি এবং পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩টি পরিবার বসবাস করছে।

এছাড়াও লালখানবাজার জামেয়াতুল উলুম মাদরাসা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩২৩টি, হারুন খান সাহেবের পাহাড়ে ১৪৪টি, নাছিয়াঘোনা এলাকায় ১২টি, চিড়িয়াখানার পেছনের পাহাড়ে ২৮টি, মধুশাহ পাহাড়ে ২৯টি, জালালাবাদ সংলগ্ন পাহাড়ে পাঁচটি, নাগিন পাহাড়ে ২৫টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন মীর মোহাম্মদ হাসানের পাহাড়ে ৩৮টি, এমআর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৪২টি, মিয়ার পাহাড়ে ৪৯টি এবং ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে (রৌফাবাদ, অক্সিজেন) ১১টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

পাহাড় কাটা চলছেই

পাহাড় কাটা নিয়ে ‘হিল কাটিং ইন অ্যারাউন্ড চিটাগং সিটি’ নামের একটি গবেষণায় গুগল আর্থের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ১৪ বছর আগে ২০০০ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা এলাকার পরিমাণ ছিল ৬৭৯ হেক্টর। আর ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২৯৫ হেক্টরে। ২০১২ সালের পর আর গবেষণা না হওয়ায় বর্তমান পরিমাণ জানা যায়নি। তবে প্রতি বছর যে হারে পাহাড় কাটা হচ্ছে, তাতে নগরে সেই সংখ্যা দুই হাজার হেক্টর ছুঁয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত এক বছরে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদফতরে মামলা হয়েছে ১২টি। তার আগের বছর মামলা হয়েছিল ২২টি। গত ২০ বছরে মামলার সংখ্যা পেরিয়েছে শতাধিক। সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে বায়েজিদ ও আকবরশাহ এলাকায়। মামলার প্রায় ৮০ শতাংশই এ দুটি এলাকায়।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রামের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, পাহাড় কাটার খবর পেলেই অভিযান চালানো হয়। প্রতি মাসেই মামলা করা হয়। পাহাড় কাটার সঙ্গে বিভিন্ন পেশার মানুষ জড়িত। এটি বন্ধ করতে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ে ঠাঁই

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও বন্ধ হচ্ছে না পাহাড়ে বসবাস। গত ১৩ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন পাহাড়ে। তবে এসব মানুষের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের।

পাহাড়ে বসবাসকারী জোছনা বেগম বলেন, মাথা গোঁজার মতো জায়গা নেই, তাই এখানে থাকি। সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন করা হলে আমরা সেখানে চলে যাবো।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে এক দিনেই পাহাড় ধসে নারী-শিশুসহ মারা যান ১২৭ জন। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ধসে মৃত্যু হয় চার পরিবারের ১২ জনের। ২০১১ সালের ১ জুলাই টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে মারা যান ১৭ জন। ২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন, দুদিনে মারা যান ২৪ জন। ২০১৩ সালে মতিঝর্ণায় দেয়াল ধসে মারা যান দুজন।

২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার আমিন কলোনিতে মারা যান তিনজন। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর মাঝিরঘোনা এলাকায় মা-মেয়ের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন রাঙামাটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটে ১৫৮ জনের। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরের আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনিতে মারা যান চারজন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ এলাকায় মৃত্যু হয় এক শিশুর। ২০২২ সালের ১৮ জুন মারা যান চারজন।

 
ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!