পিরোজপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রোড বেহাল। প্রতিদিন এই রোড থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী চলাফেরা করে কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই খানাখন্দে ভরে থাকা রাস্তাগুলো পরিণত হয় জলাবদ্ধতায়। প্রতিদিন দুর্ভোগ নিয়ে যাতায়াত করে শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ। এ অবস্থা যে শুধু এখানেই তা নয়, এ দুরবস্থা পিরোজপুর শহরের ৯০ শতাংশ সড়কের। পৌর শহরের বলাকা ক্লাব রোডের দিকে তাকালে মনে হয় রাস্তার ওপর দিয়ে ছোট একটি খাল বয়ে চলেছে। শিক্ষার্থী, পথচারী ও রিকশাচালকেরা পড়েছেন সব থেকে বেশি দুর্ভোগে। এছাড়া পৌরসভার সিআইপারা, মন্ডলপাড়া, মাছিমপুর, কৃষ্ণনগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার একই চিত্র।
১৮৬৫ সালে পিরোজপুর ইউনিয়ন থেকে পৌরসভায় উন্নিত হয়। আর প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয় ১৯৯০ সালে। তাতে কি! প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন তেমন একটা হয়নি। বিশেষ করে রাস্তা ঘাট ও ড্রেনের ব্যবস্থা উন্নতি ঘটেনি প্রথম শ্রেণীর এই পৌরসভায়। মূল শহরের অধিকাংশ সড়কই ভাঙা, খানাখন্দে ভরা। মাঝে মাঝে সংস্কার করা হলেও নিম্নমানের উপকরণের কারণে তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
.png)
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী ২৯ দশমিক ৫ বর্গ কিলোমিটারের এই পৌরসভার প্রায় ৯০ শতাংশ সড়কই বর্তমানে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। ৩৩০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ২০ কিলোমিটার পাকা এবং ৭০ কিলোমিটার মাটির রাস্তা। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই শহরের সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। যা শহরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৌরসভার মধ্যে পর্যাপ্ত ড্রেনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি ও বন্যার পানি নামতে পারে না, ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার মৌসুমে ড্রেনগুলোতে পানি জমে থেকে, যেখানে ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তার করছে। চলতি বছরে বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবথেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর জেলা। বর্তমানে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার তিন শতকেরও বেশি। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যদি সঠিকভাবে ড্রেনগুলো পরিষ্কার না করে তাহলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বর্ষার মৌসুমে এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করলে স্কুলের ইউনিফর্ম নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও জলাবদ্ধতার কারণে রিকশাচালকদের যাতায়াতে প্রায়ই নষ্ট হচ্ছে গাড়ির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরের পর বছর ধরে পৌরসভার রাস্তাগুলো এভাবে পড়ে থাকার পরেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যথা নেই। দ্রুত সংস্কার করে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী করার দাবি স্থানীয়দের।
পিরোজপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা হাফিজ শেখ বলেন, বৃষ্টি হলেই মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চলাফেরা করতে পারে না। বৃষ্টি হলে এই রাস্তায় হাঁটুসমান পানি হয়। যা সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপযোগী। এই রাস্তা দিয়ে প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, কলেজ, নার্সিং কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চলাফেরা করে। কিন্তু বছরের পর বছর এ রকম থাকার পরেও কর্তৃপক্ষ সংস্কার করছে না। আমরা চাই, এই রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কার করা হোক।

পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার নেওয়াজ বলেন, আমরা যে রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করি, প্রতিনিয়ত এই রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে। বর্ষার মৌসুমী রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ হয়। রাস্তায় চলাচলের কোনো পরিবেশ থাকে না। এই রাস্তা দিয়ে মেয়েরা বোরকা পরে চলাফেরা করে কিন্তু বৃষ্টির পানি এতটাই জমে থাকে যে শুকনো অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। কর্তৃপক্ষ যদি রাস্তাগুলো সঠিকভাবে মেরামত করে তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমে যাবে।
করিমুন্নেসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফ শেখ বলেন, আমরা প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাই কিন্তু রাস্তায় অনেক পানি থাকে। পাশ দিয়ে রিকশা গেলে অনেক পানি ওঠে, জামা কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাটা কেউ ঠিকও করে না।
রিকশাচালক রফিক উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এই রাস্তায় রিকশা চালাইতে পারি না কিন্তু মানুষ আসতে চায়। তাদের নিয়া না আসলে অনেক রাগারাগি করে কিন্তু আমরা কি করব! এই রাস্তায় গাড়ি চালাইলে গাড়ি নষ্ট হইয়া যায়, গাড়ির অনেক কিছু ভাইঙ্গা যায়। যে কয় টাকা ইনকাম করি তা দিয়া গাড়ি সারাইতে হয়। এর জন্য এইসব ভাঙ্গাচুরা রাস্তায় আসি না। রাস্তা যদি ভালো হইতো তাহলে তো আমাদের জন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য ভালো হইতো। তারাও যাইতে পারতো আর আমাদেরও কোনো সমস্যা হইতো না।’
পিরোজপুর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বনি আমিন বলেন, পিরোজপুরের তিনটি পৌরসভা নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় একটি প্রকল্প করা হয়েছে। পৌরসভার বিভিন্ন রাস্তা ও ড্রেনের তালিকা করে পাঠানো হয়েছে। আগামী দু-এক বছরের মধ্যে এসব ভাঙাচোরা রাস্তার সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি আরো বলেন, পিরোজপুর পৌরসভা একটি পুরাতন পৌরসভা, এ পৌরসভার আয়তন অনুযায়ী আমরা উন্নয়ন করতে পারছি না বাজেট সমস্যার কারণে। তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমনের প্রচেষ্টায় একটি প্রকল্প করা হয়েছে। অচিরেই পৌরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব হবে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত সংস্কার করা না হলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে সড়কগুলো। তাই প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক রাস্তাগুলোও দ্রুত সংস্কারের দানি জানিয়েছেন পৌরবাসী।