ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমসের অতিরিক্ত কড়াকড়ি, শুল্ক নির্ধারণ ও পণ্যের মূল্যায়নে বৈষম্য, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সোনামসজিদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন আমদানিকারকরা। ফলে তারা হিলি ও ভোমরাসহ অন্যান্য স্থলবন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যবসায়ীদের প্রতি অসহযোগিতা করা হচ্ছে না। বরং অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সঠিক নিয়মে ব্যবসা করতে চাইলে সোনামসজিদ বন্দরে কোনো সমস্যা নেই বলেও দাবি তাদের।
.png)
কমছে আমদানি, হারাচ্ছে রাজস্ব
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ তা কমে দাঁড়ায় ৮১৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে ঘাটতি প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফল, জিরা ও বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব পণ্যে তুলনামূলক বেশি রাজস্ব আদায় হয়। ফলে আমদানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্বও কমছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গতি অনেক কমে গেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমিকসহ বন্দরকেন্দ্রিক অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ফল, জিরাসহ মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানি অনেক কমে গেছে। এসব পণ্যে রাজস্ব বেশি আদায় হয়। ফলে এসব পণ্যের আমদানি কমায় বন্দরের রাজস্বও কমে যাচ্ছে। সরকার সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি রাজস্ব দিতে প্রস্তুত।”
কাস্টমস হাউস না থাকাই বড় সমস্যা
ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, সোনামসজিদে নিজস্ব কাস্টমস হাউস নেই। বন্দরের কোনো প্রশাসনিক বা রাজস্বসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে ব্যবসায়ীদের রাজশাহীতে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়।
মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুহিন আলম বলেন, আগে সোনামসজিদ দিয়ে ফল, মাছ, ভুসি, ভুট্টা, কসমেটিকস ও বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হতো। কিন্তু বর্তমানে সুযোগ-সুবিধার অভাব, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক না হওয়া এবং সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে বন্দরটি ঝিমিয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে কাস্টমস হাউস নেই। বন্দরের কোনো সমস্যা হলে রাজশাহী যেতে হয়। অথচ সোনামসজিদের অনেক পরে অনুমোদন পাওয়া ভোমরা বন্দরে কাস্টমস হাউস রয়েছে। সেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কার্যক্রম চলে। এ কারণে সেখানকার আমদানি-রপ্তানি দিন দিন বাড়ছে।
তুহিন আলমের মতে, সোনামসজিদে কাস্টমস হাউস স্থাপন করা হলে ব্যবসায়ীরা সরাসরি তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারবেন এবং বন্দরের কার্যক্রমও অনেক বেশি গতিশীল হবে।
অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছে ব্যবসা
আমদানিকারক সাঈদ বলেন, সোনামসজিদ বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। পাথর ছাড়া তেমন কোনো পণ্য আসছে না।
তার অভিযোগ, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও শুল্কায়নে বৈষম্য থাকায় আমদানিকারকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। একই পণ্য অন্য বন্দরে যে সুবিধায় খালাস করা সম্ভব হচ্ছে, সোনামসজিদে এসে তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “একজন আমদানিকারক যখন দেখবেন ট্যাক্সের ভ্যারিয়েন্ট হচ্ছে এবং ভ্যালু নির্ধারণে সমস্যা হচ্ছে, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই অন্য বন্দরের দিকে যাবেন। কাস্টমস যদি অন্যান্য বন্দরের মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে এখানে অন্যান্য পণ্যের আমদানি বাড়বে।”
সোনামসজিদে কাস্টমস হাউস স্থাপনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সোনামসজিদ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর হলেও এখনো এখানে কাস্টমস হাউস নেই। ভোমরায় কাস্টমস হাউস হওয়ার পর সেখানে গাড়ির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। সোনামসজিদেও কাস্টমস হাউস হলে আমদানি-রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে।
শ্রমিকদের দুর্দশা
আমদানিকারক ও রিয়াদ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজান বলেন, পাথর ছাড়া অন্য পণ্যের আমদানি প্রায় বন্ধ থাকায় বন্দরের ভেতরে অনেক জায়গা খালি পড়ে থাকে। আগের মতো ট্রাকও আসে না।
তিনি বলেন, “এখানে আগে অনেক শ্রমিক কাজ করতেন। এখন গাড়ি না আসায় শ্রমিকরাও বসে আছেন। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকার যদি সোনামসজিদ বন্দরের দিকে নজর দেয় এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে এই বন্দর আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারে। এর সম্ভাবনা এখনো আছে।”
আবাসন সংকটেও ব্যাহত কার্যক্রম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, একসময় রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে বেনাপোলের পরই সোনামসজিদের অবস্থান ছিল। কিন্তু নানা কারণে এ বন্দরের রাজস্ব কমে যাচ্ছে।
তার মতে, বন্দরের অন্যতম বড় সমস্যা কাস্টমস কর্মকর্তাদের আবাসন সংকট। কর্মকর্তাদের শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে যাতায়াত করতে হয়। এতে বন্দরের কার্যক্রমের সময়ও কমে আসে।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পোর্ট চালু থাকার কথা। কিন্তু এখানে কর্মকর্তারা অনেক সময় ৯টা, ১০টা বা ১১টার দিকে আসেন। আবার বিকেল ৪টার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে দ্রুত চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এতে কার্যক্রম ব্যাহত হয়।”
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য বন্দরে যেভাবে ফলের গাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য খালাসে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সোনামসজিদে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, বন্দরের সমস্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করতে সীমান্ত বাণিজ্য কমিটির দুই মাস পরপর বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিত হচ্ছে না।
তিনি জানান, কাস্টমস কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসনসহ সোনামসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৩২০ কোটি টাকার ‘সাসেক’ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা গেলে কাস্টমস হাউসসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
কাস্টমসের বক্তব্য
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাজু মিয়া বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে ৮১৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৯০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজস্ব কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আমদানি কমে যাওয়া, আমদানি শুল্ক কমে যাওয়া এবং আগে যেসব পণ্য আমদানি হতো সেগুলোর কিছু এখন কমে যাওয়ায় রাজস্বে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতা বলা যাবে না। তবে নজরদারি বেড়েছে, এটা ঠিক। কমিশনার মহোদয়ের নির্দেশনা হচ্ছেসঠিকভাবে ও সঠিক পন্থায় যারা ব্যবসা করছেন, তাদের স্বাগত জানানো হবে। তারা ব্যবসা করতে পারবেন। যারা ভিন্ন পন্থায় ব্যবসা করতে চান, তাদের সেই সুযোগ কমে গেছে।”
তিনি দাবি করেন, বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে এবং নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাইলে আমদানিকারকদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
সম্ভাবনা থাকলেও দরকার কার্যকর উদ্যোগ
সোনামসজিদ স্থলবন্দর শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বার। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, কাস্টমস হাউসের অনুপস্থিতি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং শুল্কায়ন ও মূল্যায়ন নিয়ে অভিযোগের কারণে ধীরে ধীরে এই বন্দরের ব্যবসা অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে সোনামসজিদ তার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারাতে পারে। একই সঙ্গে কমতে পারে সরকারের রাজস্ব। তাই বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, কাস্টমস হাউস স্থাপন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, এখনো সোনামসজিদ বন্দরের ঘুরে দাঁড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সমন্বিত উদ্যোগ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা।