ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
তহশিলদার-এসিল্যান্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মৃত্যুর কয়েক দশক পর ৫ মৃত ব্যক্তির নামে ড্রেজার মামলা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৫৩, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মৃত্যুর কয়েক দশক পর ৫ মৃত ব্যক্তির নামে ড্রেজার মামলা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় কয়েক দশক আগে মারা যাওয়া পাঁচ ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। একই মামলায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে তহশিলদার ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভজনপুর ইউনিয়নের পোহাতুগছ এলাকায় অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ। এ সময় তিনটি মেশিন জব্দ করে তেঁতুলিয়া মডেল থানায় নেওয়া হয়।

অভিযানের পর ওই রাতেই ভজনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মানিক চন্দ্র বর্মন ২২ জনকে আসামি করে খনি ও খনিজ সম্পদ আইন, ১৯৯২-এর ৫ ধারায় মামলা করেন।

Advertisement

তবে মামলার এজাহার পর্যালোচনা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসামিদের তালিকায় কয়েক দশক আগে মারা যাওয়া অন্তত পাঁচ ব্যক্তির নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর পর একাধিক দশক পেরিয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

মামলার এজাহারে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে ভজনপুর ইউনিয়নের কাউরগছ এলাকার ফয়জুল হককে। স্থানীয়ভাবে তিনি ফজলু মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে মারা গেছেন। একই মামলায় তার দাদা মহর আলীকেও ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, মহর আলী প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে মারা যান।

এ ছাড়া মামলায় ৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে মহামুদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে। তিনিও বহু বছর আগে মারা গেছেন বলে স্বজনদের দাবি। ১০ নম্বর আসামি রমজান আলী এবং ১৪ নম্বর আসামি মজিবর রহমানও কয়েক দশক আগে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজন ও স্থানীয়রা।

সরেজমিন গিয়ে স্থানীয়দের দেখানো পাঁচ ব্যক্তির কবরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাদের স্বজনরা মৃত ব্যক্তিদের নামে মামলা দায়েরের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে মামলা দায়েরের পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভজনপুর বাজারে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এ সময় তহশিলদারকে ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, পরে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এসিল্যান্ড এস এম আকাশের উপস্থিতিতে তহশিলদার মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় মেশিনের মাধ্যমে বালু-পাথর উত্তোলন চললেও অভিযানে মাত্র তিনটি মেশিন জব্দ করা হয়েছে। যারা প্রকৃতপক্ষে উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে মৃত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

ফয়জুল হক ও মহর আলীর স্বজন সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দাদা ও বড় ভাই অনেক বছর আগেই মারা গেছেন। তারা জমির মালিক ছিলেন এবং অনেক আগেই জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। কয়েক দিন আগে পোহাতুগছ এলাকায় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে মেশিন জব্দ করে। পরে জানতে পারি, মামলায় আমার মৃত দাদা, বড় ভাইসহ পরিবারের আরও কয়েকজনের নামে মামলা হয়েছে।’

মামলার আরেক আসামি মৃত মহামুদ্দিনের নাতি সামিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি জন্মের পর আমার দাদাকে দেখিনি। আমার বাবার বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখনই তিনি মারা যান বলে শুনেছি। এখন মামলায় আমার মৃত দাদার নাম দেখে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক মনে হয়েছে।’

কাউরগছ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, ‘মামলায় যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচজনই মৃত। তাদের দাফন-কাফন আমরা করেছি। মৃত ব্যক্তিদের নামে মামলা হওয়ার কথা শুনে আমরা হতবাক।’

স্থানীয় যুবক মনির হোসেন বলেন, ‘২২ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আসামিদের অনেকেই নিরপরাধ। প্রশাসনের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘যারা মারা গেছেন, তাদের নামে মামলা হয়েছে। অথচ যারা মেশিন চালিয়েছে, তাদের নাম মামলায় নেই।’

মামলার বাদী ও ভজনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মানিক চন্দ্র বর্মনের সঙ্গে কথা বলতে তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জমির হোল্ডিং দেখে মামলাটি করা হয়েছে। ‘একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

মামলা ও মেশিন জব্দের বিষয়ে জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের পর তিনি দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরে গাড়িতে ওঠার সময় তিনি বলেন, ‘মামলা করা হয়েছে। মামলা চলমান আছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। প্রত্যাহারের বিষয়ে আমরা বলছি, মামলায় কিছু ত্রুটি হয়েছে। এটি প্রত্যাহারের জন্য বলা হচ্ছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী মামলার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লাইছুর রহমান ২২ জনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়েছে। থানায় এবং আদালতেও আবেদন দেওয়া হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি দেখছি। তহশিলদার জমির মালিকের খতিয়ান দেখে মামলায় নাম দিয়েছেন। এর কারণে অনেক মানুষ, যারা সেখানে ছিলেন না বা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামও মামলায় এসেছে। বিষয়টি আমরা দেখছি এবং কীভাবে সংশোধন করা যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: পঞ্চগড়
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!