ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ অপরাধ ]

প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদ ‘হানি ট্র্যাপ’

এক বছরে দুই ডজনের বেশি মামলা, গ্রেপ্তার শতাধিক
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯:৩৪, ২৯ জুলাই ২০২৬
প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদ ‘হানি ট্র্যাপ’
ছবি: এআই

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরন। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সুযোগ নিয়ে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ এখন সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অন্যতম লাভজনক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংকার, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ এবং অর্থ আদায়ের অসংখ্য ঘটনা সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় দুই ডজনের বেশি বড় মামলা দায়ের হয়েছে। এসব ঘটনায় নারীসহ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, হানি ট্র্যাপের শিকার সাধারণত বিত্তশালী, উচ্চাভিলাষী ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই বেশি হন। অপরাধীরা প্রথমে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় প্রোফাইল ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলে। এরপর ধাপে ধাপে বিশ্বাস অর্জন করে চা-আড্ডা কিংবা ব্যক্তিগত সাক্ষাতের প্রস্তাব দেয়। একাকীত্ব, মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই তারা ফাঁদ পাতে।

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুনাম রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। অপরাধচক্র এই দুর্বলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। একান্ত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও গোপনে ধারণ করে তা পরিবার, কর্মস্থল কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। মানসম্মানের ভয়ে অনেকেই আইনি সহায়তা নিতে চান না, ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরে হানি ট্র্যাপ চক্রের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, ঋণগ্রহীতা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) সাইবার বিভাগ খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে গ্রেপ্তার করে। চক্রের মূল টার্গেট ছিলেন একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন ঋণ কর্মকর্তা। চক্রের এক নারী সদস্য নিজেকে ঋণগ্রহীতা পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরে কৌশলে তাকে খিলগাঁওয়ের একটি ফাঁকা ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে জিম্মি করা হয়। সেখানে তাকে মারধর করে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পাশাপাশি আরও ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

এর আগে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ হানি ট্র্যাপ চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগ। তদন্তে জানা যায়, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁদ পেতে সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে একাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করে মাতুয়াইলের একটি গোপন বাসায় আটকে রাখত। পরে জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব ও এটিএম কার্ড ব্যবহার করে ৫ লাখ টাকার বেশি এবং স্বর্ণালংকার লুট করা হতো।

শুধু রাজধানীতেই নয়, চট্টগ্রামেও হানি ট্র্যাপ চক্রের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সম্প্রতি কোতোয়ালি থানার কাজীর দেউরী এলাকায় এক ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ এবং ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মোবারক হোসেন ও নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ধরনের অপরাধ কেবল ব্যক্তি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও হাই-প্রোফাইল হানি ট্র্যাপের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সারা দেশে হানি ট্র্যাপ ও সংশ্লিষ্ট ব্ল্যাকমেইলের ঘটনায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি সুনির্দিষ্ট মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ডজনখানেক আলোচিত মামলা দায়ের হয়েছে।

গত জুলাই মাসে খিলগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা হলেন- মো. জসীম উদ্দিন, সুজন মিয়া, রিয়াদ হোসেন, তানভীর আহমেদ এবং আল-আমিন। তাদের কাছ থেকে ৯টি মোবাইল ফোন, একটি ওয়াকিটকি ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানায় হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ও সন্দেহভাজন ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- তুলিয়া আক্তার ওরফে সুমি, দুলালী ওরফে মীম, মো. ওমর ফারুক, মো. শফিকুল ইসলাম শান্ত, মো. সজল তালুকদার, ইয়াছিন, মো. নাছির খান, সাদ্দাম, মেহেদী হাসান শাহরিয়া, আজিজুল হাকিম টুটুল, মো. কামরুল ইসলাম ও মো. রবি।

অন্যদিকে, গত জুলাই মাসে চট্টগ্রামে এক ব্যক্তিকে হানি ট্র্যাপে ফেলে অপহরণ ও বিবস্ত্র করে ছবি তোলার অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় মোবারক হোসেন ও নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া মে মাসে বরিশালে এক আইনজীবীকে হানি ট্র্যাপে ফেলে মানহানি এবং ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ভুক্তভোগী আইনজীবী এস. এম. তৌহিদুর রহমান। মামলায় তাজরিন জাহান ইভা, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. আসাদ, মো. ফিরোজ এবং মারিয়া বেগমকে আসামি করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, হানি ট্র্যাপ চক্রগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সমাজের বিত্তবান ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করছে। তারা প্রথমে সম্পর্ক গড়ে তোলে, পরে একান্ত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করে। আমরা সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এসব চক্রকে একে একে আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। সাধারণ মানুষের উচিত অপরিচিত কারও সঙ্গে ভার্চুয়ালি মেলামেশার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) অপরাধ ও সুশাসন বিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. জামিলুর রহমান বলেন, ডিজিটাল আসক্তি এবং মানুষের অতিলোভ বা সরলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। হানি ট্র্যাপ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, এটি করপোরেট ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কর্মকর্তাদের সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সচেতন করা।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, হানি ট্র্যাপসহ এ ধরনের অপরাধ দমনে দেশের সব থানাকে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

পুলিশের পরামর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারও বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণের আগে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির আমন্ত্রণে নির্জন বা অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয় না পেয়ে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা অথবা নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কিংবা মামলা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমেই হানি ট্র্যাপের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!