ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

মৌসুমি সবজি বাজারে, দাম নাগালের বাইরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯:০৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মৌসুমি সবজি বাজারে, দাম নাগালের বাইরে
ঢাকার কাঁচাবাজারে মৌসুমি সবজি

রাজধানীর কাঁচাবাজারে মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম কমেনি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পটোল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, করলা, বেগুন, বরবটি, ঢ্যাঁড়শসহ বিভিন্ন সবজি বাজারে উঠেছে। তবে অধিকাংশ সবজিই কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। নতুন উঠতে শুরু করা কিছু সবজির দাম আরও বেশি। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, শ্যামবাজার, নিউমার্কেট ও মিরপুরের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পটোল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। ঝিঙে, চিচিঙ্গা ও ধুন্দুলের দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকা। করলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং বরবটি ও ঢ্যাঁড়শ ৭০ থেকে ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে।

Advertisement

সবজির মধ্যে বেগুনের দাম তুলনামূলক বেশি। গোল বেগুন ১০০ থেকে ১৬০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন উঠতে শুরু করা শিম কোনো কোনো বাজারে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে পেঁপে মিলছে, কেজি ৩০ টাকার মতো। তবে সামগ্রিক বাজারচিত্রে স্বস্তি নেই ক্রেতাদের।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. আবদুল করিম বলেন, বৃষ্টির কারণে মাঠ থেকে সবজি কম আসছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বাড়তি। আমরাও চাই না দাম এত হোক, কিন্তু পাইকারি বাজার থেকে নিয়ে আসতেই খরচ বেড়ে যায়।

হাতিরপুল বাজারের বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি সবজি উঠলেও গুণগত মানের সবজির দাম বেশি। খারাপ সবজি কম দামে দিলেও ক্রেতারা নেন না। তাই ভালো সবজি বিক্রি করতে গেলে দাম বাড়াতেই হয়।

তবে বিক্রেতাদের এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। মিরপুরের গৃহিণী নাজমা আক্তার বলেন, 
প্রতিদিন বাজার করতে গেলে সবজিতেই একশো-দেড়শো টাকা চলে যায়। আগে এক কেজি বেগুন ৬০-৭০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন দ্বিগুণ। সংসার চালাতে হিসাব কষতে হয়।

কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি সবজি মানেই দাম কম হবে—এমন ধারণা এখন আর নেই। ৮০ টাকার নিচে ভালো সবজি পাওয়াই মুশকিল। পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সবজি কেনা এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্যামবাজারের ক্রেতা সালমা বেগম বলেন, ছেলেমেয়েকে পুষ্টিকর খাবার দিতে চাই, কিন্তু দাম দেখে হাত গুটিয়ে নিতে হয়। পেঁপে আর মুলা ছাড়া আর কিছুই নাগালের মধ্যে নেই।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মৌসুমি সবজির দাম এভাবে চড়া থাকা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অসহনীয়। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দাম কমার কথা। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বাজার তদারকির অভাবে দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

তিনি বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধি রোধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বৃষ্টির কারণে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে কোনো কৃত্রিম সংকট বা মজুদদারির অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বাজার মনিটরিং টিম নিয়মিত মাঠে কাজ করছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজার মনিটরিং টিমের সদস্য মো. শাহজাহান আলী বলেন, আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করছি। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সবজির দাম অনেকটা সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। কৃষক পর্যায় থেকে পাইকারি পর্যন্ত খরচ বাড়লে খুচরা পর্যায়েও প্রভাব পড়ে।

তিনি আরও বলেন, ক্রেতারা অভিযোগ করলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিই। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষি বিপণন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল লতিফের মতে, শুধু বাজার মনিটরিং করে সবজির দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মৌসুমি সবজির দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার মূল কারণ হলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভের মার্জিন। কৃষক ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ভোক্তা বেশি দামে কেনা—এই দুই প্রান্তের ব্যবধান কমাতে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

তিনি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন। এতে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণত বর্ষাকালীন সবজির সরবরাহ ভালো থাকে এবং দামও সহনীয় পর্যায়ে থাকে। তবে এবার টানা বৃষ্টি ও কিছু এলাকায় ফসলের ক্ষতির কারণে সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারদরে।

এদিকে শীতকালীন সবজি শিম, ফুলকপি ও বাঁধাকপি বাজারে আসতে শুরু করলেও এগুলোর দাম এখনো বেশি। ফলে ক্রেতারা মৌসুমি সবজির ওপর নির্ভর করলেও সেখানেও স্বস্তি মিলছে না।

হাতিরপুল বাজারের ক্রেতা মো. কামরুল হাসান বলেন, আগে সপ্তাহে দুই-তিনবার ভালো সবজি কেনা যেত। এখন হিসাব করে কিনতে হয়। দাম এভাবে চলতে থাকলে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে অনেক পরিবারে।

ভোক্তা অধিকার কর্মী সালমা আক্তার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি এবং মূল্য তালিকা প্রকাশ করা উচিত। ক্রেতারা যাতে জানতে পারে কোন সবজির যৌক্তিক দাম কত। একইসঙ্গে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান হবে, আর ভোক্তারা ভুগবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং সেলের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা প্রতিদিন বিভিন্ন বাজারের দাম সংগ্রহ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য রাখছি যাতে কেউ অতিরিক্ত দাম আদায় করতে না পারে। অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানাও করা হচ্ছে। তবে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

সবজি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিজনিত সরবরাহ ঘাটতি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে খুচরা দামে। অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, এসব কারণের বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মৌসুমি সবজি বাজারে উঠলেও তার সুফল সাধারণ ভোক্তারা কতটা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার তদারকির পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ানো, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে সবজি সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাজারদরের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

ডেইলি-বাংলাদেশ//একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!