চরফ্যাশনে শিক্ষা খাতে হরিলুট
বিদ্যালয়গুলোর জন্য পাঠানো সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরি, শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং অন্যায়ভাবে টাকা কেটে রাখার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে।
খেলাধুলার আয়োজন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সরঞ্জাম কেনা, নির্বাচনী ভোটকেন্দ্র সংস্কার কিংবা দুর্যোগকালীন জরুরি খাতের অনুদান—সবখানেই অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা।
.png)
উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন একদল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। লিখিত অভিযোগের একটি করে নথি খতিয়ে দেখলে উন্মোচিত হয় সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর নানা চিত্র।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট ও প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার জন্য বরাদ্দকৃত যথাক্রমে ১ লাখ ৫৫ হাজার ও ৮৪ হাজার টাকা ইউনিয়ন পর্যায়ে না পাঠিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ ডিভাইস ক্রয়ের ৯০ হাজার টাকা সরঞ্জাম না কিনে ভুয়া ভাউচারে তুলে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
নির্বাচনী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত উপজেলার ৪২টি বিদ্যালয়ের নামে আসা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনে শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ উঠে এসেছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার প্রায় চার মাস পর অর্থ ছাড় করার সময় বিদ্যালয়প্রতি প্রায় ৯ হাজার টাকা করে কেটে রাখা হয়। সবচেয়ে বড় অঙ্কের অনিয়মের কথা বলা হয়েছে ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ খাতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯টি বিদ্যালয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একাধিকবার কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে বারবার একই বরাদ্দ দিয়ে বাস্তবে কাজ না করে অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।
ডিজিটাল সেবার নামে অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। উপজেলার বহু বিদ্যালয়ে ওয়াইফাই সংযোগ না থাকা ও নেট চালু না হওয়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রত্যয়ন ছাড়া একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা তুলে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাক-প্রাথমিকের বরাদ্দ থেকে স্কুলপ্রতি ৫০০ টাকা কেটে রাখা, ৯৬ জন শিক্ষকের চিত্তবিনোদনের টাকা আটকে রেখে ৫০০ টাকা করে আদায় এবং কনটিনজেন্সি ও ভ্রমণ ভাতার বকেয়া সরাসরি অ্যাকাউন্টে না দিয়ে চেকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অংশ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের নামে হয়রানির কথা উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়, মুজিবনগর ইউনিয়নের তিনটি বিদ্যালয় পরিদর্শনের পর প্রশাসনিক ভয় দেখিয়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রায় দুই মাস বন্ধ রাখা হয়। পরে শিক্ষকপ্রতি ৫ হাজার টাকা উৎকোচ নিয়ে বিল ছাড় করা হয়। ৭-৮ জন অনুগত শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগের অনুলিপি পাঠিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান সব দায় অস্বীকার করে বলেন, 'তারা যেসব অভিযোগ করেছে, আমার কাছে তার সব অফিশিয়াল কাগজপত্র আছে। নিয়ম মেনেই সব টাকা খরচ করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, 'আমার কাছে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা তদন্ত করে দেখবে। অভিযোগপত্র আমার দপ্তরে এলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।