ঢাকাই সিনেমায় ‘সুবাতাস’ নাকি চিরাচরিত ‘সুবাতাস’?
এক সময় বাংলা সিনেমার দর্শকের অভাব ছিল না। সেই স্বর্ণালী সময়গুলো এখন স্বপ্নের মতো। সিনেমা হলের সামনে দর্শকদের দীর্ঘ সারি আর দেখা যায়না। প্রতিমাসে যেখানে ১৫-২০ টি সিনেমা মুক্তি পেত এখন অনেক মাসে নতুন সিনেমা মুক্তির নাম গন্ধও পাওয়া যায় না। বর্তমান সময়ের সিনেমাগুলো থেকে লগ্নীকৃত অর্থ ফিরে পাওয়াও তেমনি কঠিন।
চলতি বছর শুরু হয় সানি সানোয়ার ও ফয়সাল আহমেদের যৌথ পরিচালনায় ‘ব্লাক ওয়ার: মিশন এক্সট্রিম ২’। যার শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন আরিফিন শুভ, মিশা সওদাগর, তাসকিন রহমান, ঐশী, সাদিয়া নাবিলা প্রমুখ। ১৩ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি ছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা। প্রচারণায় কমতি ছিল না, তবে সিনেমাটি আশানুরূপ ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ সিনেমার বাজার শুরু হয় মন্দা দিয়ে।
একই মাসে পরের সপ্তাহে(২০ জানুয়ারি) মুক্তি পায় আবু রায়হান জুয়েল পরিচালিত ও প্রখ্যাত লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘রাতুলের রাত রাতুলের দিন’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’। এতে প্রধান চরিত্রে আছে সিয়াম আহমেদ ও পরীমনি। এটিও ব্যবসায়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে।
২৭ জানুয়ারি মুক্তি পায় গণঅর্থায়ণে খন্দকার সুমন পরিচালিত এবং আইনুন পুতুল, ফজলুল হক অভিনীত সিনেমা ‘সাঁতাও’। সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শক খুঁজে পেতেই হিমশিম খায়। দেশের প্রেক্ষাগৃহে ব্যর্থ হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ প্রশংসা কুড়ায়।
একই বছর ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’, ‘ভাগ্য’, ‘কথা দিলাম’, ‘মন দিয়েছি তারে’, ‘বুবুজান’, ‘মায়ার জঞ্জাল’। একই মাসে পাঁচটি সিনেমা মুক্তি পেলেও সিনেমাগুলো ভুগেছে দর্শক খরায়। প্রযোজকরা লগ্নীকৃত অর্থও পাননি ফিরে।
এ ছাড়াও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত যেসব সিনেমা মুক্তি পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ‘ওরা ৭ জন’, ‘জে কে ১৯৭১’, ‘রেডিও’, ‘লিডার : আমিই বাংলাদেশ’, ‘কিল হিম’, ‘জ্বীন’, ‘শত্রু’, ‘লোকাল’, ‘পাপ : প্রথম চাল’, ‘আদম’, ‘প্রেম প্রীতির বন্ধন’, ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘মা’, ‘সুলতানপুর’, ‘এম আর নাইন’, ‘লালশাড়ি’, ‘প্রিয়তমা’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘প্রহেলিকা’, ‘অন্তর্জাল’, ‘দু:সাহসী খোকা’, ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’, ‘বৃদ্ধাশ্রম’, ‘অসম্ভব’, ‘আজব ছেলে’, ‘মেঘের কপাট’, ‘যন্ত্রণা’, ‘শত্রু’, প্রভৃতি সিনেমা।
মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র দুই ঈদে কয়েকটি সিনেমা ব্যবসা করেছে। ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- শাকিব খানের ‘লিডার : আমিই বাংলাদেশ’, ‘প্রিয়তমা’ এবং আফরান নিশো’র ‘সুড়ঙ্গ’।
আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ লেখক হিমেল আশরাফ। আর ‘সুড়ঙ্গ’ ছবির পরিচালক রায়হান রাফী। অর্থাৎ চলতি বছরটিতে মাত্র ৩টি সিনেমাই ছিল ব্যবসাসফল। যে সিনেমাগুলো মুক্তি পায় বছরের দুই ঈদে। অথচ ঈদে আরো বেশ কয়টি সিনেমা মুক্তি পেলেও সেগুলো ব্যবসা করতে পারেনি। কোনোটি চূড়ান্তভাবে দর্শকশূন্য ফ্লপও হয়। অথচ, বাংলা সিনেমার সোনালি দিনগুলোতে ঈদে কোনো সিনেমা চূড়ান্তভাবে ফ্লপ হয়েছে এমন চিত্র কখনো দেখা যায়নি।
সিনেমার বর্তমান বাজার দেখে অনেকের প্রশ্ন তবে কী বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে সফল শুধু ঈদের সিনেমাই হয়ে গেল? না হলে ঈদ ছাড়া মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলো কেন ব্যবসায়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে?
অথচ ঈদের বাইরে মুক্তি পায় বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের সিনেমা। যেগুলো ব্যবসায়িকভাবে চরম ব্যর্থ হয়। এই তালিকা রয়েছে ‘ব্ল্যাক ওয়ার: মিশন এক্সট্রিম ২’, ‘অন্তর্জাল’, ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’, ‘কিল হিম’, ‘লোকাল’, ‘জে কে ১৯৭১’ প্রভৃতি।
অথচ অনেক নির্মাতা শিল্পী কলাকুশলীর মতে ঢাকাই সিনেমায় ‘সুবাতাস’ বইছে। তাদের কথার রেশে বলাই যায়, এই ‘সুবাতাস’ শুধু চিরাচরিত ‘সুবাতাস’ই। যা প্রতি ঈদে আগে থেকেই কমবেশি বয়ে যায়। আবার সুবাতাস বওয়া এই সিনেমার সবই সেই সিনেমা যেখানে রয়েছে দর্শকপ্রিয় তারকা। কালেভদ্রে ছাড়া এখন সেই নিয়মিত ‘সুবাতাস’ বওয়ার দিন পাল্টে গেছে। এখন তো ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাও মুখ থুবড়ে পড়ছে। সোনালি দিনগুলোতেও যাদের তারকামূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি তাদের সিনেমাই ঈদে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে।
‘সুবাতাস’ বওয়া এই সিনেমার সবই সেই সিনেমা যারা দর্শকপ্রিয় তারকা। এ দিক থেকে অবশ্য এখনো সেই আগের হিসাবটিই বহালতবিয়তেই আছে। এখনো যাদের তারকামূল্য সবচেয়ে বেশি ঈদে তাদের সিনেমাই সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করছে।
সেই হিসাব কষলে এখনো ঈদে শাকিব খানের সিনেমা থাকা মানেই অন্য কোনো অভিনেতার সিনেমা সেখানে কোনোভাবেই লড়াই করতে না পারা। তবে এবারের এক ঈদে অবশ্য নতুন সিনে অভিনেতা হিসেবে ছোট পর্দার দর্শক নন্দিত অভিনেতা আফরান নিশো শাকিব খানের সঙ্গে ভালোই পাল্লা দিতে পেরেছেন। যা এর আগে আর কোনো অভিনেতাকেই দেখা যায়নি।