ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

শিম্পাঞ্জী থেকে যেভাবে এলো সভ্য মানুষ

রেজাউল করিম মুকুল
প্রকাশিত: ১৭:৫৪, ৬ অক্টোবর ২০২২
শিম্পাঞ্জী থেকে যেভাবে এলো সভ্য মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

৬ মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে বাস করতো শিম্পাঞ্জী। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গলে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে তারা। এ শিম্পাঞ্জীর সঙ্গে কিন্তু আজকের সভ্য মানুষের ডিএনএ’র মিল রয়েছে ৯৮ শতাংশ। এতকাল পর আদি প্রজন্ম জঙ্গলে থাকলেও সৃষ্টির সেরা জীবের তকমায় বিশ্বে বিচরণ করছে মানুষ। এটি নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা থাকলেও সেই জট অনেকটা খুলে দিয়েছেন এবার চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত ড. সেভান্তে পেবো। মানব ইতিহাসের বিবর্তন সম্পর্কে চমকপ্রদ আবিষ্কার আবার বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন এ বিজ্ঞানী।

শিম্পাঞ্জীর পূর্ব প্রজন্ম

শিম্পাঞ্জীদের পূর্ব প্রজন্ম ১৪-১৮ মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব আফ্রিকার রেইন ফরেস্টে সপরিবারে বসবাস করতো। জীববিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জীদের পূর্ব প্রজন্মের নামকরণ করেছেন প্রোকনসাল। পূর্ব আফ্রিকার প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবাউটি, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়ায় ছিল তাদের বিচরণ। ১৪-১৮ মিলিয়ন বছর আগে এসব দেশে এখনকার মতো এত বিভাজন ছিল না। কারণ সেখানে তখন আদি বা সভ্য মানুষের অস্তিত্ব ছিল না।

Advertisement

প্রোকনসালরাই মানুষের আদিরূপ- এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে আফ্রিকান এ্যাপস, যারা এ শিম্পাঞ্জী ও গেরিলাদের মিলিত রূপ। সময় বসে থাকেনি, থেমে যায়নি নদীর পানিও। এখন থেকে প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ার গহীন বনে বাস করতো অস্ট্রালোপিথিসিনস নামের শিম্পাঞ্জী বংশোদ্ভূত মানুষের পূর্ব প্রজন্মগুলো। তাদের হাড়গোড়ের কার্বন-১৪ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রাণীটির বয়সও বের করা গেছে।

অস্ট্রালোপিথিসিনস নামের শিম্পাঞ্জীরা সোজা হয়ে দাড়াতে পারতো। দুই পায়েও হাঁটতে, এমনকি দৌড়াতেও পারতো। এইতো ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়াতে সেই প্রজাতির শিম্পাঞ্জীর ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বার কঙ্কালটি পাওয়া গেছে।

কঙ্কালের পেলভিক গার্টেন দেখে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটি একটি মেয়ের কঙ্কাল। এটির নামকরণ করা হলো লুসি। এর অনেক পর, তাও এক মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব-মধ্য আফ্রিকায় বাস করতো প্যারানথ্রোপাইনস নামের প্রজন্মটি। এরা পুরুষ। লম্বায় চার ফুটেরও বেশি। তাদের চ্যাপটা মুখ, ব্রেন সাইজ ছিল ছোট। এরাও অস্ট্রালোদের পুরুষ বংশধর। এরা শুধু হাঁটাহাটি নয়, গাছের ডাল তীক্ষ্ণ করে দৌড়ঝাঁপে পশু শিকার করতে পারতো। এরাই ১০ থেকে ২০ লাখ বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ্য রূপের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। বিজ্ঞানীরা এ প্রজন্মকেই বলেছেন হোমো-সেপিয়েন্স।

হোমো-সেপিয়েন্স

মাত্র দুই লাখ বছর আগের হোমো-সেপিয়েন্সদের দুইভাগে ভাগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এক- হোমো হ্যাবিলিস, দুই- হোমো ইরেকটাস।

হোমো হ্যাবিলিসরা হাতের ব্যবহার করতে শিখেছিল। এ প্রজন্মের ব্রেন সাইজ ছিল ৬৫০ এমএল থেকে ৮০০ এমএল। আর মুখ ও কাঁধ ছিল চ্যাপটা। এরাই প্রথম তৈরি করেছিল পাথরের অস্ত্র। তাদের শরীরে লোমের পরিমাণও ছিল কম।

হোমো ইরেকটারা জঙ্গল ত্যাগ করে হাঁটতে হাঁটতে ইউরোপ-এশিয়ার সমতলে খোলা আকাশের নিচে এসেছিল। তাদেরই একজন আবিষ্কার করে আগুন। তখন থেকে তারা যেমন আগুনে পুড়িয়ে মাংস খেতে শুরু করে তেমনি প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের সময় আগুনের উত্তাপ নিয়ে নিজেকে উষ্ণ রাখতে পেরেছিল। একইসঙ্গে বন্য হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আগুনের ব্যবহার হতো। তাদের চ্যাপটা মুখ, প্রশস্ত চোয়াল, শক্তিশালী দাঁত, খাড়া শরীর আমাদের আদি প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। তাদের ব্রেন সাইজ ছিল ৮৪০ থেকে ১১০০ মিলি, যা আজকের হোমো-সেপিয়েন্সদের মতোই ১৪০০মিলি।

নিয়ানডার্থাল

হোমো-সেপিয়েন্সদের পরের প্রজন্ম হচ্ছে নিয়ানডার্থাল। এ প্রজন্মের প্রজাতিরা এশিয়া ও ইউরোপের ঠাণ্ডা মানিয়ে নেয়। তারাই প্রথম তাদের সুঠাম শক্তিশালী দেহকে পশুর চামড়ায় আবৃত করে। বন ও নদী থেকে খাদ্য, জ্বালানি, গৃহনির্মাণ সামগ্রী ও ঔষধও সংগ্রহ করেছিল তারা। এরাই অনেক পরে তাদের মরদেহগুলো মাটিচাপা দেওয়ার মতো বিচক্ষণ কাজ করেছিল। তাদের ব্রেনের সাইজও ছিল বড়। কাঠের গুড়ি গড়িয়ে যেতে দেখে চাকার কথা ভেবেছিলেন মানুষের বিবর্তনের এ প্রজন্ম। তারাই নদীতে ভেলা বানিয়েছিল। বন থেকে উপকারী পশু ধরে এনে নিজেদের উঠানে বেঁধে রাখতেন তারা। বিশেষ করে দুধের জন্য বেঁধে রাখা হতো গরু ও মহিষ। মানুষের এ প্রজন্মই সম্ভবত পশুদের মতো প্রকাশ্যে যৌনকর্ম থেকে সরে আসে। তাদের হাত ধরেই কিছুটা গোপনে সঙ্গমকে উত্তম মনে করা হয়েছিল।

মানুষের ক্রম বিবর্তন একমাত্র পৃথিবী নামক গ্রহেই সম্ভব হয়েছে। অন্য কোনো গ্রহে হয়েছে কিনা জানা নেই। আমাদের গ্রহ পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ছিল অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, যা শুধু মানুষ নয়- অন্য সব হাজার, লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেলায়ও ঘটেছে।

বিজ্ঞানীরা অবশ্যম্ভাবী ঘটনাকে বলেছেন- বায়োলজিক্যাল ডিটারমিনেজম। এটি চলছে এবং চলতেই থাকবে। এ বিবর্তনের ধারায় এখন থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার বছর আগের মানুষ আর আজকের মানুষ কী এক? সেই সময়ের পৃথিবী এবং আজকের পৃথিবী কী এক একই রকম? আজকের বিবর্তিত মানুষ কেন প্রশ্নটির উত্তর চায়। এমন প্রশ্নটি করেই মানুষ তার উত্তরও খুঁজে পাচ্ছে।

সেভান্তে পেবোর চমকপ্রদ ‘অসম্ভব’ আবিষ্কার

বিবর্তনের ইতিহাস এবং পৃথিবীর চারদিকে মানুষের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে সাহায্য করায় এবার ২০২২ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন সুইডিশ বিজ্ঞানী ড. সেভান্তে পেবো। তার গবেষণার বিষয় ছিল- মানবজাতির পূর্বপুরুষ বিলুপ্ত হোমিনিনসের জিনম ও মানব বিবর্তন।

সুইডিশ বিজ্ঞানী ড. সেভান্তে পেবো- ছবি: সংগৃহীত

মানব বিবর্তন গবেষণার জন্য জীবাশ্মবিদ্যা এবং প্রত্নতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০-এর দশকে মানুষের জেনেটিক কোডের ওপর ব্যাপক গতিতে গবেষণা চলছিল। তবে মানুষের পূর্ব-প্রজন্মগুলোর জেনেটিক উপাদানের প্রতি অধ্যাপক পাবোর আগ্রহ ছিল বেশি। অনেকে ভেবেছিলেন- এটি একটি অসম্ভব কাজ।

পৃথিবীর পীঠে সওয়ার হওয়া নিঃসঙ্গ মানুষ সূর্যটাকে কতটা পাক দিয়েছে, কতশত নদী পথ মরুতে হারিয়েছে, কত অরণ্য-বনভূমি বিলীন হয়েছে, কত বন্যপশুর প্রজন্ম ধ্বংস হয়েছে, কে তার হিসেব রেখেছে?

তবে মানুষের আচার-আচরণ, কলাকৃষ্টিও বদলাতে বদলাতে তলানিতে থাকা সূত্র ধরেই এগিয়েছিলেন পাবো। তিনি প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার বছরের পুরনো একটি হাড়ের টুকরো থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্স তৈরি করতে সক্ষম হন। তিনি মানুষের নিকটতম বিলুপ্ত আত্মীয়, নিয়ান্ডারথালের জিনোমের ক্রম আবিষ্কারে সফল হন। 

নিয়ানডার্থালরা ছিল মানুষের উৎস প্রজাতি, যারা ৪০ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়। নোবেল পুরস্কার কমিটি জানায়, পাবো আমাদের বিলুপ্ত আত্মীয় এই নিয়ানডার্থালের জেনেটিক কোড গবেষণার অসম্ভব কাজটি করেছেন। পাবো সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা থেকে পাওয়া ৪০ হাজার বছর আগের মানুষের ছোট একটি আঙুলের হাড় থেকে পাওয়া জিনোম তথ্য দিয়ে তার গবেষণার কাজটি করেন। 

সেভান্তে পেবোর গবেষণা থেকে জানা যায়, হোমো সেপিয়েন্সরা প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর নিয়ানডার্থালদের সঙ্গে প্রজননের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। পাবোর এ যুগান্তকারী আবিষ্কার মানুষের বিবর্তনের একটি বিজ্ঞানসম্মত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিয়েছে। এ আবিষ্কার আমাদের আজকের ও আগামীর মেধাবী মানুষকে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য একটি উন্নত ভিত্তি ও বৈজ্ঞানিক কাঠামো প্রদান করলো। পাবোর এ নোবলপ্রাপ্তির সঙ্গে মানুষের আগামী প্রজন্মগুলোকে প্রচলিত অনেকগুলো বিশ্বাস ও ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেও সাহায্য করবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকেএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!