মিয়ানমারের গহীন জঙ্গলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি
মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কারেনের গহীন জঙ্গলে গোপন ক্যাম্পে জান্তাবিরোধী বিদ্রোহীরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। দেশটির সবচেয়ে পুরোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) সদস্যরা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে রাইফেলে গুলি ভরে তা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করতে হয় কিংবা হাতে বানানো বোমার খুঁটি-নাটি জ্ঞান থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে তাদের।
কারেনের জঙ্গলসহ দেশজুড়ে এ রকম বেশকিছু গোপন ক্যাম্পে বর্তমানে চলছে ক্ষমতাসীন জান্তার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী বেসামরিক জনগণের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি।
.png)
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ প্রস্তুতির কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। এতে এক ফিটনেস কোচ ও বেশ কিছু তরুণ-তরুণীকে সশস্ত্র গেরিলাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গেছে।
ছবিতে থাকা সেই তরুণ-তরুণীরা জানিয়েছে, গেরিলা যোদ্ধা হওয়ার জন্য তারা শহরের চাকরি ছেড়েছে। টি-শার্ট, রঙচঙে পোশাক ছেড়ে তারা পরেছে সেনাদের পোশাক।

তাদের ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ নেয়া হয় সেপ্টেম্বরে। জঙ্গলে প্রশিক্ষণ নেয়া দল এবং দেশব্যাপী অন্যান্য সিভিল ডিফেন্স ফোর্স সম্পর্কে সামরিক জান্তা সরকারের মুখপাত্রের কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশিক্ষণ নিতে আসা কয়েকজন বলেছেন, তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। কারণ, সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ করেও নতুন শাসকদেরকে টলানো যায়নি; বরং এই শাসকরা উল্টো বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস-দমনপীড়ন চালিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩৪ বছর বয়সী সাবেক এক ফিটনেস প্রশিক্ষক বলেন, “হাতে অস্ত্র তুলে নেয়াটাই এখন আমাদের জন্য একমাত্র পথ।”
তার সারা পিঠে আছে ট্যাটু। তাতে লেখা, “নেতৃত্ব দেওয়ার স্বাধীনতা।” সেইসঙ্গে আঁকা আছে মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চির অবয়ব।

গত ফেব্রুয়ারিতে অভ্যূত্থানের পরপরই সুচিকে আটক করে সেনাবাহিনী, এরপর বিক্ষোভে উস্কানি এবং করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সামরিক আদালত তাকে শাস্তিও দিয়েছে।
সু চির মামলার এই রায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার জান্তা বলছে, সু চির সাজাই প্রমাণ করে যে কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়, এবং বিচার ব্যবস্থায় ‘কোন পক্ষপাতিত্ব’ নেই।
মিয়ানমারের অন্যতম সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠী ‘কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ (কেএনইউ) বেসামরিক নাগরিকদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এই গোষ্ঠী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্নতা প্রকাশ করেছে এবং হাজার হাজার মানুষকে তাদের এলাকায় আশ্রয় দিয়েছে।
তবে কারেন রাজ্যের জঙ্গলে গোপন প্রশিক্ষণের বিষয়ে গোষ্ঠীটি কোনও মন্তব্য করেনি।
মিয়ানমারে অভ্যুত্থানবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘পিপল’স ডিফেন্স ফোর্সেস’ এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে দেশজুড়ে আরও এমন শত শত প্রতিরোধ গোষ্ঠী গড়ে উঠছে।

প্রশিক্ষণের এক আয়োজক বলেছেন,তাদের প্রশিক্ষণ দলে তরুণ বয়সী শতাধিক মানুষ যোগ দিয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুনরা আসছে। তবে রয়টার্স নিরপেক্ষ সূত্রে এ বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে সন্ধ্যার এক সময়ের বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এ সময় প্রশিক্ষণ নিতে আসা যোদ্ধারা ক্যম্পফায়ারে চারপাশে বসে গিটার এবং বেহালা বাজিয়ে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে।
জঙ্গলের শিবিরে আসার পর সাবেক একজন প্রশিক্ষক বলেছেন, ৩ লাখ প্রশিক্ষিত সদস্যের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা ভেবে তিনি শঙ্কিত হয়েছেন। কিন্তু প্রতিরোধ লড়াই করাটাই একমাত্র পথ বলে স্বীকার করেন তিনি।
“আমার দেশের মানুষের সুরক্ষায় আমার প্রাণ চলে গেলেও তা নিয়ে আমি গর্বিত হতে চাই,” বলেন তিনি।