গ্যাস সংকটের মধ্যে স্বস্তির খবর
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে যখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে হাহাকার চলছে, তখন দেশীয় গ্যাস খাত থেকে মিলছে কিছুটা স্বস্তির খবর। নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ এখন বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আগামীকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। পাশাপাশি তিতাসের আরও তিনটি এবং বাখরাবাদের একটি কূপ থেকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।
.png)
সব মিলিয়ে পাঁচটি কূপ থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৬৭.৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ খুব বেশি না হলেও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর চাপ কিছুটা কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক—সব খাতেই গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়ার খবরকে জ্বালানি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবারই জাতীয় গ্রিডে আসছে তিতাস-২৮-এর গ্যাস
বিজিএফসিএলের আওতাধীন তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার ফুট গভীর এই কূপ থেকে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শনিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত কূপটির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই প্রসেস প্ল্যান্টের মাধ্যমে এই কূপের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে।
বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম জানান, উদ্বোধনের পর তিতাস-২৮ কূপ থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।
‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকটি কূপের উন্নয়ন ও খননকাজ চলছে। এরই মধ্যে তিতাস-২৮-এর কাজ শেষ হয়েছে। অন্য কূপগুলোর কাজও এগিয়ে চলছে।
তিতাসের আরও তিন কূপে উৎপাদনের অপেক্ষা
তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করছে বিজিএফসিএল।
তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে লগিংসহ আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কূপটি থেকে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কূপ থেকেও দৈনিক ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে কর্তৃপক্ষ।
তবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপ। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল এ কূপের খননকাজ শুরু হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কূপটির গভীরতা প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার। এরই মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটার পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে।
ভূতাত্ত্বিক কোনো জটিলতা না হলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর খননকাজ শেষ হতে পারে। কূপটি সফল হলে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
এরপর বাখরাবাদ-১১
তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মিটার।
সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা শেষ হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন, তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ মিলিয়ন এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট—সব মিলিয়ে পাঁচটি কূপ থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি
দেশে গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৬১ কোটি এবং এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।
এর আগে ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। পরে ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি ফের চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
বর্তমানে এলএনজি সরবরাহও ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে মোট গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাড়তি গ্যাসের বড় অংশ শিল্প খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতেও কিছুটা সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, যাতে লোডশেডিং কমানো যায়।
দেশীয় উৎস থেকে নতুন এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে চলমান সংকট পুরোপুরি দূর না হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।