ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসা

মো. মামুন কবীর মো. মামুন কবীর
প্রকাশিত: ২০:৩৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসা
ছবি: সংগৃহীত

শিশুরা পরিবার ও সমাজের সবচেয়ে কোমল ও স্পর্শকাতর অংশ। তাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা ও সুন্দর আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম শিশুদের প্রতি মমতা ও দায়িত্বশীল আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে সন্তানদের আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে দেখার শিক্ষা পাওয়া যায়। আর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬)। আলেমরা এ আয়াতের ব্যাখ্যায় পরিবারকে ঈমান, নৈতিকতা ও সৎকর্মের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সন্তানকে শুধু ভরণপোষণ করাই নয়, তাকে নৈতিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও অভিভাবকের দায়িত্ব।

শিশুদের প্রতি নবীজির স্নেহ

Advertisement

মহানবী (সা.) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন, সালাম দিতেন, কোলে নিতেন এবং আদর করতেন। শিশুদের সঙ্গে তার আচরণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তার নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দেন। এ সময় আকরা ইবনে হাবিস (রা.) উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে; আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এই হাদিস শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। শিশুকে আদর করা, তার প্রতি মমতা প্রকাশ করা এবং তাকে নিরাপদ অনুভূতি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় আচরণ।

নাতিদের প্রতি বিশেষ মমতা

মহানবী (সা.) তার নাতি হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন।

একাধিক হাদিসে হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসার কথা এসেছে। তিনি তাদের আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া ও তাদের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

একবার হাসান (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোলে থাকা অবস্থায় সদকার একটি খেজুর মুখে দেওয়ার চেষ্টা করলে নবীজি (সা.) তা বের করে দেন। তিনি বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আমরা সদকা খাই না?’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, শিশুকে ভালোবাসার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই তাকে সঠিক ও ভুলের শিক্ষা দিতে হবে। তবে সেই শিক্ষা দিতে হবে শিশুর বয়স ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে।

শিশুর কান্নার প্রতিও সংবেদনশীল ছিলেন

নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময়ও মহানবী (সা.) শিশুদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি; কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এ হাদিসে নবীজির (সা.) মানবিকতার অসাধারণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। শিশুর কান্নাকে তিনি বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং শিশুর কান্নায় মায়ের যে কষ্ট হয়, সেটিও তিনি বিবেচনা করেছেন।

শিশুদের সালাম দিতেন

মহানবী (সা.) শিশুদেরও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সম্মান করতেন। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিতেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এ আচরণের মধ্য দিয়ে শিশুদের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার শিক্ষা পাওয়া যায়। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের সম্মান করা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সমাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।

শিশুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ

মহানবী (সা.) শিশুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতেন। তবে তার আনন্দ কখনো মিথ্যা, প্রতারণা বা শিশুকে অপমান করার মাধ্যমে ছিল না। বরং তিনি শিশুদের মন বুঝতেন এবং তাদের বয়স উপযোগী আচরণ করতেন।

হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের সঙ্গে মিশতেন এবং ছোটদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শিশুদের শুধু শাসন নয়, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।

এতিম শিশুদের প্রতি ইসলামের বিশেষ গুরুত্ব

ইসলাম এতিম শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নের নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (সুরা আদ-দুহা, আয়াত ৯)।

অন্য আয়াতে এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১০)। অর্থাৎ এতিম শিশুর অধিকার রক্ষা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ধর্মীয় দায়িত্বও।

মহানবী (সা.) এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারীর জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।’ এরপর তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের দিকে ইঙ্গিত করেন। (সহিহ বুখারি)।

সন্তান পালনে দায়িত্বশীলতার শিক্ষা

ইসলামে সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করার দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়, বাবারও। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এ নির্দেশনা অনুযায়ী সন্তানদের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার পাশাপাশি তাদের চরিত্র, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানুষের প্রতি ভালো আচরণ শেখানো অভিভাবকের দায়িত্ব।

পবিত্র কোরআনে হজরত লোকমান (আ.)-এর মাধ্যমে সন্তানকে উপদেশ দেওয়ার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তার সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করার শিক্ষা দেন এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ ও ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দেন। (সুরা লোকমান, আয়াত ১৩, ১৭-১৯)।

বর্তমান সমাজে নবীজির শিক্ষা

বর্তমান সময়ে শিশুদের বড় একটি অংশ বেড়ে উঠছে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে অনেক শিশুই পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ পাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও শিশুকে অতিরিক্ত শাসন, অপমান কিংবা অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর জীবনাচরণ অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। শিশুদের ভুল হলে ধৈর্যের সঙ্গে বোঝানো, তাদের কথা শোনা, ভালো কাজের প্রশংসা করা, সময় দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা এসব শিশুর সুন্দর মানসিক বিকাশে সহায়ক।

শিশুকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল কিংবা ভবিষ্যৎ পেশার জন্য প্রস্তুত করা নয়; বরং তাকে সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত অভিভাবকদের অন্যতম লক্ষ্য।

ভালোবাসাই হতে পারে সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি

মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি শিশুদের অবহেলা করেননি; বরং তাদের সম্মান দিয়েছেন, আদর করেছেন, ভুল হলে শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন।

কোরআনের পরিবার রক্ষার নির্দেশনা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণ একত্রে আমাদের শেখায় সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাকে ভালোবাসা, সঠিক শিক্ষা দেওয়া, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আজকের শিশু আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের প্রতি মমতা, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা গেলে গড়ে উঠতে পারে সুন্দর ভবিষ্যৎ। মহানবী (সা.)-এর শিশুদের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা সেই পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিশা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!