ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]
ঢাকা জেলা পুলিশের পোশাকের টেন্ডার

সর্বনিম্ন ৫ দরদাতাকে বাদ দিয়ে ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার দাবি পুলিশের, তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক
বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ১৫:২০, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বনিম্ন ৫ দরদাতাকে বাদ দিয়ে ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ
প্রতীকী ছবি

ঢাকা জেলা পুলিশের পোশাক সেলাইয়ের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ‘জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন’সহ প্রথম থেকে পঞ্চম সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ‘ইউনাইটেড ট্রেডার্স’কে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এই পরিস্থিতির কারণে একদিকে যেমন সরকারের লাখ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত ঠিকাদাররা।

Advertisement

বঞ্চিত ঠিকাদারদের অভিযোগ, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নিয়ম মেনে অনলাইনে আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, আর্থিক সামর্থ্য এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র থাকার পরও তাদের দরপত্রগুলো অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের স্পষ্ট দাবি, পুরো টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।

তবে ঢাকা জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষের দাবি, ই-জিপি ব্যবস্থায় অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। তার পরও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, ঢাকা জেলা পুলিশের পোশাক সেলাইয়ের কাজের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের ৭ জুলাই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২২ জুলাই। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর মোট ৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়।

এর মধ্যে ২১ জুলাই দরপত্র জমা দেয় ঝুমা এন্টারপ্রাইজ, এম/এস আবেদিন এন্টারপ্রাইজ, এম/এস রয় এন্টারপ্রাইজ এবং এম/এস উষা এন্টারপ্রাইজ—এই চারটি প্রতিষ্ঠান। বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন, ইউনিকন ট্রেডিং করপোরেশন, এম/এস হৃদয় ট্রেডিং, ইউনাইটেড ট্রেডার্স এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্রেডার্স—দরপত্র জমা দেয় ২২ জুলাই।

দরপত্র উন্মুক্তকরণ (টেন্ডার ওপেনিং) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন’—এর দর ছিল ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৩ টাকা। দ্বিতীয় দরদাতা ‘ঝুমা এন্টারপ্রাইজ’— এর দর ছিল ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৮ টাকা। 

এছাড়া বাকি দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত দর ছিল— ইউনিকন ট্রেডিং করপোরেশন — ১ কোটি ৭১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৩ টাকা; এম/এস হৃদয় ট্রেডিং — ১ কোটি ৭২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা; এম/এস আবেদিন এন্টারপ্রাইজ — ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৫ টাকা; ইউনাইটেড ট্রেডার্স — ১ কোটি ৭৯ লাখ ৭৩ হাজার ৫৮৭ টাকা; ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্রেডার্স — ১ কোটি ৮৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৩৬ টাকা; এম/এস রয় এন্টারপ্রাইজ — ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪ টাকা এবং এম/এস উষা এন্টারপ্রাইজ — ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৯ টাকা।

দরপত্র উন্মুক্তকরণ (টেন্ডার ওপেনিং) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন’-এর প্রস্তাবিত দর ছিল ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৩ টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় দরদাতা ‘ঝুমা এন্টারপ্রাইজ’-এর দর ছিল ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৮ টাকা।

এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত দর ছিল— তৃতীয় দরদাতা ইউনিকন ট্রেডিং করপোরেশনের ১ কোটি ৭১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৩ টাকা, চতুর্থ দরদাতা এম/এস হৃদয় ট্রেডিংয়ের ১ কোটি ৭২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, পঞ্চম দরদাতা এম/এস আবেদিন এন্টারপ্রাইজের ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৫ টাকা, ষষ্ঠ দরদাতা ইউনাইটেড ট্রেডার্সের ১ কোটি ৭৯ লাখ ৭৩ হাজার ৫৮৭ টাকা, সপ্তম দরদাতা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্রেডার্সের ১ কোটি ৮৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৩৬ টাকা, অষ্টম দরদাতা এম/এস রয় এন্টারপ্রাইজের ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪ টাকা এবং সর্বশেষ নবম দরদাতা এম/এস উষা এন্টারপ্রাইজের দর ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৯ টাকা।

টেন্ডার ওপেনিং রিপোর্ট অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন’-এর কাজটি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতাকে বিবেচনায় না নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ‘ইউনাইটেড ট্রেডার্স’কে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে সরকারের তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টাকা গচ্ছা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ‘জেড হক ট্রেডিং করপোরেশন’-এর স্বত্বাধিকারী আবুল কাশেম (বাবু) বলেন, “সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কেন কাজ পেলাম না, তা জানি না। কোন প্রক্রিয়ায় কাজটি দেওয়া হয়েছে, সেটিও আমার বোধগম্য নয়।”

ইউনাইটেড ট্রেডার্সের চেয়ে কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নিয়ম মেনে অনলাইনে আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, আর্থিক সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র থাকার পরও তাদের দরপত্রগুলো অন্যায়ভাবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

তারা আরও বলেন, সাধারণত সরকারি প্রাক্কলন বা নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার গুরুতর ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর অফিসিয়াল নম্বরে এবং অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ অনুবিভাগ) মোহাম্মদ আবু নঈমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) মো. জসিম উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এসব টেন্ডারের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টি আর আমাদের হাতে থাকে না; পুলিশ অধিদপ্তর এটি দেখভাল করে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বলা সম্ভব নয়।”

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “টেন্ডার কার্যক্রম সম্পূর্ণ ই-জিপির মাধ্যমে হয়ে থাকে। দরপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে উন্মুক্তকরণ (ওপেনিং) পর্যন্ত সমস্ত কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হয়। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য একটি পৃথক কমিটি করে দেওয়া হয়েছে এবং তারাই সম্পূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার জানা মতে, এখানে অনিয়ম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার পরও আমি অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছি। কেউ যদি কোনো ধরনের অনিয়ম করে থাকে এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর ফলে একসময়ের শারীরিক টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি প্রদর্শন ও সনাতন সন্ত্রাস কিছুটা কমলেও দুর্নীতির ধরন বদলেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাবশালী, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের ত্রিপক্ষীয় আঁতাত বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ই-জিপিতেও দুর্নীতি ও যোগসাজশ বাড়ছে। ই-জিপির মাধ্যমে যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আশা করা হয়েছিল, তা আজ ব্যাহত হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “ঢাকা জেলা পুলিশের টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বাড়বে এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও সুসংহত হবে।”

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!