প্রাচ্যের স্থাপত্যশৈলী ও পারিবারিক ঐতিহ্যের অনন্য দলিল ‘চেন ক্ল্যান হল’
আধুনিক নগরায়ণ, সুউচ্চ ভবন আর প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের মধ্যেও নিজেদের ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শেকড় ধরে রেখেছে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গুয়াংঝৌ। একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন বাড়িঘর, পারিবারিক উপাসনালয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে শহরটিতে অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে। এর অন্যতম নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘চেন ক্ল্যান অ্যানসেস্ট্রাল হল’। ১৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা শুধু একটি পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং চীনের লিংনান অঞ্চলের পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষা, সামাজিক সহযোগিতা ও শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
চীনের গুয়াংডং প্রদেশের রাজধানী গুয়াংঝৌ পার্ল নদীর তীরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক নগরী। দীর্ঘদিন ধরে শহরটির অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ছিং রাজবংশের (১৬৪৪-১৯১২) সময়ে স্থানীয় পরিবারগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রশাসন ও সমাজসেবায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে।
ছিং রাজবংশের শেষভাগে, ১৮৯৪ সালে গুয়াংডং প্রদেশের ৭২টি ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে আসা চেন পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এই স্থাপনাটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। মূলত চেন বংশের বিভিন্ন শাখার সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধা এবং গুয়াংঝৌতে পারিবারিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯০৫ সালে এটি একটি অ্যাকাডেমিতে রূপান্তরিত হয়। সেখানে তরুণরা রাজকীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন। সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এর ভূমিকা হারালেও স্থাপত্য ও শৈল্পিক সৌন্দর্য আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
চেন ক্ল্যান অ্যানসেস্ট্রাল হলের পুরো চত্বর প্রায় ১৩ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো এই চত্বরে রয়েছে ১৯টি ভবন, ছয়টি উঠান ও নয়টি করিডোর। লিংনান স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে এখানকার কাঠামোগত বিন্যাসও বেশ আকর্ষণীয়। ভবনগুলোর ছাদ, দেয়াল ও স্তম্ভে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চীনা সংস্কৃতির নানা উপাখ্যান।
স্থাপনাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর সূক্ষ্ম ভাস্কর্য ও অলংকরণ। চীনা লোকশিল্পের এক অনন্য প্রদর্শনী বলা যায় পুরো চত্বরকে। মূল বিম, দরজা ও জানালার কাঠের ফ্রেমে পৌরাণিক কাহিনি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিখুঁতভাবে খোদাই করা হয়েছে। এ ছাড়া দেয়ালের ইটের সূক্ষ্ম খোদাই ভবনগুলোতে এনে দিয়েছে ত্রিমাত্রিক সৌন্দর্য। সিঁড়ি, ভিত্তিপ্রস্তর ও স্তম্ভের গোড়ায় রয়েছে চমৎকার পাথরের কারুকাজ। ছাদের কার্নিশ ও চূড়ায় রঙিন মৃৎশিল্পে তৈরি বিশাল ভাস্কর্য ও নকশা দূর থেকেই নজর কাড়ে। পাশাপাশি দরজা-জানালায় ধাতব শিল্পের ব্যবহার এবং দেয়াল ও দরজার ঐতিহ্যবাহী চিত্রকর্ম স্থাপনাটির নান্দনিকতাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
চীনের বেইজিং থেকে আসা পর্যটক লি জিনবি বলেন, “গুয়াংঝৌর আধুনিক রূপ আমরা প্রতিদিন আকাশচুম্বী দালানকোঠায় দেখি। কিন্তু এই প্রাচীন পারিবারিক প্রাসাদে পা রাখলেই বোঝা যায় আমাদের শিকড় কতটা গভীরে। কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ, সিরামিকের ভাস্কর্য এবং ছাদের ওপর খোদাই করা প্রাচীন লোকগাথাগুলো সত্যিই বিস্ময়কর। আমাদের পূর্বপুরুষদের শিল্পচেতনা এবং নান্দনিকতা কতটা উন্নত ছিল, তা এখানে না এলে হয়তো অনুধাবন করতে পারতাম না।”
বাংলাদেশ থেকে আসা গণমাধ্যমকর্মী সেবিকা দেবনাথ বলেন, “প্রাচ্যের স্থাপত্য সম্পর্কে আমার একটা বিশেষ আগ্রহ আছে, তবে গুয়াংঝৌর প্রাচীন পরিবারগুলোর প্রাসাদ দেখে আমি অভিভূত! শত শত বছর আগের তৈরি হলেও ঘরের আঙিনা এবং প্রাকৃতিক আলোর ব্যবস্থা এত আধুনিক যে অবাক হতে হয়। আধুনিক শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে প্রাচীন এই চত্বরগুলোতে এক অদ্ভুত পরম শান্তি ও আভিজাত্য বজায় আছে।”
বাংলাদেশ থেকে আসা আরেক পর্যটক ও গণমাধ্যমকর্মী প্রতীক ইজাজ বলেন, “প্রতিটি দেয়ালে ও দরজায় যে পরিবারটির ইতিহাস আর পারিবারিক মূল্যবোধ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা সত্যিই শিক্ষণীয়। কেবল একটি থাকার জায়গা নয়, ঐতিহ্যবাহী চীনা পরিবারগুলো কীভাবে নিজেদের একতা ও কৃষ্টি বজায় রাখত, তার অনন্য নিদর্শন এই ভবনগুলো। ইতিহাসের পাতায় যা পড়েছি, আজ তা চোখের সামনে দেখে অনেক কিছু নতুন করে উপলব্ধি করতে পারলাম।”
যুক্তরাজ্য থেকে আসা পর্যটক মাইকেল স্মিথ বলেন, “ইট, কাঠ আর সিরামিকের প্রতিটি ভাঁজে যে অনন্য কারুকাজ ও অলংকরণ রয়েছে, তা অতুলনীয়। বিশাল চীনা যৌথ পরিবারের জীবনযাত্রা এবং স্থাপত্যশৈলী কীভাবে একটি ঐতিহ্যকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে, তা চীনের এই প্রাচীন পারিবারিক এস্টেটগুলো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়।”
স্থানীয়দের মতে, চেন ক্ল্যান অ্যানসেস্ট্রাল হল কেবল ইটের গাঁথুনি বা কাঠের তৈরি কোনো প্রাচীন স্থাপনা নয়। এটি চীনের সমৃদ্ধ ইতিহাস, শিল্পীদের অসাধারণ সৃজনশীলতা এবং একটি বংশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের অনন্য দলিল। গুয়াংঝৌর আধুনিক গগনচুম্বী ভবনগুলোর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজও অতীতের গৌরবময় অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।