কী ঘটবে? কল্পিত নাকি পরিকল্পিত!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধকে কেন্দ্র করে ১৩ নভেম্বর তারিখটি নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়ায়।
ইউরোপের ১৭ টি দেশ - জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ডের মত দেশগুলি তিন থেকে দশদিনের জরুরী খাদ্য মজুদের নির্দেশ দিয়েছে । যদিও এমন নির্দেশনা তারা প্রায় দেয় কিন্তু এবারেরটা একটু ভয় ধরাচ্ছে । পরিকল্পিত কোন কিছু ঘটানোর পায়তারা করছে একটা মহল ?
এমনকি যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু স্থানে উইন্ড আপ রেডিও সোলড আউট হয়ে গেছে । আমেরিকান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ৩-৭ দিনের জরুরী খাদ্য রিজার্ভ করতে বলেছে । এশিয়াতে জাপান, ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সতর্কতা দেয়া হয়েছে এবং কীট ব্যাগ সংরক্ষণের আদেশ দেয়া হয়েছে ।
প্রায় প্রতিটা মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সকল দেশ এই নির্দেশ দিয়েছে । যার মোট সংখ্যা ৩৩ ।
তারা বলছে যে যুদ্ধ, সাইবার হামলা, দুর্যোগের জন্য এমন প্রস্তুতি যেন নাগরিকেরা দ্রুত নেয় ।
১৯৬০ সালে 'সায়েন্স' (Science) জার্নালে বিজ্ঞানী হাইঞ্জ ফন ফোয়েস্টার (Heinz von Foerster), প্যাট্রিসিয়া মোরা ও লরেন্স অ্যামিওট জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক মডেল প্রকাশ করেছিলেন।
তাদের মডেলে দাবি করা হয়েছিল যে, জনসংখ্যা একই হারে বাড়তে থাকলে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর নাগাদ তা অসীম সংখ্যায় পৌঁছে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সেদিন পৃথিবী ধ্বংস বা কোনো 'মহাপ্রলয়' হবে বলে জানাননি, বরং তারা মূলত অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ ১৯৬০-এর দশকের পর বিশ্বজুড়ে জন্মহার অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান চিত্র ওই মডেলের সাথে মেলে না।
কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকইচার্ন এই অদ্ভুত তত্ত্বটিকে ভুল প্রমাণ করে জানিয়েছেন, ১৯৬০ সালের ধারণা অনুসারে নির্ধারিত দিনে পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে না। ফলে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীব্যাপী মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
ম্যাকইচার্নের তথ্যমতে, ১৯৬০ সালের তুলনায় বর্তমান বিশ্বের জন্মহার নাটকীয়ভাবে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১৯৯৩ সালের পর থেকেই মূলত ওই ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে বাস্তব জনসংখ্যার হিসাব মেলানো সম্ভব হয়নি। কারণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।
গবেষণার মূল লেখক হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার তাঁর জীবনের একটি পর্যায়ে মঞ্চে জাদুকর হিসেবে কাজ করেছিলেন। আর তাই জাদুকরি কৌশলের মতো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিখাদ বিজ্ঞান এবং মঞ্চের বিভ্রম বা ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা একসঙ্গে মিশিয়ে এই অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই গোলযোগের ভেতর বাইন্যান্সে সাইবার হামলা হয়ে ৬.৩ বিলিয়ন হ্যাকড হল । বিশ্বজুড়ে যেসব সতর্কতা দেয়া হচ্ছে, এটা তার অন্যতম অংশ ।
মানব সভ্যতার অতীত ডাটা দেখলে অনুমান করা যায় বিশ্বজুড়ে এরকম প্রস্তুতি নেয়া হয় মূলত হঠাৎ করে সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়ার কোন সম্ভাব্য কারণ যদি তৈরি হয় ।
এই মুহূর্তে পৃথিবীতে কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, তার ভেতর রাশিয়ার ইউরোপে হামলার সম্ভাব্যতা এবং আমেরিকার ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য বড় ধরণের কোন আঘাতের চেষ্টা ।
আরেকটা জটিল সমস্যা রয়েছে কিন্তু আমি লিখলেই তো একদল কমেন্ট করতে শুরু করে দেয়, “আমি ভয় দেখাই” । আমি বলবো যে, আপনি যদি ভয় পান তাহলে ব্লক করে দিন অথবা এড়িয়ে চলুন কিন্তু কমেন্টে এসে বোগাস কথাবার্তা বলবেন না । পুরো দুনিয়া এই মুহূর্তে অযাচিত কোন মুহূর্তের ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছে । ওইসব দেশের সরকার তাদের জনগণকে কেন অযথা ৩-৭ দিনের জরুরী অবস্থার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ করবে ?
জটিল সমস্যা হলো, সাইবার হামলা । আপনি নিশ্চয় গত দুইবছরে খেয়াল করেছেন প্রতিটা শক্তিশালী দেশ সোনার মজুদ কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছে । তারা অন্ধের মত সোনা কিনছে । কেন কিনছে ? অবশ্যই ভুরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় কারণ । ডলার দুর্বল হচ্ছে কিন্তু দৃশ্য থেকে একেবারে সরে যেতে অনেক সময় লাগবে ।
ধরুন, আমেরিকায় সাইবার হামলা হলো । কয়েকদিন পর তারা বললো যে, আমাদের সকল ব্যাংকিং ডাটা মুছে গেছে । যদিও বিষয়গুলি খুব জটিল বিষয় কিন্তু আমেরিকা যদি এই কথা বলে তাহলে কি ঘটবে জানেন তো ?
আমি বলে দিচ্ছি, কিছু কিছু দেশে ব্যাংকিং লেনদেনে সমস্যা হতে পারে, দুর্নীতিগ্রস্থ ও উগান্ডার ব্যাংকগুলি এই সুযোগে কাস্টমারের টাকা মেরে দিতে পারে । সরাসরি বলে দিবে, আমাদের সব ডাটা আমেরিকার কাছে ছিল, ভুজুং- ভাজুং গল্প দিবে ।
ফলে উগান্ডার জনগণ ব্যাংকে গিয়ে কোন টাকা তুলতে পারবেন না । তারা বলবে ডকুমেন্টস নাই, টাকাও নাই অথবা হুদাই সময় নিয়ে ক্যাচাল বাড়াবে । তারা উগান্ডার জনগণের অর্থ দিয়ে সোনার মজুদ বাড়াবে, নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াবে এবং বলবে টাকা নাই । জনগণ কি করবে তখন ? সবাই মিলে কয়েকটা ব্যাংকে আগুন দিবে ?
সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে ? তাতে কি টাকা ফিরে পাবে ?
আপনি ব্যাংকগুলি নিয়ে কয়েকদিন রিসার্চ করুন । আপডেট খবরগুলি পড়ুন, সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে যেসব তথ্য বেরিয়েছে সেগুলি জানুন । তাহলে ভবিষ্যৎ করনীয় সম্পর্কে বুঝতে পারবেন । আমি কোন ব্যক্তিগত সমস্যা তৈরি করতে চাচ্ছি না তাই ব্যাংকিং নিয়ে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি ।
আরেকটা সমস্যা হল পরমাণুর যুদ্ধের সম্ভাব্যতা । তবে আমি মনে করি না, আমেরিকা ইরানে গিয়ে পরমাণু হামলা করবে । তার মিত্ররা কোনভাবেই এটা করতে দিবে না । তাদের পরিবেশ, মানুষ, ফুড চেইন সাপ্লাই, দেশের শান্তি এক সেকেন্ডে শেষ হয়ে যাবে এবং তারা ক্ষমতাহীন হয়ে যাবে । দেশগুলি অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে । আমেরিকা যতই হুমকি দিক যে, ইরানে এই করবে, সেই করবে, এগুলি ফাঁকা আওয়াজ ।
কিন্তু আমার ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে । কারণ হল, ২৮ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তুর্কি প্রেসিডেন্টের সাথে টেলিফোনে আলাপ করেছে । পরেরদিনই আবারো অনেকক্ষণ আলাপ করেছে । ফরমাল খবর হিসাবে দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর কথা মিডিয়ায় জানানো হয়েছে কিন্তু পর্দার পেছনে অন্য কিছু হতে পারে । আমার ধারণা সঠিক বা ভুল যেকোনো কিছু হতে পারে ।
সতর্ক থাকলে তো লস নাই, তাইনা ? গত কয়েকদিন আগে অনলাইন ওয়ালেটগুলিতে সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশংকা থেকে বাইন্যান্স থেকে সব ফান্ড সরিয়ে ফেলি । একদিন পরই বাইন্যান্সেই হামলা হলো । এতে আমি নিরাপদ রয়েছি । সবার টাকা যদিও সেখানে নিরাপদ রয়েছে কিন্তু জরুরী দরকারে বাইন্যান্স থেকে কি টাকা তুলতে পারছেন ? পারছেন না । এটাই হল সতর্ক থাকার সুবিধা ।
হয়ত বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে সাইবার হামলা হতে পারে । এতে মানুষের ফাইন্যান্সিয়াল লেনদেন বন্ধ হতে পারে । তাই জরুরী খাদ্য জমা রাখতে ৭-১০ দিনের সতর্কতা দেয়া হচ্ছে । যেন জনগণ না খেয়ে রাস্তায় এসে সরকারের বারোটা বাজিয়ে না ফেলে । এগুলি কেবলই সম্ভাব্যতা ।
আবার দেখা যেতে পারে, পুরো নভেম্বর-ডিসেম্বর জুড়ে কিছুই ঘটলো না । কিন্তু শীতের শেষে বা শীতের মাঝামাঝি সময় জ্বালানীর সংকটে ইউরোপ যখন কুঁকড়ে যাবে তখন রাশিয়া সেখানে হামলা করতে পারে । ফলে ইউরোপের অবস্থা নাজেহাল হয়ে যাবে ।
আসল কথা হল, সতর্কতা । ধরুন ব্যাংকে ১ লাখ টাকা আছে ।
আপনি ব্যাংকিং খাতে সাইবার হামলার আশংকায় পুরো টাকা হাতে রেখে দিলেন আপাতত । যদি দেখেন কোন সমস্যাই হয়নি, তাহলে কিছুদিন পর আবারো ব্যাংকে টাকা রেখে দিন । কিছু শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করতে পারেন, যদি সিরিয়াস কিছু ঘটে তাহলে আপনার খাবারের ব্যবস্থাটা থাকবে ।
কিন্তু, কোন প্রস্তুতি ছাড়াই আপনি যদি বলেন, “কিছুই হবে না, আল্লাহ ভরসা” তাহলে আপনাকে কিছু বলার নাই । ইসলাম ধর্মে সুন্দর একটা গল্প রয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, আগে নিজের উট বেঁধে নাও, তারপর উট যে পালাবে না, সেজন্য আল্লাহর উপর ভরসা রাখো” ।
হয়ত দুনিয়াজুড়ে এতো প্রস্তুতি আল্লাহর সেই মেসেজটার মত, যখন এক লোক বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছিল এবং বলছিল, আল্লাহর উপর ভরসা আছে, তিনিই বাচাবেন । তারপর মৃত্যু হলে, আল্লাহ তাকে বলে যে, তোমাকে বাঁচাতে, নৌকা, হেলিকপ্টার কে পাঠিয়েছিল? চারপাশের এত সতর্কতা সেই নৌকা, হেলিকপ্টারের মত বিষয় ।
যাইহোক, এতক্ষণ যা বললাম এগুলি আমার অনুমান । বাস্তব কোন বিষয় না । এগুলি ঘটবে তার কোন গ্যারান্টি নাই । চোখ-কান খোলা রাখা উচিত ।
তথ্যসূত্র : কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স