ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

কোচ হওয়ার লড়াইয়ে থমাস টুখেল

খুরশিদা জাহান মিলা
প্রকাশিত: ১৬:৩২, ১৭ এপ্রিল ২০২২
কোচ হওয়ার লড়াইয়ে থমাস টুখেল
থমাস টুখেল

খেলুড়ে জীবনের খুব তাড়াতাড়ি ইতি টানা থমাস টুখেলের অল্প বয়সে কোচ হিসেবে সফলতা অর্জনের গল্পটা একটু অন্যরকম- তবে সহজ ছিল না। ২০২১ সালে চেলসির শোচনীয় অবস্থায় কোচ হিসাবে দায়িত্ব পান থমাস টুখেল। ইউসিএল জিতিয়ে ৪৭ বছর বয়সী এই জার্মান কোচ অল্প কয় মাসের মধ্যেই চেলসির চেহারা বদলে দেন। আধুনিক জার্মান ফুটবলের পিতা-রালফ রাংনিকের প্রভাবে থমাস টুখেল ফুটবল কোচিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন।

১৯৮৭ সালে জার্মান স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে নিজের স্কুল টিমকে জেতাতে খেলেছিলেন টুখেল। বাভারিয়ার ক্রুমবাখে বেড়ে উঠা থমাস টিএসভি ক্রুমবাখের হয়ে কিছুদিন খেলেন এবং পরবর্তীতে যোগদান করেন অগসবুর্গে। 

১৯৭৯-৮০ মৌসুমে জার্মান ফুটবল ক্লাব টিএসভি ক্রুমবাখের যুব পর্যায়ের হয়ে খেলার মাধ্যমে টুখেল ফুটবল জগতে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে আউগসবুর্গের যুব পর্যায়ের হয়ে খেলার মাধ্যমে ফুটবল খেলায় বিকশিত হয়েছেন। ১৯৯২–৯৩ মৌসুমে, স্টুটগার্টার কিকার্সের হয়ে খেলার মাধ্যমে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেন। স্টুটগার্টার কিকার্সের হয়ে ২ মৌসুমে ৮ ম্যাচে অংশগ্রহণ করার পর, তিনি উলম ১৮৪৬-এ যোগদান করেন, যেখানে তিনি ৪ মৌসুমে সকল প্রতিযোগিতায় ৭১ ম্যাচে ৩টি গোল করার পর অবসর গ্রহণ করেন।

Advertisement

মূলত হাঁটুর ইনজুরিতে খেলা থেকে সরে আসেন থমাস। ফুটবলার জীবন থেকে সরে আসার পর তিনি জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়াশোনা করার সময় একটি বারেও কাজ করতেন। কিন্তু ফুটবলের নেশা ছাড়তে না পেরে নয় মাস পরেই তিনি রালফ রাংনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অনুরোধ জানান, অন্তত রিজার্ভ টিমের হয়েও যেন তাকে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। রাংনিক তার অনুরোধ না ফেললেও থমাসের আর খেলা হয়নি, হাঁটুর ইনজুরি গুরুতর অবস্থা ধারণ করলে ২৫ বছর বয়সে অবসর নিতে বাধ্য হন এই ডিফেন্ডার।

বেশ অল্প বয়সেই পেশাদার ফুটবল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন থমাস টুখেল২০০০ সালে রাংনিকের সুপারিশেই তিনি স্টুটগার্ট কিকার্সের অনূর্ধ্ব-১৪ দলের কোচ হন এবং ২০০৪ সালে তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচও হন। সেই বছর তার দল অনূর্ধ্ব-১৯ বুন্দেসলিগার শিরোপা জেতে। যার ফলে খুব দ্রুতই তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

থমাস টুখেলের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড বেশ শক্ত ছিল। ৩২ বছর বয়স কোচ হিসাবে সুনাম অর্জনের পর তিনি জার্মানির কোলন শহরে উয়েফা প্রো লাইসেন্সের জন্য পৌঁছান। সেখানে এরিখ রোটেমুলারের অধীনে কোচিং প্র‍্যাকটিস করতে থাকেন। উয়েফার কোর্স লিডার এরিখ রোটেমুলার ১৯৯৪-২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিলেন। 

ট্যাকটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং ম্যাচের আগে একেবারে খাদবিহীন প্রস্ততি - এই দুই গুণের জন্য থমাসের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। উয়েফা-প্রো লাইসেন্স পাওয়ার পর চাকরির পথ আরো সুগম হয়ে যায়। ২০০৭-০৮ মৌসুমে তিনি অগসবুর্গের রিজার্ভ দলের কোচ হন। ২০০৯ সালের গ্রীষ্মে জার্মানি ফুটবল ফেডারেশন তাদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচ হিসেবে এবং হফেনহাইম তাদের হেড কোচ হিসেবে থমাসকে নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক ছিল। কিন্তু ঠিক এক বছর পরে মেইঞ্জ তাকে কোচ হওয়ার প্রস্তাব দিলে বুন্দেসলিগার আবেদন তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। আর এভাবেই অল্পসময়ের মধ্যেই সিনিয়র দলের কোচ হয়ে ওঠেন থমাস টুখেল।

আগস্ট ২০০৯-১০ লিগ শুরুর একদিন আগে মেইঞ্জের কোচ হন থমাস টুখেল। তার অধীনে মেইঞ্জ ১৮২ ম্যাচ খেলে ৭২ টি ম্যাচে জয় পায়, ৪৬টি ম্যাচ ড্র করে ও ৬৪টি ম্যাচ হারে। 

ডিএফবি পোকাল কাপের ম্যাচে ফোর্থ টায়ার ক্লাব লুবেকের কাছে ২-১ গোলে হারের পর তার খেলার ধরন নিয়ে বোর্ড অভিযোগ জানালে কোচ ও বোর্ডের মধ্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে নরওয়েজিয়ান কোচকে লিগ শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনেই ছাটাই করে দেয় মেইঞ্জ।

মেইঞ্জের কোচ হয়ে প্রথম বুন্দেসলিগার কোনো ক্লাবের কোচিং করানো শুরু করেন টুখেল বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তে খুবই হতাশ হয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। তারপরও যেকোনো প্রকারে হোক লিগে টিকে থাকা চাই, রেলিগেটেড হওয়া যাবে না - এই ছিল মেইঞ্জের মূল লক্ষ্য সেই মৌসুমে। সে কারণেই মেইঞ্জ থমাস টুখেলকে গুরুভার দেয়, যার এর আগে কোনো সিনিয়র টিমকে কোচিং করানোর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। অগসবুর্গের জুনিয়র টিমকে কোচিং করানোর কারণে ড্রেসিংরুমে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা এড়ানোর উপায় ছিল না, কিন্তু তাও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিয়ে আসে থমাসের ধীরস্থির চালচলন ও কথাবার্তা। 

লিগে প্রথম তিন ম্যাচ অপরাজিত থাকে মেইঞ্জ, দুই ড্র ও এক জয় নিয়ে। সেই জয় আসে আবার বুন্দেসলিগার জায়ান্ট লুই ভ্যান হালের বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে। মেইঞ্জ নিজেদের ঘরের মাঠে ২-১ গোলে বায়ার্নকে হারায়। থমাসের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে পরদিন-ই জার্মান ম্যাগাজিনে বায়ার্ন-মেইঞ্জ ম্যাচের ট্যাকটিকাল রিভিউ প্রকাশ করেন কিকার।

পরবর্তীতে মেইঞ্জের খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে নতুন কোচের অধীনে তারা চাইলেই যেকোনো দলকে হারাতে সক্ষম। আর এই মানসিকতার জোরেই ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেরা দশে- লিগ টেবিলে নয় নম্বর অবস্থান নিয়ে মৌসুম শেষ করে মেইঞ্জ। শুধু বায়ার্নই নয়, ইয়ুর্গেন ক্লপের বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, হ্যামবুর্গ এবং গ্লাডবাখকেও হারায় দলটি। শুধুমাত্র লিগে টিকে থাকার যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মেইঞ্জ থমাসের প্ল্যান এক্সিকিউট করেছিল যা দলকে সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো অবস্থানে নিয়ে যায়। 

ইয়ুর্গেন ক্লপও (জর্ন এন্ডারসন এর পূর্বে দায়িত্বে থাকা কোচ) ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলে ১১-এর বেশি আর উঠাতে পারেনি, যদিও  ২০০৩-০৪ মৌসুমে মেইঞ্জ তাদের ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বুন্দেসলিগায় প্রোমোশন পায় ক্লপের অধীনেই। সেখানে থমাস টুখেল নিজের প্রথম মৌসুমেই দলকে সেরা দশে তোলেন। যা তার জন্য ছিল সফলতার একধাপ এবং এরপর তিন মৌসুম টুখেল মেইঞ্জের দায়িত্বে ছিলেন। 

বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে অম্ল-মধুর সময় পার করেন টুখেল২০১০-১১ মৌসুমে বায়ার্নকে একটি ম্যাচে মেইঞ্জ ২-১ গোলে হারায় এবং এবারে মেইঞ্জ আগের থেকেও ভালো খেলে, পঞ্চম স্থানে থেকে লিগ শেষ করে এবং ইউরোপা লিগের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে পৌঁছায়। 

একেবারেই সীমিত পরিসরের বাজেটের কারণে ভালো খেলোয়াড় কিনতে ব্যর্থ হওয়াসহ ইউরোপা লিগের কোয়ালিফাইং রাউন্ড, ডিএফবি পোকাল কাপ, বুন্দেসলিগার ম্যাচ-সব মিলিয়ে চাপ এত বেড়ে যায় যে মেইঞ্জ তালগোল পাকিয়ে ফেলে যে ম্যাচ হারতে শুরু করে নিয়মিত। 
সেক্ষেত্রে মেইঞ্জের বোর্ড বা ম্যানেজমেন্টের জন্য সমর্থন নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০১২-১৩ মৌসুমেও ১৩-এর গেরোতে আটকে পড়ে মেইঞ্জ।

দলের সেরা খেলোয়াড়দের বিক্রি করে দেওয়া, ভালো রিপ্লেসমেন্ট কেনার জন্য ফান্ড না দেওয়া, ম্যাচ হারলে উলটে তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো -সব মিলিয়ে কোচ হিসাবে লড়াই করে যাওয়া থমাস টুখেলের জন্য বেশ কঠিন ছিল। নানা প্রতিকূলতায় পরবর্তীতে থমাস সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৩-১৪ মৌসুমের শেষ ম্যাচে হ্যামবুর্গকে ৩-২ গোলে হারায় মেইঞ্জ, যার পুরো কৃতিত্ব  থমাসের। থমাস টুখেল; জয় দিয়েই শুরু তার মেইঞ্জের ক্যারিয়ার, এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে জয় দিয়েই শেষ করে ক্লাব ছাড়েন।  

সকলকে চমকে দিয়ে ক্লাব থেকে চাকরি ছেড়ে দেওয়াটা থমাস টুখেলের জন্য ট্রেডমার্ক বলা যায়। কারণ এর পরপরই বরুশিয়া ডেকে নেয় থমাসকে। ডর্টমুন্ডকে ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলানো ইয়ুর্গেন ক্লপ যখন লিভারপুলকে বেছে নেন ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, ডর্টমুন্ড সমর্থকরা অনেকটাই মুষড়ে পড়েছিলেন। ইয়ুর্গেন ক্লপকে রিপ্লেস করে খেলা তো মুখের কথা না,তবে সেখানেই যখন থমাস টুখেলের নাম যখন আলোচনায় আসতে থাকে, তখন স্বস্তি ফিরে আসে ব্ল্যাক-ইয়েলোদের সমর্থকদের ভেতর। স্বল্প বাজেটে এবং তরুণ ভালো খেলোয়াড়দের মধ্যে বাছাইকরণে তার দক্ষতা এবং ট্যাক্টিক্সে বিশেষ পারদর্শিতার জন্য ইতিমধ্যেই তিনি তখন 'ট্যাকটিক্যাল জিনিয়াস' নামে পরিচিতি পেয়ে গেছেন।

কোচ হিসেবে নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বেশ গুরুত্ব দেন টুখেলডর্টমুন্ডের টানা পাঁচ ম্যাচের জয়ী সূচনা তার-ই কথা বলে। যদিও পরে বায়ার্নের কাছে ৫-১ গোলে হার মানে ডর্টমুন্ড। চ্যাম্পিয়ন বায়ার্নের থেকে ১০ পয়েন্ট কম নিয়ে দ্বিতীয় হয়ে থমাস টুখেলের প্রথম মৌসুম শেষ হয়। যা অভিষেক মৌসুম হিসেবে অল্পবয়সী কোচ থমাসের জন্য সন্তোষজনক পারফরম্যান্স ছিল। 

ডর্টমুন্ড ছাড়ার পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছিল বোর্ড এবং থমাসের মধ্যে চলা মনোমালিন্য। যার কারণ ছিল থমাস টুখেল অলিভার তোরেসকে দলে রাখতে চেয়েছিলেন না। মিসলিনট্যাটের ওপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হন থমাস টুখেল। ট্রেইনিং গ্রাউন্ডেও তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর কিছুদিন পরই মিসলিনট্যাট আর্সেনালের স্কাউটিং দলে যোগ দেন।

ফুটবল বিশ্বে যে কারণে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড প্রায় সকলের কাছে পরিচিত, তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের তুলে আনা ও তাদের পরিচর্যা করা- তার অনেকটাই সফল হয়েছিল মিসলিনট্যাট ও তার স্কাউটিং টিমের দক্ষতার কারণেই। এভাবে মিসলিনট্যাটকে হারানো নিঃসন্দেহে ডর্টমুন্ডের জন্য বড় ক্ষতি ছিল। 

২০১৬-১৭ মৌসুমের গ্রীষ্মে বেশ বড় বাজেট রাখে ডর্টমুন্ড। ম্যাট হামেলস, ইকায়ে গুন্দোয়ান, হেনরিখ মিখিতারিয়ানের জায়গা পূরণ করতে আনা হয় উসমান ডেম্বেলে, মার্ক বার্ত্রা, আন্দ্রে শুর্লে, মারিও গোৎজে, রাফায়েল গেরেইরা, সেবাস্তিন রোডকে। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ ও পিয়েরে এনরিকে অবামেয়াং এবং নতুন সাইনিং - সবাই মিলে ডর্টমুন্ডের খেলার চেহারাই বদলে দিয়েছিল। বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ২০১৬-১৭ সালের ডিএফবি পোকাল সেমিফাইনালে এর প্রমাণ প্রত্যক্ষ, যেখানে ৩-২ গোলে ডর্টমুন্ডের কাছে হারে বায়ার্ন।

ডর্টমুন্ডের কর্তাদের বিপক্ষে কথা বলে ক্লাবের সঙ্গে টুখেলের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।১১ এপ্রিল ২০১৭, ডর্টমুন্ডের টিম বাস স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে তিনটি পাইপ বোমা ব্লাস্ট হয়। বোম ব্লাস্টের ফলে বাস প্রায় দুমড়েমুচড়ে যায়। জানালার শক্ত কাচের গ্লাসও ভেঙে পড়ে সেই ব্লাস্টে। ভাঙা কাচের আঘাতে ডর্টমুন্ডের স্প্যানিশ ফুটবলার মার্ক বার্ত্রা গুরুতর আহত হন।

বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সিইও হান্স জোয়াকিম ওয়াটজকে বোমা হামলার পর ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এরপর তিনি প্রেস কনফারেন্সে জানান, সেদিন ম্যাচ বাতিল করা হলেও পরেরদিনই মোনাকোর বিপক্ষে ম্যাচের ফিক্সচার ঠিক করা হয়েছে। এদিকে খেলোয়াড়রা তখনও ভয় কাটিয়ে উঠয়ে পারেননি। এইরকম মানসিক চাপের মধ্যে খেলতে নামাটা তাদের জন্য খুবই হতাশার ছিল। ফল যা হওয়ার তাই হয়, সেই ম্যাচটি ডর্টমুন্ড ৩-২ গোলে হারে। ফিরতি লেগের ম্যাচটিও ৩-১ গোলে হারে ডর্টমুন্ড। ফলে ইউসিএল থেকে বাদ পড়ে ক্লাবটি। 

এর কিছুদিন পর টুখেল প্রকাশ্যে বলেন, তিনি বা খেলোয়াড়রা নাকি বোম ব্লাস্টের পরের দিনেই ম্যাচ খেলতে চাননি। কিন্তু উয়েফা নাকি পরের দিনই খেলার জন্য জবরদস্তি করেছিল। আর ওয়াটজকে খেলোয়াড়দের শুধু সেই সিদ্ধান্ত জানাতেই ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন। খেলোয়াড়রা আদৌ পরেরদিন মাঠে নামার মতো মানসিক অবস্থায় আছে কি না, তা তিনি জানতেও চাননি। ওয়াটজকে চাইলেই উয়েফাকে অনুরোধ করে ম্যাচটিকে পেছাতে পারতেন। সেখানে তিনি নিজের ক্লাবের খেলোয়াড়দের প্রতি অবিবেচকের মতো ব্যবহার করেন। 

এর কিছুদিন পর ডিএফবি পোকাল কাপের ফাইনাল ম্যাচে ফ্রাংকফুর্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে ডর্টমুন্ড। সেটিই থমাস টুখেলের শেষ ম্যাচ ছিল এবং ডর্টমুন্ডে এই একটিই ট্রফি তিনি জিতেছেন।

পিএসজির কোচ হিসেবে খারাপ করেননি টুখেলমৌসুম শেষেই ডর্টমুন্ড ছাড়েন থমাস। কিন্তু পরবর্তীতে জোয়াকিম ওয়াটজকে স্বীকার করেছিলেন, দু’পক্ষের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। তিনি এ-ও বলেন, থমাস টুখেল খুবই ভালো কোচ, কিন্তু খুবই জটিল মননের লোক। 

যেমনটা মেইঞ্জের হয়ে লম্বা সময় ক্লাবে থাকতে পেরেছিলেন ঠিক ততটা না হলেও তার অধীনে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ১০৭টি ম্যাচ খেলে ৬৭টি ম্যাচে জয় পায়, ২৩টি ম্যাচ ড্র করে ও মাত্র ১৭টি ম্যাচ হারে।

এরপর প্রায় বছর খানেক বেকার জীবন পার করে ২০১৮ সালের মে মাসে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনের (পিএসজি) কোচ হিসাবে যোগদান করেন থমাস টুখেল।

মেইঞ্জের কোচ থাকাকালীন থমাস খেলোয়াড়দের আচরণ বিধি নিয়ে যথেষ্ট হুশিয়ার ছিলেন- যা তার কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রমাণ। দলের সকল খেলোয়াড়দের ক্যান্টিন টেবিলে একসঙ্গে বসে খেতে হতো। এমতাবস্থায় কারো আগে খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও অন্য খেলোয়াড়রা খাওয়া শেষ করা না পর্যন্ত সে টেবিল ছেড়ে উঠতে পারত না। কারণ এ ধরনের আচরণকে অভদ্রতা মনে করতেন থমাস।

থমাসের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ ছিল দলের নানারকম মানসিকতার এবং 'বিগ ইগো' প্লেয়ারদের একসুতোয় বেঁধে ভারসাম্য তৈরি করা যাতে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তাদের বেস্টটা বের করে আনতে পারেন তিনি। প্যারিসে প্রথম দিনের প্রেস কনফারেন্সেই নাসের আল খেলাইফি টুখেলের 'কঠোর নীতিবোধ' ও কোচিং করানোর দক্ষতা নিয়ে কথা বলেন, যিনি টাকার বস্তা ঢেলে নেইমার-এমবাপ্পেদের দলে ভিড়িয়েছিলের। ক্লাবের শক্তি এই খেলোয়াড়দের -বিশেষ করে এমবাপ্পে-নেইমারদের না ক্ষেপিয়ে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করাটা থমাস টুখেলের জন্য বেশ কঠিন-ই ছিল বলা চলে।

ভালো করেও পিএসজিতে বেশিদিন কাটাতে পারেননি টুখেলটানা ছয় বছর ধরে পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগে ভুগতে থাকা এবং কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যেতে না পারা টিম - যারা ছয়বারের পাঁচবারই লিগ ওয়ান জিতে ফিরলেও ইউসিএলে জয়ী হতে পারেনি একবারও। মূলত ইউসিএল জেতানোই ছিল থমাস টুখেলের কাছে পিএসজি'র আবদার। তবে দুইবার ফ্রেঞ্চ সুপার কাপ জেতাসহ থমাস টুখেল মোট ছয়টি শিরোপা জিতেছিলেন প্যারিসে। 

২০১৮-১৯ এ লিগ ওয়ান জেতে দ্বিতীয় স্থানের ক্লাবের সঙ্গে ১৬ পয়েন্ট ব্যবধান রাখে -যা খুব সফলতার মৌসুম হিসাবে ধরা যায় না। ২০১৯-২০ মৌসুমের ট্রান্সফার উইন্ডোতে ৯৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে পিএসজি, ইদ্রিসা গুইয়ে এবং আন্দ্রে হেরেরা ছিল অন্যতম সাইনিং -যা খুবই ফলপ্রসূ ছিল। গ্রুপ স্টেজে রিয়াল মাদ্রিদ থাকা সত্ত্বেও নেইমার-এমবাপ্পে-মাউরো ইকার্দি গোলস্কোরিংয়ে মনোযোগ, গ্রুপ পারফরম্যান্স গ্রুপকে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেয়। ২০২০-এর মার্চ মাসে যখন মহামারীর কারণে খেলাধুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন পিএসজিকে লিগ ওয়ানের চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে মৌসুমের সমাপ্তি টানে ফ্রান্স। 

আগস্টে খেলা মাঠে ফেরার পর সব ক্লাবের পুরো ধ্যানজ্ঞান তখন চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রস্তুতির ওপর থাকে। গ্রুপের শক্তি নেইমার-এমবাপ্পের পারফরম্যান্সে আটালান্টা ও লাইপজিগকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে পিএসজি। তবে হান্সি ফ্লিকের বায়ার্ন তখন দুরন্ত ফর্মে, সদ্যই বার্সেলোনাকে ৮-২ গোলে বিধ্বস্ত করেছে তারা। সেই ফর্ম ধরে রাখে বায়ার্ন ফাইনালেও, কিংসলে ক্যোমানের একমাত্র গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয় পিএসজি'র। আর নিজেদের ক্লাব ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রেবল জেতে বায়ার্ন। 

সেই ফাইনালের পর সবকিছু বদলে ইকার্দির লোন ডিল পার্মানেন্ট করা হয় ৫০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। এডিনসন কাভানি ও থিয়াগো সিলভা ক্লাব ছাড়েন। অক্টোবর মাসে থমাস টুখেল বলেন, অনেক প্লেয়ার হারিয়েছি আমরা। এই স্কোয়াড নিয়ে গতবারের পুনরাবৃত্তি ঘটানো সম্ভব না।

এই মন্তব্যে মারাত্মক খেপে যান স্পোর্টিং ডিরেক্টর লিওনার্দো আরাউহো এবং থমাসকে সতর্ক করে দেন, তিনি যেন 'পদমর্যাদায় বড়' ব্যক্তিদের সম্মান করে কথা বলেন। এতে করে পরিস্থিতি যেন আরো খারাপ হতে শুরু করে।

নরুন দায়িত্বে চেলসিকে রীতিমতো শক্তিশালী দলে পরিণত করেছেন টুখেলপ্রেসের সামনেই থমাস লিওনার্দো আরাউহো এবং বোর্ডকে নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করে বোর্ডের কাছে জবাবদিহিতার দাবি করতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় চাকরি ধরে রাখার শেষ আলোটুকুও নিভে যায়। তার ট্যাকটিক্স অনুযায়ী নেইমার এমবাপ্পেরা আর খেলতে চাচ্ছিলেন না এবং ইতোমধ্যেই থমাস ড্রেসিংরুমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখ থমাস টুখেলকে চাকরিচ্যুত করে পিএসজি। দলটি ২০২০-২১ মৌসুমের লিগে চারটি ম্যাচ হেরে শীতকালীন বিরতির আগেই লিগে তৃতীয় স্থানে চলে যায়।

পিএসজি টুখেলের অধীনে ১২৭টি ম্যাচ খেলে। যার মধ্যে ৯৫টি ম্যাচে জয় পায়, ১৩টি ম্যাচ ড্র হয়, ১৯টি ম্যাচে হারের মুখ দেখে। দু'টি লিগ ওয়ান শিরোপাও জেতে। দ্বিতীয় মৌসুমে ঘরোয়া ট্রেবলও জিতেছিলেন থমাস টুখেলের লিডে।

২০২১ সালের ২৬শে জানুয়ারি ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড বরখাস্ত হওয়ার পর, তিনি ১৮ মাসের চুক্তিতে প্রথম জার্মান কোচ হিসেবে চেলসির ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত হন। যেখানে প্রথম মৌসুমেই তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়লাভ করেছেন।

ম্যানেজার হিসেবে টুখেল ১০টি শিরোপা জয়লাভ করেছেন, যার মধ্যে ১টি বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে, ৬টি পিএসজির হয়ে এবং ৩টি চেলসির হয়ে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ট্যাগ: থমাস টুখেল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!