ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]

তাওহীদ হৃদয়: নতুন এক স্বপ্নবাজ, যেন এক ভরসার হাত

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৭:৪২, ১৫ মে ২০২৩
তাওহীদ হৃদয়: নতুন এক স্বপ্নবাজ, যেন এক ভরসার হাত
তাওহীদ হৃদয়। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে যেন চলছে তারুণ্যের জয়গান। যার মাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন এক বার্তা দিচ্ছে টিম টাইগার্স। চলতি বছরের শুরু থেকে নিজেদের ‘ব্র্যান্ড’ ক্রিকেট খেলছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ফিল্ডিং ক্রিকেটের তিন ইউনিটেই দুর্দান্ত করছেন টাইগাররা।

একটা সময় ছিল যখন নির্দিষ্ট এক ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো বাংলাদেশ দলকে। কিন্তু সেকেলে দিনের কথা ভুলে দুর্দান্ত গতিতে ছুটছে নতুন বাংলাদেশ। সেই যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছেন টাইগারদের তরুণ টপ অর্ডার ব্যাটার তাওহীদ হৃদয়।

জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পর থেকেই একের পর এক ঝলমলে ইনিংস খেলে তাওহীদ হৃদয় হয়ে উঠেছেন টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতীক। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে চার নম্বর পজিশনে ব্যাট করে দলকে উপহার দিচ্ছেন স্বস্তির ইনিংস। মাঝেমধ্যে ব্যর্থ হলেও ক্যারিয়ারের শুরুটা বেশ ভালোই করেছেন এ ডানহাতি ব্যাটার।

অবশ্য তাওহীদ হৃদয়ের ক্রিকেট যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন ভরসার নাম। এক সময় ক্রিকেট ছাড়তে চাওয়া তরুণ হৃদয়ই যেন আসন্ন এশিয়া কাপ ও ওয়ানডে বিশ্বকাপে টাইগারদের নতুন হাতিয়ার হতে চলেছেন।

২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তাওহীদ হৃদয়। এরপর সেখানেই বেড়ে ওঠা। সাত বছর বয়সে ক্রিকেটে তার হাতেখড়ি। এরপর বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৩ সালে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি।

শাইনপুকুরের জার্সিতে তাওহীধ হৃদয়। ছবি- সংগৃহীত

ঢাকায় আসার পর বনশ্রীর একটি স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি হন হৃদয়। সেখানে ভর্তি হয়ে মোটা অংকের টাকাও গচ্চা দিতে হয়েছে তাকে। মূলত এরপর ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজনের অনুপ্রেরণায় ফের ক্রিকেটে নিয়মিত হন এ ডানহাতি ব্যাটার। হৃদয় বলেন- 

‘ঐ একাডেমিতে গিয়েছিলাম অনেক কিছু ক্ষতি করেই। তারপর ক্রিকেট খেলার কোনো ইচ্ছেই ছিলো না। আমার ফ্যামিলি থেকে সাপোর্ট ছিলো না। বাবার তো কখনো সাপোর্টই ছিল না। আসলে আমার মা-বাবা কেউই সেভাবে খেলাটা বোঝে না। আমি যতটুকুই আবদার করতাম সেটাও আমার মায়ের কাছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মা যতটুকু সহযোগিতা করতেন সেভাবেই চালিয়ে নিতাম। একটা সময় ছিল যখন আমি খেলাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৬ খেলার সময় সুজন স্যারের সহযোগিতায় ফিরে আসি। এরপর ফার্স্ট ডিভিশন খেলা শুরু করি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসা।’

২০১৮ সালে বাইশ গজে ফিরেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিয়মিত হন হৃদয়। শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। অবশ্য অভিষেক ম্যাচে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি। ব্যাট হাতে ক্রিজে আসার জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় তার দল। এতে ৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন এ তরুণ ব্যাটার।

একই বছরে ঘরের মাঠে পর্দা ওঠে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের। ওই আসরে টাইগার স্কোয়াডে সুযোগ হয় তাওহীদ হৃদয়ের। যুবাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে গড়পড়তা পারফরম্যান্স করেন হৃদয়। অবশ্য টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাংলাদেশ বিদায় নেয়ায় সেখানেই স্বপ্নযাত্রা থমকে যায় তার।

এরপর আবারো শুরু হয় হৃদয়ের কঠোর অনুশীলনের মহড়া। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) সিলেট সিক্সার্সের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। অবশ্য সেই আসরে খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি তিনি।

২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে গড়ায় যুব বিশ্বকাপের আসর। এ টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে ব্যাট হাতে সেভাবে রান তুলতে পারেননি হৃদয়। প্রথম তিন ম্যাচের দুই ইনিংসে করেন ৫৯ রান।

এরপর টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ৫১ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন তিনি। আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দেন। অবশ্য টাইগারদের ইতিহাস গড়ার ম্যাচে শূন্য রানেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন এ ক্রিকেটার।

২০২৩ সালের বিপিএলে অপ্রতিরোধ্য ব্যাটিংয়ে হৃদয়ের স্বপ্নের যাত্রাটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এ আসরের ১৩ ম্যাচে পাঁচ ফিফটিতে ৪০৩ রান করে টিম ম্যানেজমেন্টের নজরে আসেন তিনি। মূলত এরপরই জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের অপেক্ষা ফুরোয় যুব বিশ্বকাপজয়ী এ ব্যাটারের।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) সিলেট সিক্সার্সের দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। ছবি- সংগৃহীত

গেল মার্চে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি-২০ সিরিজে অভিষেক হয় তাওহীদ হৃদয়ের। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে নিজের অভিষেক রাঙাতে পারেননি। ইংলিশদের বিপক্ষে তিন ম্যাচের দুই ইনিংসের একটিতে ২৪ ও অন্যটিতে ১৭ করেই সাজঘরে ফিরতে হয়েছে তাকে।

‘তার স্ট্রাইক রেট আমাকে জস বাটলারের কথা মনে করিয়ে দেয়, সে যেভাবে ব্যাট করে তাকে ডট বল দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। সঙ্গে তার দারুণ একটা স্কিল রয়েছে। যখন বাউন্ডারি দরকার পড়ে, তখনই সে বাউন্ডারি মারতে পারে।’ - জেমি সিডন্স

টি-২০তে নিজের জাত চেনাতে না পারলেও ওয়ানডেতে অভিষেক ম্যাচেই অপ্রতিরোধ্য ৯২ রানেই ইনিংস খেলেন হৃদয়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ সিলেটে আয়ার‌ল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম কোনো ব্যাটার হিসেবে অভিষেক ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েন তিনি। 

ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই দুর্দান্ত রেকর্ডের কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছে হৃদয়কে। ওই ম্যাচে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৮ রান দূরে থেকে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৪৯ রান করে এই ফরম্যাটে দুর্দান্ত শুরুর ইঙ্গিত দেন এ তরুণ টাইগার ব্যাটার।

চলতি মের শুরুতে দলের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিদেশ সফর করেন হৃদয়। সেখানে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে উইকেটে থিতু হয়েও ইনিংস লম্বা করতে ব্যর্থ হন। ইংলিশ কন্ডিশনে ৩১ বলে দুই বাউন্ডারিতে ২৭ রান করে ফেরেন তিনি। 

ঘরের মাঠে ইংলান্ডের বিপক্ষে টি-২০তে অভিষেক হয় তাওহীদ হৃদয়ের। ছবি- সংগৃহীত

অবশ্য দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই খোলস থেকে বেরিয়ে আসেন হৃদয়। ইংলিশ পাড়ার দমকা হাওয়াকে উপেক্ষা করে ৫৮ বলে ৬৮ রান করেন তিনি। এদিন তার ঝলমলে অর্ধ শতক ও শান্তর সেঞ্চুরিতে ভর করে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় তামিম ইকবালের দল। অবশ্য আইরিশদের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে মাত্র ১৩ রানেই ফিরতে হয়েছে তাকে।

জাতীয় দলের জার্সিতে সুযোগ পেয়েই যেভাবে শুরু করলেন তাওহীদ হৃদয় সেটি টাইগার ক্রিকেটের জন্য আশীর্বাদই বটে। কেননা আসন্ন এশিয়া কাপ ও ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে এমন ক্রিকেটারের বড়ই অভাব ছিল। হৃদয়ের ধারালো ব্যাটে টাইগারদের আগামী দিনগুলো হবে সুরক্ষিত, এমন আশা করতেই পারেন ক্রিকেটভক্তরা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল/এআইএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!