২০১৮ সালের ২৪ জুন কেপটাউনের নিউল্যান্ডে স্বাগতিকদের বিপক্ষে চার ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে লড়ছে অস্ট্রেলিয়া। এ ম্যাচের তৃতীয় দিনে অজি ক্রিকেটারদের বল টেম্পারিংয়ের কারণে শুরুত হয় বিতর্ক। এর সূচনা ক্যামেরুনের হাতে ধরে হলেও সেটি পরবর্তীতে ক্যাঙ্গারু বাহিনীর দলপতির গায়ে জড়িয়ে যায়।
শুরুতেই ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে আলোচনা করেছিলাম- ক্রিকেটীয় ভাষায়, বলকে শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘোষা হলে তাকে ‘স্যান্ডপেপার গেট’ বলা হয়। মূলত দক্ষিণ আফ্রিকাকে ইনিংস থেকে ছিটকে দেওয়ার জন্যই এই পন্থা অবলম্বন করেন ব্যানক্রফ্ট। এরপর বাইশ গজে দায়িত্ব পালনকারী দুই ইংলিশ আম্পায়ার নাইজেল লং এবং রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেন। এরপর সেখানে যোগ দেন অভিযুক্ত অজি ওপেনার। আর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে তাদের কথোপকথন শুনছিলেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ। কিন্তু কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি!
.png)
স্যান্ডপেপার গেটের জন্য তো বাড়তি চাপ ছিলই, উল্টো বাজে ফর্ম ও প্রোটিয়াদের কাছে লজ্জার পরাজয়ে রীতিমতো কোনঠাসা হয়ে পড়েন স্টিভ স্মিথ। ব্যাটিং বিপর্যয়ে স্বাগতিকদের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্ট হেরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় অজি দলপতিকে। আর মাঠের ঘটনায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ব্যানক্রফ্টের সঙ্গে নিষিদ্ধ হন স্মিথও। একই সঙ্গে অধিনায়কত্বের টুপিও হারাতে হয় তাকে। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কান্না জড়িত কন্ঠে দেশ ও ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে যান এ ডানহাতি ব্যাটার।
তবে পরের বছরই অ্যাশেজ দিয়ে আবারো জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন হয় স্মিথের। যে প্রত্যাবর্তনে বদলে গেছে তার জীবনের গল্প। যার মধ্য দিয়ে স্মিথ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়।’

পুরো নাম স্টিভেন পিটার ডেভেরিউক্স স্মিথ। তবে বাইশ গজের সুবাদে বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিতি পেয়েছেন স্টিভ স্মিথ হিসেবে। ১৯৮৯ সালের আজকের এই দিনে (২ জুন) অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এরপর সেখানেই বেড়ে ওঠা তার।
ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটকে ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে ফেলেন স্মিথ। যেই ভাবনা সেই কাজ। শৈশবেই স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাবে ব্যাট বলের সঙ্গে পরিচিত হন। অবশ্য শুরুতে লেগব্রেক গুগলিতেই বেশ মনোযোগ দেন এ ক্রিকেটার।
স্মিথের পেশাদার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ দিয়ে। ২০০৭ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। ওই ম্যাচে ৩ ওভার হাত ঘুরিয়ে ১৭ রান খরচ করেন তিনি। তবে ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ হয়নি।
পরের বছর সাদা পোশাকের টুর্নামেন্টে পুরা কাপে নিউ সাউথ ওয়েলসের স্কোয়াডে ডাক পান স্মিথ। সেবার বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে সুযোগ পেয়েই নিজের জাত চেনান তিনি। ওই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৮ ওভার বল করে বিনা উইকেটে ২৫ রান খরচ করেন। কিন্তু ব্যাটিংয়ে নেমে ৭৬ বলে দুই বাউন্ডারিতে ৩৩ রান করেন তিনি। দীর্ঘ দুই বছর ঘরোয়া লিগে পারফর্ম করে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলে ডাক পান এ অলরাউন্ডার।

জাতীয় দলের জার্সিতে স্মিথের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে। সেবার অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। মেলবোর্নে একমাত্র টি-২০তে সুযোগ পান স্মিথ। ক্রিকেটর সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে ব্যাট হাতে নিজের অভিষেক রাঙাতে পারেননি। ওই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমে ৮ বলে মাত্র ৮ রান করেন তিনি। যা টি-২০ ক্রিকেটে বেশ বেমানানই বটে। তবে বল হাতে ৪ ওভারে দ্য গ্রিন ম্যানদের দুই উইকেট শিকার করেন এ অজি ক্রিকেটার।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে রিকি পন্টিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আর তারই হাত ধরে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়ানডে ফরম্যাটে অভিষেক হয় স্মিথের। যেখানে প্রথম টি-২০ ম্যাচ খেলেছিলেন ঠিক সেই মাঠেই ওয়ানডে খেলতে নামেন তিনি।
ওয়ানডে ক্যারিয়ারের অভিষেক ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সুযোগই পাননি স্টিভ স্মিথ। বোলিংয়ে দুই উইকেট শিকার করেন। কিন্তু ৯.৫ ওভার বল করে ৭৮ রান দিয়ে অভিষেক বিবর্ণ করে তোলেন তিনি নিজেই।
একই বছরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাদা পোশাকের ক্রিকেটেও অভিষেক হয় স্মিথের। তবে এই ফরম্যাটে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হন তিনি। দুই ইনিংসের একটিতে ১, অন্যটিতে ১২ রান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ২১ ওভার বল করে পাকিস্তানিদের তিন উইকেট তুলে নেন তিনি।
এরপর ২০১১ সালের ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া স্কোয়াডে ডাক পান স্মিথ। তবে কোয়ার্টারে ভারতের বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয়া আসরে খুব বেশি মাঠে নামতে পারেননি তিনি। এজন্য খোলস ছেড়ে বেরও হতে পারেননি। অবশ্য যে কয়েকটি ম্যাচে একাদশে জায়গা হয়েছিল সেগুলোতেও আহামরী কিছু করতে পারেননি তিনি।

তবে সফলতা একদিনে যে আসেনা সেটি সত্যিই। ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক ফরম্যাটে সুযোগ পেয়েও নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হন স্মিথ। অবশ্য টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার কারণে ধীরে ধীরে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছেন এ ডানহাতি ব্যাটার।
ব্যাটার বলার কারণ হচ্ছে, ক্রিকেট ক্যারিয়ারে স্মিথের সূচনা লেগব্রেক স্পিনার হিসেবে। যদিও পরে ব্যাটিংও শিখে নেন। এতে অজিরা চঞ্চল ও স্টাইলিশ একজন অলরাউন্ডার খুঁজে পায়। যার কারণে মাঝে মধ্যে মলিন পারফরম্যান্স করলেও দলে নিয়মিত সুযোগ পেতে থাকেন তিনি।
২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ স্বপ্নের মতো শুরু করেন স্টিভ স্মিথ। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শুরুটা রাঙাতে না পারলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে ব্যাটহাতে জ্বলে ওঠেন। যার একটি হলো সেমি ফাইনালের মঞ্চে ভারতের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। মূলত স্মিথের শতকে ভর করেই ৩২৮ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় স্বাগতিকরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ২৩৩ রানে গুঁড়িয়ে যায় ভারত। এতে ৯৫ রানের বিশাল জয় নিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় অজিরা।
বিশ্বমঞ্চে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে স্মিথকে নিয়ে ক্রিকেট বোদ্ধাদের কন্ঠে ঝড়ে প্রশংসার বানী। সেমি ফাইনালে স্মিথের সেঞ্চুরির পর শ্রীলংকান কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকার বলেন-
Aus too strong overall. Steve smith keeps on going. It was always tough for India unless Virat stayed in. Will be a cracker of a final.
বিশ্বমঞ্চে ভারতের হারেও স্মিথকে প্রশংসার ভেলায় ভাসিয়ে দেন দেশটির কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার। তিনি বলেন, ‘দারুণ জয়। স্মিথের দুর্দান্ত শতক, ফিঞ্চের সহযোগীতা এবং জনসনের শক্তিশালী সমাপ্তিই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।’
এরপর ওই আসরের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ১৮৪ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অপরাজিত অর্ধ শতকে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন স্মিথ। ফলে ক্রিকেট ইতিহাসে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে অজি বাহিনী।
সেই থেকে উড়ন্ত যাত্রার শুরু স্মিথের। বিশ্বকাপের পরপরই অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক মনোনীত হন তিনি। অবশ্য তার মাথায় অধিনায়কত্বের টুপি বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা কেলেঙ্কারির পর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অধিনায়কত্বও হারান স্মিথ। তার স্থলাভিষিক্ত হন টিম পেইন। অবশ্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরেই নতুনভাবে শুরু করেন এ তারকা ব্যাটার।

নিষেধাজ্ঞার পরের বছরই অ্যাশেজ সিরিজ দিয়ে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন হয় স্মিথের। অজিদের ডেরায় ফিরেই আগুনের স্ফুলিঙ্গের ফুলকি হয়ে ওঠেন তিনি। অ্যাশেজের পাঁচ টেস্টে ১১০.৫৪ স্ট্রাইক রেটে ৭৭৪ রান করেন। যার মধ্যে একটি ডাবল সেঞ্চুরি, তিনটি শতক ও তিনটি হাফ-সেঞ্চুরি রয়েছে এ ব্যাটারের।
সবশেষ চলতি বছরের মার্চে ভারতের মাটিতে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলে অস্ট্রেলিয়া। এ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে প্যাট ক্যামিন্সের অনুপস্থিতে দায়িত্ব পান স্টিভ স্মিথ। অধিনায়কের দায়িত্ব কাঁধে তুলেই জয়ের দেখা পান তিনি। স্বাগতিকদের বিপক্ষে ওই টেস্টে ৯ উইকেটের দুর্দান্ত জয় পায় সফরকারী দল।
ক্রিকেট বহির্ভূত আচরণের কারণে নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন বিশ্বের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার। তাদের মধ্যে অনেকেই বাইশ গজে ফিরে এসেছেন। তবে ক’জনই পেরেছেন স্মিথের মতো রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটাতে। স্মিথ যে অজি ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র, খানিকটা দেরিতে হলেও সেটির প্রমাণ মিলেছে। স্মিথরা বারে বারে আসেন না, তারা জুলিয়াস সিজারের মতো আসেন, দেখেন এবং জয় করেন।