বেন স্টোকস: হতাশার তলানি থেকে সাফল্যের শিখরে
বেন স্টোকসের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল বেশ সাদামাটা। ঘরোয়া লিগে পারফর্ম করে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলে জায়গা নিশ্চিত করেন। কিন্তু তার স্বপ্নের নীল আকাশে হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার মেঘের ঘনঘটা!
২০১৬ সালের ৩রা এপ্রিল। কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেনের গ্যালারি কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দর্শকের ভূমিকায় ভারত। তবুও ফাইনালের মঞ্চে উপচে পড়া ভিড় ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের। আর এমনটা হবেই না বা কেন?
আন্তর্জাতিক টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছে উইন্ডিজ। এ ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসের শেষ ওভারে রোমাঞ্চকর এক ইতিহাস দেখেছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। তবে ওই দুঃস্মৃতি ভুলেই যেতে চাইবেন ইংলিশ অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। কেননা নাটকীয়তার ওই ওভারটি বাজে স্বপ্নের মতো কাটিয়েছেন তিনি।
.png)
টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আগে ব্যাট করে ১৫৫ রান সংগ্রহ করে ইংল্যান্ড। এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই হোঁচট খায় উইন্ডিজ। প্রথম তিন ওভারের মধ্যেই ক্রিস গেইল ও জনসন চার্লসকে হারায় ক্যারিবীয়রা। এরপর ইংলিশ বোলারদের বিপক্ষে একাই মোকাবিলা করেন মারলন স্যামুয়েলস।
তবে নিয়মিত বিরতিতে চার উইকেট হারিয়ে শিরোপার লড়াই থেকে রীতিমতো ছিটকে যায় উইন্ডিজ। পরে বাইশ গজে আসেন কার্লস ব্র্যাথওয়েট। ব্যাটিংয়ে নেমেই স্ট্রাইক রোটেট করতে থাকেন তিনি। অন্যদিকে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা স্যামুয়েলস বল ফেস করার সুযোগই পাচ্ছিলেন না।
উইন্ডিজ ইনিংসের ১৯তম ওভার শেষে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল ইংলিশ বাহিনী। শেষ ওভারে ক্যারিবীয়দের জয়ের জন্য প্রয়োজন ৬ বলে ১৯ রান। নিয়মিত বোলারদের ওভার শেষ হওয়ায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই স্টোকসের হাতে বল তুলে দেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান।
এরপর যা হলো, সেটি অবাক হওয়ার মতোই! ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ব্র্যাথওয়েট, অন্যপ্রান্তে বল হাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্টোকস। ওভারের প্রথম বলেই ডিপ ব্যাকওয়ার্ড লেগ স্কয়ার দিয়ে ছক্কা হাঁকান ব্র্যাথওয়েট।
পরের বলটি লং অনের ওপর দিয়ে, এরপর লং অফ দিয়ে এবং শেষের বলটি ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন তিনি। এতে টানা চার বলে চার ছক্কায় টি-২০ সংস্করণে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ঘরে তোলে ক্যারিবীয়রা।
ব্র্যাথওয়েটের ইতিহাস গড়া ম্যাচে হতাশার তলানিতে আবির্ভূত হন ইংলিশ অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। ইডেনের খোলা আকাশে দু’হাত উচিয়ে ব্র্যাথওয়েট যখন উদযাপন করছেন, তখন দুই হাঁটুতে ভর করে মাথা নিচু করে ক্রিকেট বিধাতার কাছে ক্ষমার আসনে বসে পড়েছেন ইংলিশ অলরাউন্ডার।
তবে ব্যর্থ হয়ে হেরে যাননি স্টোকস। সময় নিয়ে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন বহুবার। নিজেকে পরিপূর্ণ করে বাইশ গজে ফিরে এসেছেন রীতিমতো বীর দর্পনে।
বল হাতে ব্যর্থ স্টোকসই তিন বছরের ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন। ব্যর্থতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যাওয়া বেন স্টোকসের জীবনের গল্পই আজ শুনব আমরা...
পুরো নাম বেঞ্জামিন অ্যান্ড্রু স্টোকস। ১৯৯১ সালের ৪ জুন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা সাবেক রাগবি খেলোয়াড় ও কোচ জেরার্ড স্টোকস। মূলত বাবার কর্মসূত্রে মাত্র ১২ বছর বয়সেই ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি।
ইংল্যান্ডের ককেরমাউথ ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি হন স্টোকস। ক্রিকেটে হাতেখড়ির পর থেকেই ডান হাতে বোলিং এবং বাঁহাতে ব্যাটিং করেন। বাইশ গজের সঙ্গে বোঝাপড়া শেষে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে পারফর্ম করতে থাকেন তিনি।
তবে স্টোকসের পেশাদার ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটার হিসেবে ওভালের ডারহাম ক্লাবের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। আর অভিষেক ম্যাচেই বল হাতে মার্ক রামপ্রকাশের উইকেট শিকার করেন এ অলরাউন্ডার।
একই বছরে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে ইংল্যান্ড দলে ডাক পান স্টোকস। সেবার টাইগারদের বিপক্ষে একটি ফিফটি ও বেশ কয়েকটি উইকেট শিকার করেন তিনি। পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলে জায়গা পান। যেখানে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত শতক হাঁকিয়েছিলেন এ ব্যাটার।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্ম করে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে খেলা শুরু করেন বেন স্টোকস। এই ফরম্যাটেও ডারহামের জার্সিতে খেলেন তিনি। অভিষেক ম্যাচেই তুলে নেন অর্ধ শতক। পাশাপাশি একটি উইকেটও শিকার করেন কিউই বশোংদ্ভুত এ ক্রিকেটার।
বেন স্টোকসের স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। ২০১১ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলেন তিনি। সেবার ইংলিশদের প্রতিপক্ষ ছিল আয়ারল্যান্ড। তবে অভিষেক ম্যাচ রাঙাতে পারেননি। ব্যাটিংয়ে নেমে ১০ বলে তিন রান করেই আউট হয়ে যান এই অলরাউন্ডার।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডে সফর করে উইন্ডিজ। এ সফরের দুই ম্যাচ সিরিজে দ্বিতীয় প্রথম টি-২০তেই দলে জায়গা পান স্টোকস। তবে ব্যাট ও বলের সুযোগ হয়নি। অবশ্য দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমেই খোলস থেকে বেরিয়ে আসেন। ওই ম্যাচে ২৩ বলে ৩১ রান করেন তিনি।
তবে সাদামাটা পারফরম্যান্সের কারণে ২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলে জায়গা হয়নি স্টোকসের। যদিও ওই দুই আসরেই শোচনীয় হারে বিদায় নিতে হয়েছিল ইংলিশ বাহিনীকে। বৈশ্বিক আসরে ব্যর্থ হয়ে রীতিমতো নড়েচড়ে বসে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। এরপর জাতীয় দল ঢেলে সাজাতে শুরু করে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। যার ফলে ২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হন বেন।
টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিতে পুরো টুর্নামেন্টেই স্ট্রাগল করতে হয় স্টোকসকে। তবে ফাইনালের মঞ্চে ব্র্যাথওয়েট ঝড়ে মুহূর্তেই যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। স্টোকসের ৪ বলে ৪টি দানবীয় ছক্কায় চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ঘরে তোলে ক্যারিবীয়রা।
একদিকে বিশ্বকাপ ব্যর্থতা, অন্যদিকে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা। এই দুইয়ে যেন অন্ধকার চেপে ধরেছিল স্টোকসকে। ফলে ২০১৭ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ চলাকালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে মদ্যপ অবস্থায় মারামারিতে জড়ান তিনি।
পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ‘ক্লাব থেকে বেরিয়ে এক বেসামরিক নাগরিককে এক মিনিটে কমপক্ষে ১৫টি ঘুষি মেরেছেন স্টোকস। মূলত এরপরই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। যদিও এই বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এক সমকামী দম্পতিকে বাঁচাতে তিনি এমনটা করেছেন।”
এরপর ক্রিকেট থেকে বেশ কিছুদিন দূরে থাকেন স্টোকস। তবে বিতর্ক ও সমালোচনা উপেক্ষা করে নতুনভাবে হাজির হন তিনি। ২০১৬-২৭ সালের ঘটনাকে পেছনে ফেলে বাইশ গজে মনোযোগ দেন। এরপর ইংলিশদের জার্সিতে লিখতে থাকেন একের পর এক নতুন ইতিহাস।
২০১৯ সালের এপ্রিলে ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য ইংল্যান্ড দলে সুযোগ পান স্টোকস। মূলই এই আসরটিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কেননা ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ম্যান অব ম্যাচের পুরস্কার হাতে উঠান তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৯ বলে ৮৯ রান এবং বোলিংয়ে দুই উইকেট শিকার করেছিলেন।
কথায় আছে, যার শুরুটা ভালো তার শেষটাও সুখকর। বেন স্টোকসের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে বিশ্বকাপ জেতান তিনি।
মেগা ফাইনালে জন্মভূমি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৮ বলে ৮৪ রান করেন স্টোকস। তবে তিন ওভার বোলিং করে উইকেট শূন্য ছিলেন।
দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে মর্যাদাপূর্ণ অ্যাশেজেও বিশ্ব রেকর্ড করেন বেন স্টোকস। বিশ্বকাপ জয়ের পরপরই পাঁচ ম্যাচের অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া। এ ম্যাচে ১ উইকেটের রুদ্ধশ্বাস জয় পায় স্বাগতিকরা।
হেডিংলি টেস্টের প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৭ রানে অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরপর স্কোরকার্ডে ১৭৯ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ইনিংস হারের শঙ্কা কাটিয়ে স্টোকসের ১৩৫ রানের অপ্রতিরোধ্য ইনিংসে ভর করে ৩৫৯ রান সংগ্রহ করে ইংলিশরা। অবেশেষে ১ উইকেটে জয় পান ইয়ন মরগ্যানরা।
স্টোকসের ওই ইনিংসকে ‘সর্বকালের সেরা ইনিংস’ ও ‘কোন ইংরেজ ক্রিকেটারের খেলা সেরা’ ইনিংস বলে অভিহিত করা হয়।