বুলাওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবে টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলর। ফলে ব্যাটিংয়ে নামতে হয় বাংলাদেশকে। বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের লক্ষ্যে ইনিংস উদ্বোধনে নামেন তামিম ইকবাল ও মোহাম্মদ আশরাফুল।
তবে শুরুতেই হতাশ করেন দু’জন। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে তামিম (৬) এবং অষ্টম ওভারের প্রথম বলেই আশরাফুল (৮) সাজঘরে ফিরে যান। উইকেটে থিতু হয়েও ব্যক্তিগত ইনিংস বড় করতে পারেননি টাইগার ব্যাটাররা।
.png)
নিয়মিত বিরতিতে একে একে মুমিনুল (২৪), অধিনায়ক মুশফিক (২৬), সাকিব (৩৪), নাসির (৩৬) এবং মাহমুদউল্লাহ (৩১) প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন। এরপরই মাসাকাদজার বলে টেইলরের তালুবন্দী হয়ে বাইশ গজ ছাড়েন জিয়াউর রহমান (১২)।

দলের টপ ও মিডল অর্ডারদের হারিয়ে রীতিমতো হা-হুতাশ শুরু হয়ে গিয়েছে টাইগারদের ড্রেসিং রুমে। সিরিজ জয় তো দূরে থাকুক, দুইশো পেরোনোর আগেই সব উইকেট হারানোর শঙ্কায় মুশফিকের দল। অবশ্য ম্যাচের টুইস্ট তখনো বাকি।
বাংলাদেশ দলের মাথায় যখন আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা, তখন ত্রাতা হয়ে এলেন স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক। জিম্বাবুয়ের আগুন ঝরানো পেসকে চোখ রাঙিয়ে রান তুলতে শুরু করলেন তিনি। যেখানে ঝড়ো গতিতে ক্যারিয়ারের প্রথম ও একমাত্র অর্ধশতক তুলে নেন এই স্পিনার।
জিম্বাবুয়ের বোলারদের তুলোধুনো করে মাত্র ২২ বলে ৫৩ রানে অপরাজিত ছিলেন রাজ্জাক। ফিফটির ইনিংসটি ৫ ছয় ও চার বাউন্ডারিতে সাজিয়েছিলেন এ ক্রিকেটার। এতে ২৫২ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। অবশ্য ম্যাচটি ১৩ বল হাতে রেখেই ৬ উইকেটের সহজ জয় পায় স্বাগতিকরা।
ঘরোয়া ক্রিকেটের এক জীবন্ত কিংবদন্তি রাজ্জাক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বল হাতে অসংখ্যবার প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের বোকা বানিয়েছেন তিনি। বাঁহাতি স্পিন জাদুতে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের হাসিয়েছেন বহুবার। টেস্ট ও টি-২০ ফরম্যাটের কথা বাদ দিলে ওয়ানডেতে বেশ দাপুটে স্পিনারই ছিলেন তিনি।

১৯৮২ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন খান আব্দুর রাজ্জাক। সেখানেই শৈশব কাটিয়েছেন তিনি। তবে ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। আর ভালোলাগা থেকেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন এ কিংবদন্তি স্পিনার।
২০০১-০২ মৌসুমে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয় খুলনা বিভাগ। ওই মৌসুমেই খুলনার জার্সিতে প্রথম শ্রেণীতে অভিষেক হয় রাজ্জাকের। সেখানে দুর্দান্ত বোলিং করে দলকে শিরোপা জেতান তিনি। এরপরই বাংলাদেশ ‘এ’ দলে ডাক আসে তার। যেখানে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭ রান খরচে ৭ উইকেট শিকার করেন এ বাঁহাতি স্পিনার।
রাজ্জাকের স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এশিয়া কাপে হংকংয়ের বিপক্ষে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলেন আব্দুর রাজ্জাক। বাংলাদেশ দলে সুযোগ পেয়েই অভিষেক রাঙান তিনি। এ ম্যাচে ব্যাটিংয়ে ৫ রান করলেও ৯ ওভার হাত ঘুরিয়ে ১৭ রান খরচ করে তিন উইকেট শিকার করেন রাজ্জাক।
স্পিনার হিসেবে অভিষেক ম্যাচেই নিজের জাত চিনিয়ে জাতীয় দলে ভালো শুরুর ইঙ্গিত দেন এ ক্রিকেটার। ওয়ানডেতে জাতীয় দলে অভিষেকের প্রায় দুই বছর পর টেস্ট দলে পা রাখেন রাজ্জাক। তবে সাদা পোশাকের অভিষেক রাঙাতে ব্যর্থ হন তিনি।

শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করে ১৯ রান করেন। পরে অজি ব্যাটারদের বিপক্ষে ৩০ ওভার বল করে ৯৯ রান দেন তিনি। তবে উইকেট শূন্য রয়ে যান এই বোলার। একই বছরের নভেম্বরে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণ টি-২০তে অভিষেক হয় রাজ্জাকের।
অবশ্য টেস্টের মতো মলিন নয়, বরং এই ফরম্যাটের অভিষেক রাঙান তিনি। এমনটা হবেই বা না কেন? জন্মস্থান খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকে ৪ ওভার বল করে ১৭ রান খরচ করেন রাজ্জাক। ইকোনোমিকাল বোলিংয়ের পাশাপাশি ৩ উইকেট তুলে নেন। যদিও ব্যাট হাতে রানের খাতা খুলতে পারেননি।
টানা ২০ বছর ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রাজত্ব করে গেছেন রাজ্জাক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত বিরতিতে সুযোগ মিললেও ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক প্রথম তার নামের পাশে লেখা থাকবে।
লাল-সবুজের জার্সিতে রাজ্জাকের ওয়ানডে ও টি-২০ ক্যারিয়ারের চাকা থেমে যায় ২০১৪ সালে। তখন টাইগারদের দায়িত্বে শ্রীলংকান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। অনেকেরই ধারণা, বয়স্ক ক্রিকেটাররা নাকি হাথুরুর চোখে ‘বাতিলের’ সামিল। কথাটা ক্রিকেটপাড়ায় সবার মুখে মুখে ফিরলেও রাজ্জাকের ক্ষেত্রে ঘটেছিল তেমনটাই!

২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট, উইন্ডিজের সেইন্ট কিটসের ওয়ার্নার পার্কে দেশের জার্সিতে সবশেষ টি-২০ খেলতে নেমেছিলেন রাজ্জাক। অবশ্য তার দুই দিন আগেই দেশের হয়ে সবশেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ফেলেন তিনি।
তবে ক্রিকেট বিধাতাও হয়তো চাননি দেশসেরা স্পিনারের বিদায় এভাবে হোক। এজন্য ওয়ার্নার পার্কের আকাশে সেদিন অঝোড়ে বৃষ্টি নেমেছিল। এতে বাকি সময় মাঠে বল গড়ানোর আগেই ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
ওয়ানডে ও টি-২০ ফরম্যাটকে বিদায় বলার পর টেস্ট থেকেও বাদ পড়েন আব্দুর রাজ্জাক। এতে অনেকেই ভেবেছিলেন দেশের প্রতিভাবান স্পিনারের বিদায় খানিকটা আগেই হয়ে গেল বোধহয়! তবে না, রাজ্জাকের শেষটা তখনও বাকি।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফরে আসে শ্রীলংকা। তার আগে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে আঙুলে চোট পান সাকিব আল হাসান। স্বাভাবিকভাবেই লংকানদের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ মিস করছেন তিনি। তার স্থলাভিষিক্ত হন ‘অবহেলিত’ সেই রাজ্জাক।
প্রথম টেস্টে সাগরিকার পাড়ে মুখোমুখি শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ। এ সময় ঢাকায় ঘরোয়া ক্রিকেটে বল হাতে রাজত্ব করছে রাজ্জাক। সাকিবের অভাব পূরণ করতে চট্টগ্রামে রাজ্জাককে উড়িয়ে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচকরা।

সাকিবের ইনজুরিতে কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের। সেদিক থেকে শ্রীলংকার বিপক্ষে অনেকটাই নিশ্চিত আব্দুর রাজ্জাক। তবে ম্যাচের আগমুহূর্তে রাজ্জাকের জায়গায় অভিষেক টুপি পড়লেন আরেক বাঁহাতি স্পিনার সানজামুল ইসলাম।
টস হওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া গেল সাকিবের পরিবর্তে অভিজ্ঞ রাজ্জাক নয়, বরং সানজামুলে আস্থা রেখেছে ম্যানেজমেন্ট। সে ম্যাচে ১৫১ রান দিয়ে মাত্র ১ উইকেট শিকার করেন তিনি। যার মাধ্যমে গড়েন লজ্জার রেকর্ড তিনি। ইংলিশ বোলার আদিল রশিদ অভিষেক টেস্টে ১৫০ রান দিয়ে উইকেট শূন্য ছিলেন। তার পরই আছেন সানজামুল।
চট্টগ্রাম টেস্টে অবহেলিত রাজ্জাকের অভাব হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে টাইগার বাহিনী। তাইতো মিরপুরে আসার আগেই দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে ছিটকে যান মোসাদ্দেক ও সানজামুল। এতে দলে অন্তর্ভূক্ত হন রাজ্জাক।
দীর্ঘ চার বছর পর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তুলেই বোলিংয়ে ঝলক দেখান রাজ্জাক। হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনুজরিতে মাঠ ছাড়ার আগে বল হাতে লংকান বাহিনীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন তিনি। রাজ্জাকের স্পিন ঘূর্ণিতে মেন্ডিস, ধনঞ্জয়, গুনাথিকালা ও অধিনায়ক দিনেশ চান্দিমাল পরাস্ত হয়ে সাজঘরে ফিরে যান।
দ্বিতীয় ইনিংসে একটি উইকেট শিকার করেন রাজ্জাক। এতে টেস্ট ক্যারিয়ারে সেরা বোলিং ফিগার ১২৩ রানে ৫ উইকেটের মালিক বনে যান তিনি। অলিখিতভাবে এটিই ছিল রাজ্জাকের শেষ টেস্ট।

এরপর আর জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা সুযোগ আসেনি ঠিকই, তবে নিজেকে ক্রিকেটের সঙ্গেই জড়িয়ে রেখেছেন রাজ্জাক। সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় বলে এখন বিসিবির নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ও হাবিবুল বাশারের সঙ্গে তৃতীয় সদস্য হিসেবে এ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন দেশসেরা সাবেক এ স্পিনার।
বাংলাদেশের হয়ে তিন সংস্করণেই খেলেছেন রাজ্জাক। তবে সবচেয়ে বেশি খেলেছেন ওয়ানডেতে। এই সংস্করণে দলের সেরা বোলারদের একজন ছিলেন তিনি। ১৫৩ ওয়ানডে খেলে ২০৭ উইকেট তার। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও সাকিব আল হাসানের পর যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। ৩৪ টি-২০তে রাজ্জাকের আছে ৪৪ উইকেট। পাশাপাশি ১৩ টেস্ট খেলে নিয়েছেন ২৮ উইকেট।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজত্ব করেছেন রাজ্জাক। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে দ্রুততম বোলার হিসেবে ৬০০ উইকেট শিকার করেন তিনি। ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্তে ১৩৭ ম্যাচে ৬৩৪ উইকেট নেন। এছাড়াও লিস্ট ‘এ’তে সবমিলিয়ে ৪১২ উইকেট নিয়েছেন। পাশাপাশি স্বীকৃত টি-২০তে ৯০ ম্যাচে ৯৯ উইকেট নিয়েছেন এ কিংবদন্তি স্পিনার।
ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলেও বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন রাজ্জাক। তবে বারবার জাতীয় দলে ব্র্যাত্য হয়ে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন তিনি। হয়তো সুযোগ আসবে এই ভাবনায়। তবে দেশসেরা স্পিনারকে যেভাবে বিদায় দেওয়া হয়েছে তাতে হয়তো ক্রিকেট বিধাতাও অসন্তুষ্ট হয়ে থাকবেন।
আজকের এই দিনে পৃথিবীর আলো দেখেন রাজ্জাক। তার এই বিশেষ দিনে জানাই, শুভ জন্মদিন।