ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

শামার জোসেফ: এলেন, দেখলেন, জয় করলেন

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৭:২৫, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪
শামার জোসেফ: এলেন, দেখলেন, জয় করলেন
ছবি অলংকৃত- ডেইলি বাংলাদেশ

এ যেন এলেন, দেখলেন, জয় করলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের তরুণ তুর্কি শামার জোসেফ যেন তাই-ই। দু’বছর আগেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ছিলেন নৈশপ্রহরী। মাঝেমধ্যে সুযোগ মিললে নেটে আগুন ঝরাতেন, খেলতেন ম্যাচ। কিন্তু এক ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। শুরুটা সেখান থেকেই। তবে শামারের রূপকথা লেখার আগে একটু পেছনে ফিরতে হবে।

গায়ানার রাজধানী জর্জটাউন। সেখান থেকেও ২৩০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম বারাকা। যেখান থেকে সবচেয়ে কাছের শহরে যেতেও ঘণ্টা ছয়েক নদীপথে যাত্রা করতে হয়। গ্রামটিতে ২০১৮ সালের অক্টোবরের আগেও ছিল না কোনো ইন্টারনেট সেবা। সবমিলিয়ে অজপাড়াগাঁওয়ের চেয়েও কম যেত না বারাকা। আর এই গ্রাম থেকেই উত্থান তরুণ টগবেগ ২৪ বছর বয়সী শামার জোসেফের।

ক্রিকেটের মোহ যে শামারকে আঁকড়ে ধরেছিল। তাই তো পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে ক্রিকেটকে দূরে ঠেলে দেননি। নিশি রাতের অতন্দ্রপ্রহরীর মতো ধীরে ধীরে বাইশ গজে নিজেকে শান দিচ্ছিলেন। এই আশায়, হয়তো একদিন সুযোগ আসবে। হোক সেটি লাল চেরি কিংবা সাদা বলের ক্রিকেটে।

Advertisement

অভিষেক বলে প্রিয় ব্যাটার স্টিভেন স্মিথের উইকেট শিকার করেন শামার। ছবি- সংগৃহীতনিয়তি শামারকে হতাশ করেনি। গত বছরের নভেম্বরে উইন্ডিজ ‘এ’ দলে ডাক পান। সেবার দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় সফর করেন তিনি। সিরিজের প্রথম টেস্টে বেঞ্চে বসে কাটাতে হয়েছে। তবে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক টেস্টে একাদশে জায়গা হয় ডানহাতি এ পেসারের।

প্রোটিয়াদের মাটিতে উইন্ডিজ ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন শামার জোসেফ। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৩ ওভার হাত ঘুড়িয়ে ৫৭ রান খরচে ৩ উইকেট তুলে নেন তিনি। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ ওভারে সমান রান দিয়ে মাত্র একটি উইকেটের দেখা পান। এই টেস্টে ব্যাট হাতে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৮ রান ঝুলিতে পুরেন।

অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেই পাঁচ উইকেট শিকার করেন শামার। ছবি- সংগৃহীত‘এ’ দলের হয়ে দ্বিতীয় টেস্টে ভালো করে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টেও একাদশে টিকে যান শামার। এবার বল হাতে ৮ উইকেট শিকার করেন। এই পারফরম্যান্সের পরেই উইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের নজরে আসেন এ ডানহাতি। 

বাইশ গজের ক্রিকেটে গত কয়েকবছর ধরে ধুঁকছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে তারা। কক্ষপথে ফিরতে একের পর এক বাজি ধরছিল দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু সব পরিকল্পনাতেই ধরা খেয়েছে ক্যারিবীয়রা।

অস্ট্রেলিয়া সফরে তুরুপের তাস হয়ে ওঠেন শামার। ছবি- সংগৃহীততবে অস্ট্রেলিয়া সফরে তো একগাদা তরুণকে পাঠিয়ে বড় এক বাজিই ধরেছিল উইন্ডিজ। সেই বাজির অন্যতম তাস ছিলেন বারাকার সেই তরুণ শামার। এই সিরিজের আগে যার নামটিও কেউ জানতেন না। তিনিই নাকি ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণের অভিষেক বলেই উইকেট শিকার করলেন। আর ইনিংস শেষে ঝুলিতে পুরেন পাঁচ উইকেট।

যদিও দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াই জমানোর আগেই অজিদের কাছে ১০ উইকেটে হেরে যায় ব্রাথওয়েটের দল। কিন্তু বারাকার গোলাবারুদ যে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত সেই আভাস দিয়ে রেখেছিলেন শামার।

টেস্টের অভিষেক বলেই নিজের প্রিয় ব্যাটার স্মিথের উইকেট শিকার করেন শামার জোসেফ। অ্যাডিলেড টেস্ট শেষে তিনি বলেন,  ‘ড্রেসিংরুমে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। তাদেরকে বলেছি, আমি প্রথম বলেই উইকেট পাব। তবে জানতাম না এটি স্মিথ হবে। যখন থেকে ডাক পেয়েছি, অনেকেই আমাকে বলেছে, “আমি চাই স্টিভ স্মিথের উইকেট নাও, আমি চাই স্টিভ স্মিথের উইকেট নাও”। সবাই স্টিভ স্মিথকে নিয়েই বলেছে।’

অ্যাডিলেডে ঝলক দেখানো শামার ব্রিসবেনের দিবা-রাত্রির টেস্ট স্কোয়াডেও সুযোগ পান। আগের টেস্টে নাস্তানাবুদ হওয়া উইন্ডিজ তখনও ভাবেনি তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছিল। অথচ এই সিরিজের আগেই ক্যারিবীয় দলপতি বলে রেখেছিলেন, ‘এই সফরে ২৭ বছরের আক্ষেপ ঘোচাতে চান তারা।’

সিরিজের প্রথম টেস্ট হেরে পিছিয়ে থাকা সফরকারীরা ব্রিসবেনে দারুণ শুরু করে। গোলাপি বলের টেস্টের প্রথম ইনিংসে লড়াই করে ৩১১ রান সংগ্রহ করে ক্যারিবীয় ব্যাটাররা। তবে লিড নেয়ার আগেই ২৮৯ রানে ইনিংস ঘোষণা করে অতি আত্মবিশ্বাসী অজিরা।

টেস্টের রাজকীয় সংস্করণে রাজার মতোই শাসন করলেন শামার জোসেফ। ছবি- সংগৃহীতএই ইনিংসে সতীর্থ আলজারি জোসেফ ও  কেমার রোচ আলো ছড়ালেও মাত্র ১টি উইকেট শিকার করেন শামার। ১১ ওভারে ৫৬ রান খরচ করেন এ পেসার।

আগের ইনিংসে স্বাগতিকদের ছুড়ে দেওয়া সুযোগটি লুফে নিতে পারেনি উইন্ডিজ ব্যাটাররা। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসে সবমিলিয়ে ১৯৩ রান সংগ্রহ করে তারা। আর আগের ২২ রানে অজিদের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২১৬।

এর আগে অবশ্য মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী ইয়র্কারে পায়ের আঙুল ভেঙে গিয়েছিল শামার জোসেফের। সতীর্থদের কাঁধে ভর দিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। রক্তাক্ত হয়ে মাঠ ছাড়া ডানহাতি এই পেসারের টেস্ট তখনই শেষ হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কিন্তু রোমাঞ্চ যে তখনও বাকি।

ক্ষয়িষ্ণু ক্যারিবীয়দের নতুন তারা শামার। ছবি- সংগৃহীতলক্ষ্য তাড়ায় দুই উইকেট হারিয়ে ৬০ রান নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করে অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ দিনের শুরুতে স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিনের ব্যাটে জয়ের পথে হাঁটছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু ফিফটির পথে থাকা গ্রিনকে সাজঘরের পথ দেখিয়ে দিনের প্রথম উইকেট নেন শামার জোসেফ। ১১৩ রানে ৩ উইকেট হারানো অজিরা তখনও জয়ের পথে রয়েছে। ৭ উইকেটে তাদের প্রয়োজন ১০৩ রান।

এরপরেই ব্রিসবেনের গ্যাবায় শামার ম্যাজিক শুরু। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়া ট্রাভিস হেডকে নিখুঁত এক ইয়র্কারে উপড়ে নিলেন স্টাম্প! শামারের পরের ওভার কোনোমতে সামলে নিলেন মার্শ। চতুর্থ ওভারে তো চারও মারলেন। কিন্তু পরের বলেই প্রতিশোধ। আবারো লেংথে বল, কিন্তু প্রায় ৯০ মাইল বেগের সে বল খেলতেই হতো মার্শকে। বল ব্যাটের ছোঁয়া নিয়ে চলে গেল স্লিপে। দ্বিতীয় স্লিপ তা ফেলে দিলেও তৃতীয় স্লিপ সেটা মাটিতে পড়তে দেননি। 

মিচেল স্টার্কের ইয়র্কারে ডান পায়ের আঙুল ভাঙে শামারের। ছবি- সংগৃহীতপ্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে উদ্ধার করেছিলেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অ্যালেক্স ক্যারি। তার ঝোড়ো গতির ইনিংস অজিদেরকে মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছিল। শামার তাই ক্যারির জন্য নিজের প্রিয় অস্ত্র বেছে নিলেন। আবার ৯০ মাইল গতির ইয়র্কার এবং অস্ট্রেলিয়ার ছয় উইকেট নেই। অজিদের স্কোরকার্ডে ২ উইকেটে ১১৩ থেকে মুহূর্তেই ৬ উইকেটে ১৩৬!

বাইশ গজে এসেই প্রতিআক্রমণ শুরু করেন মিচেল স্ট্রার্ক। ৪ চারে ১৪ বলে ২১ রান করেন এ বাঁ-হাতি। অতি আক্রমণাত্মক স্টার্ক শামারকে মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন, অস্ট্রেলিয়া জয় থেকে তখনো ৪৫ রান দূরে। আধঘণ্টা আগেও যার বোলিং করার কথা কেউ ভাবেননি, সেই বোলার ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতি ছুটিয়ে ৫ উইকেট তুলে নিয়েছেন।

অজিদের গুঁড়িয়ে ভোঁ দৌড় দেন বারাকা গ্রামের জোসেফ। ছবি- সংগৃহীত

অপরদিকে স্টিভ স্মিথ শুধু অন্যদের যাওয়া আসা দেখছিলেন। প্রথম ইনিংসে ফিফটি করা কামিন্সকে নিয়ে শামার বাড়তি কোনো ঝুঁকি নিলেন না, লেংথ বল বাড়তি বাউন্স নিয়ে উইকেটরক্ষকের কাছে চলে গেল। ৫৩ রানে ৬ উইকেট শামারের। নাথান লায়ন প্রথম সেশনের বাকিটা কাটিয়ে দেন। 

বিরতি থেকে ফিরে লায়নের ক্যাচ ফেলেন আলজারি জোসেফ। যদিও পরের বলেই আবার তুলে নেন লায়নকে। শেষ উইকেটে জশ হ্যাজলউডকে নিয়েই লড়ছিলেন অজি ওপেনার স্মিথ। 

অস্ট্রেলিয়া বিপক্ষে স্বপ্নের শুরুর পর ম্যাচসেরার পাশাপাশি সিরিজ সেরাও হয়েছেন শামার। ছবি- সংগৃহীতওভারের প্রথম চার বল খেলে শেষ দুই বল সঙ্গী হ্যাজেলউডকে সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্মিথ। কিন্তু শামারের জন্য অমন দুটো বলই যথেষ্ট। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে আবার বাঁ-হাতির স্টাম্প তাক করা বল বেল উড়িয়ে নিল। দুই হাত শূন্যে ভাসিয়ে ভোঁ দৌড় দিলেন শামার। তার পিছু নিলেন বাকি ক্রিকেটাররা। মাঠের সীমানা পেরিয়ে শামার থামলেন ড্রেসিংরুমে ঠিক সামনে। এরপর তাকে ঘিরে আত্মহারা উচ্ছ্বাসে মাতলেন ক্যারিবীয়রা।

ব্রিসবেনের গ্যাবায় শামারের ইতিহাস গড়া ৬৮ রানে ৭ উইকেটের বিনিময়ে দীর্ঘ ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদেরই বিপক্ষে জয় তুলে নিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১-১ ব্যবধানে সিরিজ শেষ করে দুদল।

দলের জয়ে বীরত্ব গাঁথা ইনিংসে ক্ষয়িষ্ণু ক্যারিবীয়দের নতুন তারা হয়ে জ্বলে উঠলেন অজপাড়াগাঁওয়ের সেই শামার। যার শুরুটাই বিধ্বংসী গোলাবারুদের মতো শেষটা তার রাজার মতোই হবে, এই প্রত্যাশা রাখতেই পারি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআইএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!