ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]

ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচে খেলেনি অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড!

রিয়াজুল ইসলাম শুভ
প্রকাশিত: ১৬:৩৭, ১৮ আগস্ট ২০২৪
ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচে খেলেনি অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড!
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শৈশবে শিক্ষা জীবনের শুরুটা বর্ণমালা পরিচয়ের মধ্য দিয়েই হয়ে থাকে। এরপর পালাক্রমে চলে শব্দ ও বাক্য গঠন শেখা। সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের সঙ্গেও ঘটে পরিচয়, যেখানে এক-দুই শব্দের উত্তরমালা মুখস্তের পর্ব চলে। টেস্ট ক্রিকেট কাকে বলে, ক্রিকেট বিষয়ক এমন প্রশ্নের সহজ উত্তরটা কী? খুব সহজ ভাষায় উত্তর- দুই দলের মধ্যে পাঁচ দিনব্যাপী চলা ক্রিকেট ম্যাচকে টেস্ট ম্যাচ বলা হয়। খেলার ক্ষমতা এবং সহনশীলতার পূর্ণাঙ্গ  পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয় । পাঁচ দিনের খেলায় দুই দলের পারস্পরিক শক্তি, মেধা ও দক্ষতার পরীক্ষা চলে বলেই সংস্করণটির নাম টেস্ট।

আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) মাঠে গড়িয়েছিল। স্থানীয় সময় তখন দুপুর ১টা ৫ মিনিট। দর্শক সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,৫০০ জন। ক্রিকেট নিয়ে ন্যূনতম জ্ঞান রাখা অনেকেই জানেন ইতিহাসের প্রথম টেস্টে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এই দুই নামে কেউ ম্যাচটি খেলেনি। 

মূলত অল ইংল্যান্ড বনাম সম্মিলিত নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া একাদশ নামে সেদিন দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল। আরো অবাক করা তথ্য হল, কোনো পক্ষই পূর্ণ শক্তি নিয়ে খেলতে নামেনি। সম্মিলিত মেলবোর্ন এবং সিডনির খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত স্বাগতিকদের একাদশে ছিলেন না অপরিহার্য ক্রিকেটার ফ্রেডরিক স্পফোর্থ। ইংল্যান্ড দলে কোনো অপেশাদার ক্রিকেটার ছিল না। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ব্যাট হাতে আধিপত্য বিস্তারে অমরত্ব লাভ করা ডব্লিউ জি গ্রেস অবশ্য সেই দলে ছিলেন না। জুয়া কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন ইংলিশ ম্যান টেড পুলি। গ্রেফতার হওয়ায় ইতিহাসের প্রথম টেস্টের অংশ হতে পারেননি তিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরে কখনো তার টেস্ট অভিষেক হয়নি। 

তখনকার সময়ে খেলার নিয়ম-কানুন এখনকার থেকে অনেক আলাদা ছিল। আইন প্রণয়নকারী গভর্নিং বডিও ভিন্ন ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। টেস্ট ক্রিকেটের সূচনার প্রায় ১০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) ঐ সময়ে ক্রিকেটের দেখভাল করতো। 

তখনকার সময়ে খেলার নিয়ম-কানুন এখনকার থেকে অনেক আলাদা ছিলঅস্ট্রেলিয়ার উইকেটরক্ষক ব্রান্সবি কুপার ইতিহাসের পাতায় দুই কারণে আলোচিত চরিত্র হয়ে থাকবেন। টেস্টের প্রথম দিন ১৫ মার্চ ছিল তার ৩৩তম জন্মদিন। ১৯৪৪ সালে তিনি অবিভক্ত ভারতের ঢাকায় (বাংলাদেশের রাজধানী) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত ব্রিটিশ হলেও ১৮৬৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। আট বছর পর নিজের মাতৃভূমির বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নামেন এ ক্রিকেটার।

টেস্টে সর্বপ্রথম বল হাতে বল হাতে নিয়েছিলেন ইংলিশ ডানহাতি স্লো মিডিয়াম পেসার আলফ্রেড শ, ব্যাটিং প্রান্তে ছিলেন চার্লস ব্যানারম্যান। অজি ওপেনার ম্যাচের দ্বিতীয় বলে এক রান নিয়ে নিজের ও দলীয় তো বটেই, টেস্ট ক্রিকেটেরও রানের খাতা খোলেন।

ইতিহাসের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির মালিকও ব্যানারম্যান, যা ছিল তার প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ারের একমাত্র শতক। ডানহাতি এ ব্যাটার ২৮৫ বলে ১৮ চারে ১৬৫ রানের ইনিংস খেলেন। জর্জ উলিয়েটের বল খেলতে গিয়ে আঙুল ভেঙে যাওয়ায় আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন। বলা বাহুল্য, তিনিই এই ফরম্যাটে রিটায়ার্ড হার্ট হওয়া প্রথম ব্যাটার। ১৪৭ বছর ধরে ব্যানারম্যানের একটি কীর্তিকে এখনো কেউ টপটাকে পারেনি। কোনো দলের অভিষেক টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বাধিক রানের ইনিংস খেলার রেকর্ডটি তার দখলেই রয়েছে।

টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়া প্রথম দিন শেষে তুলেছিল ৬ উইকেটে ১৬৬ রান। সেঞ্চুরি পাওয়া ব্যানারম্যান ১২৬ রানে অপরাজিত থাকেন। বিকেল ৫টায় দিনের খেলা শেষ হয়েছিল। 

দ্বিতীয় দিনে দর্শকের পরিমাণ কমে চার হাজারে নেমে আসে। কথিত আছে, অনেকে বিনামূল্যে টিকিট পেয়েছিলেন। স্টেডিয়ামের গেটে টিকিট বিক্রি করা হয়নি, অন্য কোথাও অবৈধভাবে সেগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। প্রথম ইনিংসে ২৪৫ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। মোট দলীয় রানের ৬৭.৩০% রান একাই করেছিলেন ব্যানারম্যান। ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে ১০৯ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করে।

উইকেট প্রাপ্তির আনন্দে মেতেছেন ক্রিকেটাররাতৃতীয় দিনের খেলা আরম্ভ হয় দুপুর সোয়া ১২টায়। সেদিন আনুমানিক ৯-১২ হাজার দর্শক মাঠে ছিলেন। ইংল্যান্ড ১৯৬ রানে অলআউট হয়, ক্যাঙ্গারুরা ৪৯ রানের লিড পায়। প্রথম বোলার হিসেবে ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেন মিডিয়াম পেসার বিলি মিডউইন্টার। ৫৪ ওভারে ২৩ মেডেনসহ ৭৮ রান খরচায় তিনি ৫ উইকেট পান। পরবর্তীকালে মিডউইন্টার ইংল্যান্ডের হয়েও টেস্ট খেলেছিলেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নামে। আহত ব্যানারম্যান সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ক্রিজে নামলেও চার রানে আউট হন। ইংলিশ বোলারদের সামনে স্বাগতিক ব্যাটাররা দাঁড়াতেই পারেনি, ৯ উইকেটে ৮৩ রান নিয়ে কোনোমতে দিন পার করে।

১৮ মার্চ ছিল বিশ্রামের দিন। তাই পরদিন ১৯ মার্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে চতুর্থ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। শেষ উইকেট জুটিতে ২৯ রান যোগ করায় ১০৪ রানে থামে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। আলফ্রেড শ ৩৪ ওভারে ১৬ মেডেনসহ মাত্র ৩৮ রান খরচায় তুলে নেন ৫ উইকেট।  

১৫৪ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়ায় মাত্র দুই ঘণ্টার ভেতর মাত্র ১০৮ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। অজিরা ৪৫ রানে জিতে যায় ইতিহাসের প্রথম টেস্ট। জয়ী দলের অধিনায়ক ডেভ গ্রেগরিকে ভিক্টোরিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্বর্ণপদক দিয়েছিল। দলের বাকি ক্রিকেটাররা পান রৌপ্যপদক।

লেখার শুরুর দিকে উল্লেখ রয়েছে, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড নামে কোনো দল ঐতিহাসিক সেই টেস্টে খেলেনি। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে রেকর্ড বইয়ে তাদের নাম কীভাবে এলো এবং ম্যাচটিকে কেন টেস্ট মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল? যখন খেলাটি মাঠে গড়ায় সেটি টেস্ট ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। পরবর্তীকালে টেস্ট মর্যাদা প্রদানের পর অফিসিয়ালি পাল্টে যায় দুই দলের নাম।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
ট্যাগ: টেস্ট
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!