ঢাকা,  শুক্রবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ নারী নক্ষত্র ]

অস্বীকৃত শ্রমের অনন্য প্রতীক : কর্মজীবী নারীর স্মৃতিস্তম্ভ!

আহনাফ
প্রকাশিত: ১২:৩১, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অস্বীকৃত শ্রমের অনন্য প্রতীক : কর্মজীবী নারীর স্মৃতিস্তম্ভ!
কর্মজীবী নারীর সংগ্রাম কোনো একক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি অফিসে, ঘরে, সমাজে, এমনকি নিজের মনের ভেতরেও চলতে থাকে। তবু এই নারীরাই পরিবার, অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছেন নীরবে।

স্পেনের আলমেরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই শক্তিশালী ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি যেন ঘরের দায়িত্বের বিশাল বোঝায় নুয়ে পড়া এক নারীর প্রতিচ্ছবি। অবশ্য এই স্তম্ভ নিয়ে তর্ক আছে। কেউ কেউ এটাকে ফেইক প্রচারণা কর্ম হিসেবেও বলছেন।

কারুকর্ম স্তম্ভটিতে তার পিঠের ওপর স্তূপ হয়ে আছে ওয়াশিং মেশিন, ঝাড়ু, কাপড়ের ঝুড়ি এবং নানা ধরনের গৃহস্থালির সামগ্রী। আর দুই সন্তান ধরে আছে তার দুই হাত।

Advertisement

ভাস্কর্যটি যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—একজন নারী ঘরে বসে ‘কিছুই করছেন না’—এই ধারণা কতটা ভুল! বরং ঘরের কাজের পেছনে থাকতে পারে বিশাল শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম, যার স্বীকৃতি অনেক সময় মেলে না।

"Monumento a la Mujer Trabajadora" বা 'কর্মজীবী নারীর স্মৃতিস্তম্ভ' নামের এই বিখ্যাত ভাস্কর্যটি নারীদের গৃহস্থালির অদৃশ্য ও অস্বীকৃত শ্রমের এক অনন্য প্রতীক। 

স্পেনের আলমেরিয়ায় অবস্থিত এই ব্রোঞ্জের শিল্পকর্মটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারীর প্রতিদিনের নীরব সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। চোখে পড়ার মতো এই ভাস্কর্যটি ঘরের ভেতর নারীদের করা সেই ‘অদৃশ্য’ কাজের প্রতীক—ঘর পরিষ্কার করা, সন্তানদের দেখাশোনা থেকে শুরু করে প্রতিদিনের অসংখ্য এমন দায়িত্ব, যেগুলো অনেক সময় চোখে পড়ে না কিংবা যথাযথ মূল্যায়নও পায় না।

শিল্পকর্মটির নাম “Monumento a la Mujer Trabajadora”, যার অর্থ “কর্মজীবী নারীর স্মৃতিস্তম্ভ”। এটি সাধারণত স্পেনীয় শিল্পী আলবার্তো জার্মান ফ্রাঙ্কো-র সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০৬ সালে আলমেরিয়ায় ভাস্কর্যটি উন্মোচন করা হয়।

এটি মনে করিয়ে দেয়—সব কাজ ডেস্কের পেছনে বসে করতে হয় না, আর সব পরিশ্রমের বিনিময়ে বেতনও পাওয়া যায় না।

  • এই স্তম্ভটি সঠিক হোক আর ফেইক হোক- নারী জীবনের বাস্তবতা কী বলছে সেটাই মুখ্য।

ঘরে বাইরে সর্বত্র কর্মজীবী নারীদের সংগ্রাম 

আধুনিক সমাজে কর্মজীবী নারী আর ব্যতিক্রম নন, তিনি এখন বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফিসের ফাইল, মিটিং আর টার্গেটের পাশাপাশি সংসারের রান্না, সন্তানের পড়াশোনা, শ্বশুরবাড়ি–বাপের বাড়ির দায়িত্ব—সবকিছুই যেন তাঁর কাঁধে। সমাজ মুখে বলে নারী এগিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ঘরে বাইরে সর্বত্র তাঁকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতেই হয়। এই সংগ্রাম শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক, সামাজিক ও আবেগিকও।

অফিসে নারীর সংগ্রাম 

কর্মক্ষেত্রে একজন নারীকে প্রমাণ দিতে হয় বারবার। একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে তাঁকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি, সন্তানের অসুস্থতা বা পারিবারিক দায়িত্বকে অনেক সময় “দুর্বলতা” হিসেবে দেখা হয়। পদোন্নতি, নেতৃত্বের সুযোগ কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মজীবী নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে ২০–৩০ শতাংশ কম বেতন পান, যা তাঁদের আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাড়ির ভেতরের অদৃশ্য যুদ্ধ 

অফিস থেকে ফিরে নারীর কাজ শেষ হয় না, বরং আরেক দফা দায়িত্ব শুরু হয়। রান্না, পরিষ্কার, সন্তান সামলানো—এসবকে এখনো “নারীর স্বাভাবিক কাজ” হিসেবেই ধরা হয়। কর্মজীবী হয়েও ঘরের কাজে ব্যর্থ হলে তাঁকে শুনতে হয় অবহেলার কথা। এই দ্বৈত ভূমিকা পালনের চাপ অনেক নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।

আত্মীয়স্বজন ও সমাজের চাপ 

আত্মীয়দের প্রশ্ন—“চাকরি করে সংসার ঠিকমতো সামলাতে পারো?”—নারীর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। কেউ বলেন সন্তান অবহেলিত, কেউ বলেন স্বামীকে সময় দেন না। সমাজ এখনো নারীর সাফল্যকে সন্দেহের চোখে দেখে, আর ব্যর্থতার দায় পুরোপুরি নারীর ঘাড়েই চাপায়।

পড়াপড়শি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি 

পড়াপড়শির মন্তব্য, কানাঘুষা কিংবা তুলনা কর্মজীবী নারীর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। দেরিতে বাড়ি ফেরা, অফিসের সহকর্মীদের সাথে চলাফেরা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এই সামাজিক নজরদারি নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংকুচিত করে।

সন্তানের সাথেও সংগ্রাম 

সবচেয়ে বেদনাদায়ক সংগ্রামটি হয় সন্তানের সাথে। কর্মজীবী মা অনেক সময় অপরাধবোধে ভোগেন—তিনি কি যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন? সমাজ মাকে নিখুঁত দেখতে চায়, কিন্তু বাস্তবতা বোঝে না। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মায়েরা মানসিক চাপ ও উদ্বেগে বেশি ভোগেন, যদিও তাঁদের সন্তানরা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

  • কর্মজীবী নারীর সংগ্রাম কোনো একক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি অফিসে, ঘরে, সমাজে, এমনকি নিজের মনের ভেতরেও চলতে থাকে। তবু এই নারীরাই পরিবার, অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছেন নীরবে। 

তাঁদের সংগ্রামকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে দেখতে শিখলেই সমাজ সত্যিকার অর্থে এগোবে। নারীর কাঁধ থেকে অদৃশ্য চাপ নামাতে পারলেই সমতা কেবল কথায় নয়, বাস্তবেও প্রতিষ্ঠিত হবে।

সৌজন্য : ইতিহাসের অধ্যায় ও SAM Motivation অবলম্বনে আহনাফ
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!