ঢাকা,  শুক্রবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

আমরা ঘর ঠান্ডা করছি নাকি শহর গরম করছি?

কাজী শাহনূর আশরাফ
প্রকাশিত: ১১:৫৬, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমরা ঘর ঠান্ডা করছি নাকি শহর গরম করছি?
“এমন ঘর কেন বানাব না, যেটি প্রতিদিন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে?” শুধু ঘর ঠান্ডা করবেন না। তাপকেই ঘরে ঢুকতে দেবেন না।

বাংলাদেশের শহরে গরম বাড়লে আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী?
আরও একটি AC। ঘর ঠান্ডা হলো। দরজা বন্ধ হলো। আমরা স্বস্তি পেলাম। কিন্তু গল্পটি ঘরের দরজায় শেষ হয় না।

Air Conditioner (এয়ার কন্ডিশনার / শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র) ঘরের তাপকে জাদুর মতো অদৃশ্য করে না। সেটি তাপকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে দেয়। 

ঘরের ভেতরের তাপ বাইরে যায়, compressor আরও তাপ তৈরি করে, বিদ্যুৎ লাগে, আর সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও একটি পরিবেশগত মূল্য আছে।

Advertisement

অর্থাৎ আপনি আপনার ঘর ঠান্ডা করছেন, কিন্তু ভবনের বাইরে সেই তাপ কোথাও না কোথাও ফিরে যাচ্ছে। এখন হাজার হাজার ভবন একই কাজ করলে কী হয়? শহর আরও গরম হয়। শহর গরম হলে ভবন আরও গরম হয়। 

ভবন আরও গরম হলে আরও AC লাগে। আরও AC আরও বেশি তাপ বাইরে ছাড়ে। এটাই Feedback Loop (ফিডব্যাক লুপ / প্রতিক্রিয়া-চক্র)।
গরম → AC → বাইরে আরও তাপ → আরও গরম → আরও AC।

আমরা তখন সমস্যার সমাধান করছি না। আমরা সমস্যাটিকেই শক্তিশালী করছি। ঢাকার কথা ভাবুন। কংক্রিটের ছাদ সারাদিন সূর্যের তাপ শোষণ করছে। পশ্চিমমুখী দেয়াল বিকেলের আগুন ধরে রাখছে। 

গাছ নেই। ছায়া নেই। মাটি ঢাকা। বাতাস চলার পথ বন্ধ। জানালা আছে, কিন্তু Cross Ventilation (ক্রস ভেন্টিলেশন / আড়াআড়ি প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ) নেই। চারপাশে concrete, glass, asphalt এবং AC-এর outdoor unit।

তারপর আমরা বলি, “গরম খুব বেড়ে গেছে, আরও বড় AC লাগবে।” কিন্তু Systems Thinking (সিস্টেমস থিংকিং / ব্যবস্থাভিত্তিক চিন্তা) অন্য প্রশ্ন করে। ঘরটি এত গরম হচ্ছে কেন?

Permaculture (পার্মাকালচার / স্থায়ী জীবন-নকশা ভাবনা) আরও 
একটি প্রশ্ন যোগ করে:
তাপ ঘরে ঢোকার আগেই কি আমরা সেটিকে থামাতে পারি না?
সেখানেই ভবিষ্যতের ভবন-নকশা শুরু হয়।

ছাদের উপর গাছপালা ও Green Roof (গ্রিন রুফ / সবুজ ছাদ), দেয়ালে ছায়া, বড় গাছ, লতা, সঠিক Orientation (ওরিয়েন্টেশন / দিক-নির্দেশনাভিত্তিক অবস্থান), গভীর ছাউনি, প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল, কম তাপ শোষণকারী পৃষ্ঠ, জলধারণক্ষম Landscape (ল্যান্ডস্কেপ / ভূদৃশ্য), courtyard, evaporative cooling এবং ভবনের চারপাশে জীবন্ত মাটি তাপকে ভবনের দেয়ালে পৌঁছানোর আগেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানে লক্ষ্য AC নিষিদ্ধ করা নয়।

বাংলাদেশের তীব্র গরমে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ এবং উচ্চ ঝুঁকির সময়ে Cooling (কুলিং / শীতলীকরণ) জীবনরক্ষাকারীও হতে পারে।

কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো:
আমরা কি AC-কে শেষ নিরাপত্তা স্তর হিসেবে ব্যবহার করব, নাকি খারাপ design-এর স্থায়ী ওষুধ হিসেবে?

একটি ভালো ভবন প্রথমে সূর্য, ছায়া, বাতাস, পানি, গাছ, মাটি এবং উপকরণ দিয়ে তাপ সামলায়। তারপর প্রয়োজন হলে প্রযুক্তি যোগ করে।

একটি খারাপ ভবন প্রথমে তাপ তৈরি করে, তারপর যন্ত্র দিয়ে সেই তাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এই দুই চিন্তার মধ্যে বিশাল পার্থক্য।

আমাদের শহরকে কোটি কোটি AC দিয়ে ঠান্ডা করা সম্ভব নয়।
শহর ঠান্ডা করতে হলে আগে শহরকে এমনভাবে Design (ডিজাইন / নকশা) করতে হবে, যাতে সে নিজেই কম গরম হয়।

Permaculture-এর প্রশ্ন তাই “কোন AC কিনব?” নয়।
প্রশ্ন হলো:
“এমন ঘর কেন বানাব না, যেটি প্রতিদিন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে?”
শুধু ঘর ঠান্ডা করবেন না। তাপকেই ঘরে ঢুকতে দেবেন না।

লেখক : কাজী শাহনূর আশরাফ
রিজেনারেটিভ জীবিকা নকশাবিদ, পার্মাকালচার ডিজাইনার ও প্রশিক্ষক এবং রিজেনারেটিভ উদ্যোক্তা। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!