২২ জন শিক্ষিত লোক নিয়ে আফ্রিকার ধনী রাষ্ট্র বতসওয়ানার ইতিকথা!
মাত্র ২২ জন শিক্ষিত লোক নিয়ে একটা দেশকে কীভাবে ধনী বানানো যায়? অবিশ্বাস্য লাগছে তাই না? কিন্তু এটাই আফ্রিকার বটসওয়ানার সত্যিকারের ইতিহাস! স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বতসোয়ানা আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ। আফ্রিকার সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ। পড়াশোনার মান খুবই ভালো। দেশটি জনগণ এখন জনসম্পদে পরিণত হয়েছে।
অথচ বতসোয়ানার মতো একটি দেশ- যে দেশটি স্বাধীনতার সময় পৃথিবীর দুই নম্বর দরিদ্র দেশ ছিল! সেই দেশ ৫০ বছরে এসে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতিতে এখন আফ্রিকা মহাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!
রাষ্ট্র পরিচালনা করার মতো কোনো জনবলও তাদের ছিল না। মোটে শ’খানেক মানুষ ছিল, যারা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছে। এর মাঝে মাত্র ২২ জন ছিল, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে। অন্যরা কেউ পড়াশোনাই জানে না! তাহলে কি করে সম্ভব হলো?
.png)
ভাবুন তো একটা দেশের স্বাধীন হওয়ার দিন পুরো দেশে পাকা রাস্তা আছে মাত্র ১২ কিলোমিটার! পুরো দেশে মাথা গোঁজার মতো হাসপাতাল নেই, আর উচ্চশিক্ষিত মানুষ বলতে পুরো দেশের মোট জনসংখ্যা মিলিয়ে মাত্র ২২ জন!
বাংলাদেশ যে সময়টায় স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এর ঠিক কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানাও স্বাধীন হয়। দেশটি ১৯৬৬ সালে যখন ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীন হয়, তখন পুরো দেশে মাত্র ১২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ছিল। সব মিলিয়ে গুনে গুনে শ’খানেক মানুষ হাইস্কুল পাস করা ছিল। এর মানে তখনকার সময়ে এক মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে আর কেউ ছিল না, যাঁরা শিক্ষিত।
পুরো পৃথিবীতে এই দেশটি ছিল দ্বিতীয় দরিদ্রতম রাষ্ট্র। মানুষজন খেতে পারত না। নানান রকম রোগে আক্রান্ত ছিল। শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। যে দেশটি কিনা স্বাধীনতার সময় পৃথিবীর দ্বিতীয় দরিদ্রতম রাষ্ট্র ছিল, সেই দেশটিই মাত্র পাঁচ দশকে, অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আফ্রিকার ধনী রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে, সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্র থেকে কি করে তারা মাত্র ৫০ বছরে এতটা এগোতে পারল?
আশেপাশের সব দেশ আর বড় বড় বিশ্বনেতারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলো, ধুর! এই দেশ ৩ বছরও টিকবে না। না খেয়ে মরবে সবাই!
কিন্তু আজ সেই বটসওয়ানা পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে ধনী, শান্ত আর সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ! কারণ তাদের প্রেসিডেন্ট শুধু এসব করেই বসে থাকেননি। সঠিক রাজনৈতিকচর্চাও শুরু করেন। দেশটি পুরো মাত্রায় গণতান্ত্রিক। প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হয় সেখানে। দেশটিতে আজ পর্যন্ত কখনো কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা হয়নি। কখনোই কোনো সামরিক শাসক দেশটি দখল করেনি।

ঘটনার মূল নায়ক, স্যার সেরেস খামা। তিনি ছিলেন বটসওয়ানার বিশাল রাজপরিবারের মূল উত্তরাধিকারী। পড়াশোনা করতে গেলেন বিলাতের মাটিতে মানে লন্ডনে। সেখানে গিয়ে প্রেমে পড়লেন রুথ উইলিয়ামস' নামের এক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ মেয়ের!
ব্যস! আগুন লেগে গেল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে!
পাশের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার তখন চরম বর্ণবাদী সরকার। তারা ব্রিটিশদের ওপর প্রেসার দিলো,খবরদার! একজন কৃষ্ণাঙ্গ রাজা কোনো শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে বিয়ে করে রাজত্ব করতে পারবে না! এতে আমাদের বর্ণবাদের নীতি নষ্ট হবে!
![Botswana Culture, Traditions [Botswana Cultural Safaris]](https://kabirasafaris.com/wp-content/uploads/2022/07/botswana-culture.-1024x512.jpeg)
ব্রিটিশ সরকার ভয়ে সেরেস খামাকে নিজের দেশ থেকেই তাড়িয়ে দিলো, নির্বাসনে পাঠালো! কিন্তু সেরেস খামা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি দেশে ফিরলেন, তবে এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিয়ে!
তিনি রাজতন্ত্রের মুকুট, রাজপ্রাসাদের আরাম-আইশ সব থুতু মেরে ফেলে দিলেন! সাধারণ নাগরিক হিসেবে পলিটিক্সে নামলেন, গণতন্ত্রের ভোট লড়লেন এবং বিশাল ব্যবধানে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন!
স্বাধীনতার ১ বছর পরই বটসওয়ানায় আবিষ্কৃত হলো পৃথিবীর অন্যতম বিশাল হীরার খনি! কারণ, দেশটির তখনকার প্রেসিডেন্টের একটি সঠিক পরিকল্পনা ছিল। তিনি প্রথমেই চিন্তা করেছেন, তাঁদের সম্পদগুলো কী কী? তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন, বতসোয়ানায় হীরার খনি রয়েছে এবং পশু পালনের জন্য বতসোয়ানা বেশ ভালো। কিন্তু খনি থেকে হীরা উত্তোলন কী করে সম্ভব? দেশটির তো কোনো জনবলই নেই। কেউ যে পড়াশোনাই জানে না, নেই কোনো প্রযুক্তি!
তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুললেন। লোন নিয়ে নিজ দেশেই হীরা উত্তোলনের জন্য যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করলেন। এরপর শুরু হলো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে হীরা এবং খনি বাণিজ্য। অবস্থা আরেকটু ভালো হওয়ার পর তিনি পশু সম্পদ এবং পশু পালনে মনোযোগী হলেন। এই খাতেও দেশটি ভালো করা শুরু করল।

একই সঙ্গে তিনি দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজালেন। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে স্কুলে যেতে হবে। পড়াশোনা বিনা বেতনে। যে দেশে স্বাধীনতার সময় মাত্র শ’খানেক স্কুল পাস মানুষ ছিল; সে দেশে বর্তমানে ৯৫ ভাগ মানুষ শিক্ষিত।
আফ্রিকার অন্য যেকোনো দেশে হীরা বা তেল পাওয়া গেলে কী হয় জানেন? নেতারা মারামারি শুরু করে। কুপিয়ে যুলাগায়, খনির টাকা সুইস ব্যাংকে পাচার করে আর জনগণ না খেয়ে মরে! একে বলে সম্পদের অভিশাপ।
কিন্তু সেরেস খামা ছিলেন চরম লেভেলের সৎ আর দূরদর্শী। হীরা পাওয়ার পর তিনি ৩টা ঐতিহাসিক ঘুঁটি চাললেন।
এক - যেই উপজাতির এলাকায় খনি পাওয়া গেছে, তারা দাবি করছিল হীরা তাদের। প্রেসিডেন্ট সোজা আইন করলেন, খনির সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট উপজাতির না, পুরো বটসওয়ানার জনগণের! গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এক ঝটকায় খতম!
দুই- তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরা কোম্পানি De Beers-কে ডেকে এনে টেবিলে বসালেন। এমন শক্ত দরকষাকষি করলেন যে, লাভের ৫০% সোজাসুজি দেশের সরকারি ফান্ডে দিতে বাধ্য হলো তারা!
তিন- হীরার টাকা দিয়ে গড়ে তোলা হলো ফিউচার ফান্ড। সরাসরি বানানো হলো স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল আর বিশ্বমানের হাইওয়ে!
প্রেসিডেন্ট হয়েও সেরেস খামা সরকারি রাজকোষের একটা টাকাও নিজের বিলাসিতায় খরচ করতে দেননি। মন্ত্রী হোক বা সরকারি আমলা দুর্নীতির সামান্য প্রমাণের গন্ধ পেলেই সোজা বরখাস্ত এবং চালান জেলখানায়!
ঋণ নিয়ে দেশ চালানোর ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। তাঁর আমল পর্যন্ত বটসওয়ানা কোনো ঋণের ফাঁদে পড়েনি! ফলাফল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮০ সাল এই কয়েক বছরে বটসওয়ানা এমন স্পিডে দৌড়েছে যে বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে রেকর্ড গড়ে ফেলে! জিডিপি গ্রোথ প্রতি বছর ৮-৯% ছুঁয়ে ফেলেছিল!

চরম দরিদ্র, হতাশাজনক একটা দেশকে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই এক প্রজন্মের মধ্যে আফ্রিকার সবচেয়ে সম্মানজনক রাষ্ট্রে পরিণত করে যান স্যার সেরেস খামা।
দেশ উন্নত করতে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ থাকা লাগে না, লাগে একজন সৎ, দূরদর্শী আর কড়া নেতা! সততা থাকলে মাটির নিচে হীরা না থাকলেও দেশ পাল্টে ফেলা সম্ভব, আর সততা না থাকলে হীরার খনি থাকলেও দেশ ভিখারিই থেকে যায়!
এই যেমন ধরেন আমাদের দেশে সম্পদের অভাব কোনো সমস্যা না, আসল অভাব হলো সৎ নিয়তের! সততা থাকলে বালু বিক্রি করেও দেশ চালানো সম্ভব। আফ্রিকাকে আমরা বলি অনুন্নত, অথচ তাদের সততার ইতিহাস আমাদের চেয়ে শতগুণ উন্নত......!
সূত্র : Diary of She