ঢাকা,  শনিবার   ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

মিতালী সিনেমা হল ও আশি-নব্বই দশকের গল্প

আনিছুজ্জামান
প্রকাশিত: ১০:৪৭, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মিতালী সিনেমা হল ও আশি-নব্বই দশকের গল্প
“পর্দা নেমে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু মিতালী সিনেমা হলের সেই গল্প আজও আমাদের স্মৃতির পর্দায় চলছে…

ভাটি-বাংলার রাজধানী খ্যাত মোহনগঞ্জের নির্মল  বিনোদনের এক অনন্য স্মারক দিলশাদ ও মিতালী সিনেমা হল। আশি-নব্বইয়ের দশকের মোহনগঞ্জের কথা মনে পড়লেই কত কিছুই চোখের সামনে ভেসে ওঠে! কংস নদী, মাটির রাস্তা, হাট-বাজার, সাইকেলের টুংটাং শব্দ—আর তারই মাঝে মানুষের বিনোদনের সবচেয়ে বড় ঠিকানা ছিল দিলশাদ ও মিতালী সিনেমা হল।

সেই সময় মোহনগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা এমনকি দূর-দূরান্তের ভাটি এলাকার এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি জীবনে অন্তত একবার দিলশাদ ও মিতালী সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেননি। 

সিনেমা হল তখন শুধু সিনেমা দেখার জায়গা ছিল না—ছিল আনন্দ, উত্তেজনা, আবেগ আর মানুষের মিলনমেলার জায়গা।
‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘জজ ব্যারিস্টার’—এমনসব সিনেমার নাম শুনলেই তখন পাড়া-মহল্লায় শুরু হয়ে যেত আলোচনা।

Advertisement

ছোটবেলায় আমিও একদিন সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। নিজের পায়ে হাঁটার বয়স তখনও হয়নি, কারও কুলে চড়ে সিনেমা হলে ঢুকেছিলাম। সিনেমার পর্দায় গল্প এগিয়ে চলেছে, আর আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। কিন্তু ‘জজ ব্যারিস্টার’ দেখতে গিয়ে যে কী কান্না! আজ ভাবলে হাসি পায়, আবার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা হাহাকারও জাগে।

তখন সিনেমার মধ্যে একটা অন্যরকম আবেগ ছিল। ছিল সমাজের কথা, মানুষের জীবনের কথা, দুঃখ-কষ্ট, ভালোবাসা, অন্যায়-অবিচার আর সম্পর্কের টানাপোড়েন। সিনেমা শেষ হওয়ার পরও তার গল্প মাথার ভেতর ঘুরত। বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুরা মিলে আলোচনা করত—

“নায়কটা এমন করল কেন?”
“নায়িকা শেষ পর্যন্ত কী হবে?”
“ওই লোকটার বিচার হওয়া উচিত ছিল!”
একটা সিনেমা তখন শুধু সিনেমা ছিল না—ছিল কয়েক ঘণ্টার স্বপ্নের পৃথিবী।

আজকের মতো তখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন ছিল না, ইউটিউব ছিল না, ফেসবুক ছিল না, ঘরে বসে শত শত বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল না। বিনোদনের বড় একটি মাধ্যমই ছিল সিনেমা হল।

তাই নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পেলে  মাইকিং করা হতো খবর রাখেন কি আর খবর জানেন নি, হৃয়দ জয় করা জুটি অমুক তমুক অভিনীত হিট ছবি.... ।

তখন দিলশাদ ও মিতালী সিনেমা হলের সামনে যেন উৎসব লেগে যেত। দূর-দূরান্তের মানুষ আসত। কেউ সাইকেলে, কেউ নৌকায়, কেউ হেঁটে। টিকিটের জন্য লাইন, হলের সামনে মানুষের ভিড়, পোস্টারে রঙিন নায়ক-নায়িকার মুখ—সব মিলিয়ে অন্যরকম এক উত্তেজনা।

এমনও গল্প ছিল—
একই সিনেমা পর পর দুই শো দেখেছে কেউ কেউ। আবার দুই দিন পর পর আবার দেখতে গিয়েছে।

কেন?
কারণ তখন সিনেমা দেখার আনন্দটা আজকের মতো হাতের মুঠোয় ছিল না। একটা সিনেমা দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হতো, টাকা জমাতে হতো, সময় বের করতে হতো। তাই পর্দা উঠলে সেই আনন্দটাও ছিল গভীর।

আজ হয়তো হাতে স্মার্টফোন, ঘরে বসেই পৃথিবীর হাজার সিনেমা দেখা যায়। কিন্তু সেই মিতালী সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে টিকিট হাতে পাওয়ার আনন্দ, অন্ধকার হলের ভেতর পর্দায় আলো জ্বলে ওঠার মুহূর্ত, আর সিনেমা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরার আনন্দ—সেটা কি আর ফিরে পাওয়া যায়?

সময়ের সঙ্গে সিনেমা বদলেছে, বিনোদন বদলেছে, মানুষ বদলেছে।
শুধু বদলায়নি সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো।

মোহনগঞ্জের দিলশাদ ও মিতালী সিনেমা হল তাই শুধুই সিনেমা হলের নাম নয়—কয়েকটি প্রজন্মের কৈশোর, আবেগ, আনন্দ আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের নাম। 

“পর্দা নেমে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু মিতালী সিনেমা হলের সেই গল্প আজও আমাদের স্মৃতির পর্দায় চলছে…

লেখক : আনিছুজ্জামান, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!