বিজিএমইএ সূত্রে জানা যাচ্ছে, দেশে বছরে চার লাখ টন ঝুট উৎপাদন হয় এবং ৩০০ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বিটিজিডব্লিউপিই এর সদস্যদের অনেকেই ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ ইউরোপের আরো দেশে ঝুট রপ্তানি করে। দেশে ঐতিহ্যবাহী কৌশল ব্যবহার করে কাপড় থেকে সুতা উৎপাদন করা হয়। এজন্য ছোট ছোট অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কিশোরগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, নওগাঁ ও কুড়িগ্রামে।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ ইউরোপের আরো অনেক দেশে ঝুট রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে। গত পাঁচ বছরের হিসাবে যার অর্থমূ্ল্য গড়ে ৫ থেকে ৬ কোটি ডলার।
.png)
ঝুট হলো ছাট বা কাটা কাপড়। একসময় আগে ঝুট কাপড় রাস্তায় গড়াগড়ি খেত। যখন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন কাড়াকাড়ি শুরু হলো। কিন্তু কাজটি পরিবেশবান্ধব, সিনথেটিক ঝুট যেমন প্রকৃতিতে মিশে যায় না, জমে থাকলে দূষণ ছড়াত। তাছাড়া অনেক কর্মসংস্থানও হচ্ছে এ খাতে। বেনারসী পল্লীর গা ঘেঁষে ঝুটপট্টি। মিরপুর ১০ গোলচক্করের পশ্চিম ও পূর্বদিকে গড়ে উঠেছে সস্তা পোশাকের বিরাট বাজার।
ঝুটের ব্যবসা প্রথম শুরু হয়েছিল টঙ্গীতে, তারপরই মিরপুরে, জানালেন ঝুট ব্যবসায়ী রশিদ মাতব্বর। তিনি জানান, 'ঝুট ব্যবসার জন্য বেশ পরিমাণে জায়গা লাগে। মিরপুরে আগে খালি জায়গা ছিল। ব্যবসা এখান থেকে চলে যাচ্ছে, কারণ খালি জায়গা নেই, কোনাবাড়িতে গিয়ে দেখবেন, বড় বড় সব গোডাউন।'
মিরপুরের ঝুটপট্টি থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং ভারত অভিমুখে ছুটে যায়। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৮ টন করে ঝুট থাকলে মোট ওজন দাঁড়ায় ১৬০ টন, অর্থাৎ ১ লক্ষ ৬০ হাজার কেজি। প্রতি কেজি ২৫ টাকা করে ধরলে ৪০ লক্ষ টাকার ঝুট দিনে বিক্রি হয় ঝুটপট্টি থেকে।
ফুটপাতে ১০০ টাকায় প্যান্ট-শার্ট-গেঞ্জি পাওয়া যায়; তা কিন্তু এই ঝুটপট্টিরই অবদান। জায়গার নাম ঝুটপট্টিই রয়ে গেছে। মিরপুর ১০ নম্বরের ওই জায়গায় ঝুট বা কাটা কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয় আশির দশকের শুরুতে। তবে জমে ওঠে নব্বইয়ের দশকে।
ঝুটপট্টিতে প্রায় ৭০০ দোকান আছে। শুধু ঝুট কাপড়ের দোকান আছে দেড়শর মতো; আর বাকি সব গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজের (বোতাম, লেবেল, সুতা বা ইলাস্টিক)। এগুলোর বেশিরভাগই সিঙ্গেল আইটেম বিকিকিনি করে। আরো আছে জিপারের দোকান, ফিতা বা দড়ির দোকান, গ্যাবার্ডিনের থান কাপড়ের দোকান, কার্টনের দোকান, গাম টেপের দোকান, প্লাস্টিক কভারের দোকান।
তারপর আছে সাইজ লেবেল, মেইন লেবেল, কেয়ার লেবেল, স্টিকার ইত্যাদির দোকান। শুধু বোতামের যে দোকান, তাতে কম করেও ১০০ পদের বোতাম দেখার সুযোগ হয়। এগুলো রঙে যেমন, গড়নে আর আকারেও অনেকরকম। এমন দোকানে স্টপার আর লকপিনও পাওয়া যায়, যেগুলো ব্যবহৃত হয় জ্যাকেটে।
ফিতা বা দড়ির দোকানে আধা সেন্টিমিটার থেকে ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ফিতা পাওয়া যায়। ৪৫ গজ ফিতায় এক চাক্কি হয়। ৫.৫ সেন্টিমিটার প্রস্থের এক চাক্কির দাম ২০০ টাকা, ৮ সেন্টিমিটার প্রস্থের চাক্কির দাম ৪০০ টাকা। দড়ির মধ্যে আছে জুতার, ব্যাগের, বস্তা বাঁধার বা ভ্যানে মালপত্র গুছিয়ে রাখার দড়ি। কোনোটার ইলাস্টিসিটি আছে, কোনোটার নেই। ফুট দরে বিক্রি হয় এগুলো।
মেইন লেবেল হলো যার গায়ে কোম্পানির নাম এবং মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা থাকে, কেয়ার লেবেলে কটন, পলিস্টার ইত্যাদির ভাগ ও সংরক্ষণের উপায় লেখা থাকে। তবে সাইজ লেবেল সাধারণত কাপড়ের তৈরি হয়। এগুলোয় এম (মিডিয়াম), এল (লার্জ) কিংবা ইঞ্চি ধরে ২২-৩০ ইত্যাদি লেখা থাকে। একেকটি সাইজ লেবেল ১-২ টাকায় বিক্রি হয়।
এগুলোর কিছু স্থানীয়ভাবে তৈরি (লোকালি মেইড), কিছু আছে এক্সপোর্ট কোয়ালিটির। সাধারণত গার্মেন্টগুলো অর্ডার (ফরমায়েশ) পাওয়ার পর নানা কারণে প্রয়োজনের অধিক কাপড় ও অ্যাক্সেসরিজ জোগাড় করে। ফরমায়েশ পূরণ হওয়ার পর বেঁচে যাওয়া কাপড়গুলো ইনট্যাক্ট (ক্ষতিগ্রস্ত নয়) তকমা পেয়ে ঝুটপট্টিতে আসে।
এগুলো কিন্তু ঝুট নয়; ঝুট হলো ছাট কাপড়, মানে কেটে বাদ দেওয়া ছোট কাপড়। তবে ঝুট বস্তায় অনেক সময় সুতা, ববিন, বোতাম, জিপার, সুতা, দড়ি, প্লাস্টিক কভারও থাকে।
একসময় গার্মেন্ট মালিকেরা ঝুটকে ঝামেলা মনে করত। প্রোডাকশন ম্যানেজার বা তার অধস্তনদের একটা বাড়তি ইনকাম ছিল ঝুট। কেজি দরে বিক্রি করার কথাও মাথায় আসেনি কারোর। ঝুটপট্টির দোকানগুলো ছিল টিনের চালাঘর; অ্যাক্সেসরিজের দোকান তখন ছিল না। এখন তো অ্যাক্সেসরিজের দোকানই বেশি, ঝুটের দোকান ছড়িয়ে পড়ছে কোনাবাড়ি, আশুলিয়া ইত্যাদি জায়গায়। মালিকরাও এখন ঝুটের প্রতি মনোযোগী, আয়-রোজগার তো একেবারে মন্দ নয়।
একেকটি বস্তায় ৮০-৮৫ কেজি ঝুট থাকে। বাছাইকারীরা মজুরি পায় ২০০ বা ২৫০ টাকা। বাছাই শেষে ছাট বা কাটা কাপড়, মানে ঝুট বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে। ঝুট কাপড়ের অধিকাংশই রপ্তানি হয় চীন ও ভারতে।
সিনথেটিক (কৃত্রিম) তন্তুর প্রক্রিয়াজাতকরণও শুরু হয়েছে আমাদের দেশে। গেঞ্জির কাপড়ের ঝুটের (কাটপিস নামে পরিচিত) অবশ্য বিশেষ একটা ব্যবহার আছে—সেটা পরিষ্কারক হিসেবে, আর তা বন্দুকের নল থেকে কম্পিউটারের কিবোর্ড পর্যন্ত। ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় এগুলো।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা ৭০ ভাগ ছাড়িয়ে যাবে শীঘ্রই। কৃত্রিম তন্তুর সুতা ও কাপড় তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ছে আমাদের দেশেও। এখন দেশে ৭০টি কারখানা পলিয়েস্টার ও ভিসকস কাপড়ের কৃত্রিম তন্তু থেকে সুতা তৈরি করছে। বিটিএমএ তাই ঝুট রপ্তানি বন্ধ করার পক্ষে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস ওয়েস্ট প্রসেসরস অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিজিডব্লিউপিইএ) প্রতিবেদনে বলা হয়, দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হতে পারে ঝুট রপ্তানি। আর বিজিএমইএ সূত্রে জানা যাচ্ছে, দেশে বছরে চার লাখ টন ঝুট উৎপাদন হয় এবং ৩০০ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেয়, বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখে। নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা কর্মীও আছে সমিতির। বিনিময়ে সমিতি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মুনাফার ১ শতাংশ গ্রহণ করে থাকে।
Textile And Garments Merchandising ও https://textilemirrorbd.com অবলম্বনে- এস এম মুকুল