আজ বিশ্ব নারকেল দিবস। নারকেলের গুণগত মান, ব্যাবহার, উপকারিতাকে গুরুত্ব দেবার জন্য প্রতি বছর ২ সেপ্টেম্বর নারকেল দিবস পালন করা হয়। নারিকেল চাষ, উৎপাদন ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক কোকোনাট কমিউনিটির (APCC) উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তাই বিশ্ব নারিকেল দিবস কেবল একটি ফল উদযাপনের দিন নয়; এটি নারিকেল চাষ, কৃষকের শ্রম এবং এই বহুমুখী গাছের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব মনে করারও একটি উপলক্ষ।
কীভাবে পালিত হয় এই দিবস?
বিশ্ব নারকেল দিবসে বিভিন্ন নারকেল উৎপাদনকারী দেশ, যেমন ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং কেনিয়াতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই দিনটিতে নারকেলের ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সেমিনার, কর্মশালা, মেলা এবং প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মানুষ নারকেল-ভিত্তিক বিভিন্ন খাবার ও পানীয় তৈরি করে উপভোগ করে এবং নারকেল শিল্পের উন্নয়নে বিনিয়োগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।
.png)
স্বাদ নয়, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারিকেলের ব্যাপক কদর রয়েছে। পরিবেশবান্ধব এই গাছের প্রায় প্রতিটি অংশই মানুষের কোনো না কোনো কাজে আসে। নারকেলের বহুমুখী ব্যবহার, স্বাস্থ্যগুণ এবং পরিবেশ ও অর্থনীতিতে এর ভূমিকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর চাষ ও ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারকেল শুধুমাত্র একটি সুস্বাদু ফল নয়- এটি পুষ্টি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিবসটি নারকেলের গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করার এবং এর টেকসই উৎপাদন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার সুযোগ করে দেয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারিকেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম নারিকেল উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে পরিচিত। অবশ্য বাংলাদেশও নারিকেল উৎপাদনকারী অন্যতম দেশ। নারিকেল উৎপাদনে ১৩ তম অবস্থানে বাংলাদেশ।
বৈজ্ঞানিক নাম ‘কোকোস নুসিফেরা’। ইংরেজিতে কোকোনাট। পর্তুগিজ শব্দ ‘কোকো’, যার অর্থ ‘মাথার খুলি’ বা ‘প্রেত’। নারিকেলের গায়ে যে তিনটি গোলাকার গর্ত রয়েছে, তা দেখে মড়ার খুলির মত লাগে বলে প্রাচীনকালের ইউরোপিয় অভিযাত্রীরা দিয়েছিল এই নাম।
তালগোত্রীয় এই বৃক্ষের ফল দেখতে একটি বিশালকায় বাদাম বা ‘নাট’-এর মত হলেও নারিকেল আসলে একটি আঁটিযুক্ত রসালো ও শাঁসালো ফল বা ‘ড্রুপ’। চিনাবাদামের চেয়ে জলপাই আর চেরির সাথে এর বেশি মিল।
১. ত্বকের প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখে- নারকেল বা ডাবের জবে সাইটোকিন থাকে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টি এজিং এজেন্ট। এ ছাড়াও ডাবের জল পান করলে ত্বক হাইড্রেট থাকে। এর ফলে ত্বক আরও রেডিয়েন্ট এবং উজ্জ্বল অনুভূত হয়। এই জল পান করলে বলিরেখা ও ফাইন লাইন কমানো যায় এবং ত্বকের টানটান ভাব বজায় থাকে। নিয়মিত ডাবের জল পান করলে পুষ্টির জোগান নিশ্চিত হয় এবং রোগ দূরে থাকে। অ্যাকনে ও ত্বকের অন্যান্য সমস্যা দূর করতে ডাবের জল কার্যকরী।
২. চুলের টনিকের কাজ করে- চুল ঝরার সমস্যা থাকলে ডাবের জল পান করা শুরু করে দিন। কারণ এতে উপস্থিত উপাদান স্ক্যাল্পকে উদ্দীপিত করে চুল মজবুত করে এবং কোষের বিকাশে সাহায্য করে। এর ফলে রক্ত পরিবহন উন্নত হয় এবং এই জলে উপস্থিত ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যামিনো অ্যাসিড চুলকে মোটা করতে সাহায্য করে।
৩. হজম শক্তি উন্নত করে- ডাবের জল প্রাকৃতিক উপায়ে সতেজতা প্রদান করে। পাশাপাশি শরীরে ব্লটিং ও গ্যাসের জন্য দায়ী সোডিয়ামের পরিমাণও কম করে। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি পাচনতন্ত্রকেও মজবুত করে।
৪. ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করে
হজম শক্তি উন্নত করার পাশাপাশি ডাবের জল শরীররে হাইড্রেট রাখে। এটি শরীরের হারিয়ে যাওয়া পুষ্টি উপাদানগুলিকে পুনঃস্থাপিত করে।
৫. হাড় মজবুত করে- ডাবের জল হাড় মজবুত এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এর ফলে অল্প বয়সে অস্টিওপোরোসিস, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপেনিয়া ইত্যাদি হাড়ের রোগের সমস্যা রোধ করা যায়।
৬. অ্যাসিডিটি প্রতিরোধ করে- ডাবের জল শরীরের পিএইচ স্তরে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি অ্যাসিডিটি ও বুক জ্বালার হাত থেকে স্বস্তি দেয়।
৭. রক্তচাপ কম করে- ডাবের জল পান করলে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা কমে ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত ডাবের জল পান করলে রক্তচাপ কমে এবং নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এছাড়াও নারকেল গাছের পাতা এবং নারকেলের খোসা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে তারা, যেমন- ফ্লোর ম্যাট, ব্যাগ, পাখা, ঝুড়ি, খেলার ঘর, পুতুল ইত্যাদি।নারকেলের আঁশ দিয়ে তৈরি ব্যাগ পলিথিনের ব্যাগের পরিবর্তে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বের এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে তাদের আয়ের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই নারকেলের ব্যবসা। তবে বিশ্বজুড়ে নারকেলের চাহিদা খুবই কম। তাই নারকেল শিল্পের উন্নতিও হচ্ছে খুব ধীর গতিতে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিল্পের উন্নতির জন্য পালিত হয় দিবসটি। বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা বৃদ্ধি পেলে এর উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আসবে।