জলবায়ু পরিবর্তন সংকটসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং মানুষের নানাবিধ অত্যাচারে সুন্দরবনে কয়েক প্রজাতির প্রাণী এখন সংকাটপন্ন। সুন্দরবনে গত ২০ বছরে প্রায় ৩২ বার আগুনের দুর্ঘটনায় পুড়ে গেছে প্রায় ১০০ একর বনভূমি। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বনভূমির গাছপালা, লতাগুল্ম পুড়ে নষ্ট হয়েছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ মারা গেছে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু। ফলে আবাসস্থল হারিয়ে ফেলেছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী।
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩১টি। তবে এ সংস্থাটির দাবি বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০ এর বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৯০টি একেবারে শেষ হওয়ার পথে।
.png)

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের তথ্যানুসারে, ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীব্যাপী এখন পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের থেকে হারিয়ে গিয়েছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী। এছাড়া দেশে অন্তত ২১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন। এ তালিকায় রয়েছে উভচর সরীসৃপ ও পাখি ছাড়াও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বাংলাদেশ বনবিভাগের হিসাবে ৪২ প্রজাতির উভচরের মধ্যে বর্তমানে আটটি, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপের মধ্যে ৬৩টি, ৭৩৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে ৪৭টি, ১২৪ স্তন্যপায়ী প্রণীর মধ্যে ৪৩টির অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।
বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রজনন পর্যন্ত সব কার্যক্রম এরা বনেই সম্পন্ন করে। বন ছাড়াও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও জলাভূমিগুলো। জলাভূমি যেমন বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বসবাস তেমনি বিভিন্ন স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচরের বাসস্থান। জলাভূমিসংলগ্ন স্থলভাগেও রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর অবাধ বিচরণ। এসব প্রাণী নিজেদের টিকিয়ে রাখতে জলাভূমি ও স্থলভাগ ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হাতি, চিত্রা হরিণ, ডলফিন, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপসহ অসংখ্য প্রাণী দেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা শুধু প্রকৃতি রক্ষার বিষয় নয়; এর সাথে পরিবেশের ভারসাম্য, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাও জড়িত।
বাংলাদেশে মোট ৫৩টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে, যা বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে রয়েছে, ১০টি জাতীয় উদ্যান, ১৯টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চারটি ইকোপার্ক, একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন, দুটি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা এবং দুটি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা। এসব সংরক্ষিত এলাকার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর টেকসই সংরক্ষণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে সময়ে সময়ে বিভিন্ন আইন, বিধি ও অধ্যাদেশ তৈরি ও আপডেট করেন। যেমন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ ২০২৬, পোষা পাখি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২০, কুমির লালন পালন বিধিমালা ২০১৯, বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা ২০২১ ইত্যাদি।

- স্থলভাগে বসবাসরত সমগ্র বন্যপ্রাণীর শতকরা ৮০ ভাগ বাস করে বনজ পরিবেশে।
- পৃথিবীর ভূ-ভাগের প্রায় ২৮ শতাংশ জায়গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী ব্যবস্থাপনা করেন। এর মাঝে পৃথিবীর এমন সব বনাঞ্চল আছে. যা এখনো প্রতিবেশগতভাবে অক্ষত। কীভাবে প্রতিবেশের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ করা যায়, সেই বিশেষ জ্ঞান সম্পর্কে আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ ধারণা রয়েছে।
- বনাঞ্চলে বসবাসরত প্রাণী ও উদ্ভিদের নিজস্ব মূল্য রয়েছে। এই বনজ জীবন টেকসই উন্নয়নসহ মানুষের কল্যাণে পরিবেশগত, জিনগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, বিনোদনমূলক ও নান্দনিক দিকগুলিতে অবদান রাখে।
- বন ও বনভূমি স্বাদু পানির পরিশোধন ও সংরক্ষণ করা থেকে শুরু করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ বা মাটির উর্বরতাও নিশ্চিত করে। এছাড়া তা নানা প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও সম্পদ সরবরাহ করে। পৃথিবীব্যাপী মানুষ ও অর্থনীতির জন্য এ সকল প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও সম্পদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

'জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস' আমাদের গ্রহের বৈচিত্র্যময় প্রজাতি রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। প্রতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর, এই দিবসটি পালিত হয়। এটি বিপন্ন প্রাণী এবং তাদের সংরক্ষণের চলমান প্রচেষ্টার উপর আলোকপাত করে। জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবসটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সচেতনতামূলক দিবস। প্রাণী আচরণবিদ ও লেখক কলিন পেইজের উদ্যোগে ২০০৫ সালে দিবসটি চালুর তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। পরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব স্টিভ আরউইনের স্মৃতির সাথেও ৪ সেপ্টেম্বরের দিবসটির যোগসূত্র তৈরি হয়।
তবে দিবসটির প্রতিষ্ঠার বছর ও স্টিভ আরউইনের সাথে সম্পর্কের সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই দিনটি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উপর জোর দেয় এবং আবাসস্থলের ক্ষতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবৈধ কার্যকলাপের ফলে তারা যে বিপদের মুখোমুখি হয়, তা তুলে ধরে। 'জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস' পালনের কারণগুলি আকর্ষণীয়। এটি প্রজাতিগুলি যে উদ্বেগজনক হারে বিলুপ্ত হচ্ছে, সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
- এস এম মুকুল, বিভিন্ন পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংকলিত ও সম্পাদিত।